১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

স্বপ্ন ডুবছে ঢলের পানিতে, দিশেহারা কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের কৃষকরা

এ মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Apr 2026, 04:49 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

“ধান করতে জমি চাষাবাদ, সার দেওয়া ও শ্রমিকের মজুরির যোগান দিতে ধারকর্জ করতে হয়েছে। এখন সব চলে গেছে পানির তলে।” কথাগুলো বলছিলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার ভাতশালা গ্রামের কৃষক ইকবাল মিয়া।

মিঠামইন উপজেলার খাসাপুর গ্রামের আরেক কৃষক রতন মিয়া বলছিলেন, “চার একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি, সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে সারা বছর খাব কি।”

শুধু ইকবাল এবং রতন মিয়াই নয়; এমন হতাশা আর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলের বাকি কৃষকরা।

কারণ কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি।

গত দুদিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার বৃষ্টির পরিমাণ কমেছে এবং আকাশে রোদের দেখা মিলেছে। তবও কৃষকদের মনে স্বস্তি নেই।

বৃষ্টির পানি নামার বদলে উজান থেকে আসা পানির তোড়ে হাওর এলাকায় ধান তলিয়ে যাওয়ার পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ইটনা পয়েন্টে ধনু ও বৌলাই নদীর পানি ৪৯ মিলিমিটার, চামড়াঘাট পয়েন্টে মগরা নদীর পানি ৬৩ মিলিমিটার, অষ্টগ্রাম পয়েন্টে কালনী নদীর পানি ৬৯ মিলিমিটার এবং ভৈরব বাজার পয়েন্টে মেঘনা নদীর পানি ৫৫ মিলিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই অঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা করছে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে নদ-নদীর পানি বাড়লেও তা এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে জেলার চার উপজেলায় হাওরের প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

তবে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এরই মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ধান আগেই কাটা শেষ হয়েছিল।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, এ মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টির কারণে মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনু, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী, করাতিয়া কলকলিয়া, বৈঠাখালী, কলমারবাক নদী এবং হাওরে প্রতিদিনই অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়ছে। এসব নদ-নদী উপচে পড়ে পানি হাওরে ঢুকছে। পানির তোড়ে একের পর এক হাওর তলিয়ে যাচ্ছে।

সপ্তাহখানেক আগেও বোরো ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল হাওর এলাকার কৃষক। কিন্তু ভারি বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে দ্রুত বদলে যায় দৃশ্যপট।

নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দে মেতে ওঠার আনন্দের বদলে হাওরের কৃষক এখন বিষন্ন। টানা বর্ষণে হাওড় অঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় বাড়তি মজুরি দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ক্ষেতেই পাকা ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।

বছরের একমাত্র ফসল হারানোর আশঙ্কায় কৃষকরা দিশেহারা। পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা কোমর পানিতে নেমে আধাপাকা ধান কেটে নৌকায় করে বাড়ি নিয়ে আসছেন। যেসব ধান কাটা হয়েছিল, সেসব মাড়াই ও শুকানো নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে।

তাছাড়া বৃষ্টির কারণে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা ও হাওরের মেঠোপথগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় কাটা ধান পরিবহন নিয়েও বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। পাশপাশি খলাতে রাখা কাটা ধানও বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়ায় ও ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ায় কৃষকের ক্ষতি হয়েছে।

ইটনা উপজেলার আটপাশা গ্রামের জুবায়ের হোসেন বলেন, “জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কাটা যাচ্ছে না। নির্ধারিত মজুরির দ্বিগুন দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের কাটানোর সমার্থ, নেই তাদের ধান জমিতেই পঁচে নষ্ট হচ্ছে।”