১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কর্তৃপক্ষের হঠাৎ অভিযানে কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক

রাত আনুমানিক ৩টার দিকে পরিচালিত ওই অভিযানে এলাকাটি থেকে বিপুল সংখ্যক বৈধ প্রবাসী বাংলাদেশিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি।

কর্তৃপক্ষের হঠাৎ অভিযানে কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক
কুয়েত সিটির বাংলাদেশি অধ্যুষিত জিলিব আল-শুয়াইখ অঞ্চলের হাসাবিয়া-আব্বাসিয়া এলাকা।

বিডিনিউজ২৪

আ হ জুবেদ, কুয়েত প্রতিনিধি. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Jul 2026, 06:16 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:39 PM

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে কুয়েতে নানা জটিলতায় বিপাকে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিপদ আরো বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষের আকস্মিক অভিযান।

২০২৫ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কুয়েতে বর্তমানে বাংলাদেশির সংখ্যা ৩ লাখের বেশি। দেশটিতে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা মূলত বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট কোম্পানি এবং গৃহকর্মী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।  

প্রবাসীরা বলছেন, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, কাজের অভাব, ব্যবসায় মন্দা ও বিমানের টিকিটের বাড়তি দামের কারণে অনেকেই বিপাকে রয়েছেন। বিশেষ করে, ঢাকা-কুয়েত রুটে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত থাকায় অনেকে দেশে ফিরতে পারছেন না। 

এর মধ্যে কুয়েত প্রশাসন আকস্মিক অভিযান শুরু করেছে। মঙ্গলবার মধ্য রাতে কুয়েত সিটির জিলিব আল-শুয়াইখ এলাকার হাসাবিয়া-আব্বাসিয়ায় পুলিশ বিশেষ অভিযান চালায়। 

রাত আনুমানিক ৩টার দিকে পরিচালিত ওই অভিযানে এলাকাটি থেকে বিপুল সংখ্যক বৈধ প্রবাসী বাংলাদেশিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। 

যারা অভিযান এড়াতে সক্ষম হয়েছেন, তাদেরও অনেকে বাড়িঘরে ফিরতে এখন ভয় পাচ্ছেন।  

হাসাবিয়া-আব্বাসিয়া এলাকায় বসবাসকারীরা বলছেন, এলাকার বাসিন্দাদের প্রায় নব্বই শতাংশই বাংলাদেশি। ফলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মধ্যরাতে হঠাৎ বাড়িঘর ছাড়ার এমন নির্দেশ আসায় সবাই আতঙ্কিত। 

হাসাবিয়া-আব্বাসিয়া এলাকায় মঙ্গলবার মধ্য রাতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে অনেক বাংলাদেশিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তারা রাস্তায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

হাসাবিয়া-আব্বাসিয়া এলাকায় মঙ্গলবার মধ্য রাতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে অনেক বাংলাদেশিকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তারা রাস্তায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

সরেজমিনে দেখা যায়, তড়িঘড়ি করে বের হয়ে আসা অনেক প্রবাসীকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় আটকে রাখা হয়েছে। 

যেসব ভবনে এসব প্রবাসী বসবাস করছিলেন, সেগুলোর অধিকাংশেরই স্থানীয় আইন অনুযায়ী পরিত্যক্ত। ফলে এসব ভবন খালি করার জন্য প্রশাসন অভিযান চালাতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।  

এ বিষয়ে কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ তারেক হোসেন বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দূতাবাস দ্রুত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” 

বাংলাদেশ ফ্যামিলি ফোরাম কুয়েতের সভাপতি আব্দুল হাই ভূইয়া বলেন, “এখন আর কোনো কিছুই আগের মত নেই। যুদ্ধের আতঙ্কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আইনি কড়াকড়ির কারণে প্রবাসীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।”

১৫ বছর ধরে কুয়েতে থাকা কুমিল্লার কাশেম আলী বলেন, “হামলার আতঙ্ক আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও পুরোপুরি কাটেনি। সরকারি নানা স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর শুনে আমরা সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকি।” 

মৌলভীবাজারের শামসুল আলম বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কাজ নেই, জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি অথচ বেতন বাড়েনি। এই অবস্থায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতও কুয়েতের বাসিন্দদের আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।

জাহিদ হোসেন নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, “আগে ইরান থেকে হামলার আশঙ্কা থাকলে সাইরেন বাজান হত। এখন ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এলেও সাইরেন বাজান হয় না। হঠাৎ বড় কোনো হামলা হলে কোথায় আশ্রয় নেব তার কোনো দিকনির্দেশনা আমরা পাচ্ছি না।”

ফেনীর দাগনভূঞার খোরশেদ আলী আট বছর ধরে একটি ক্লিনিং কোম্পানিতে কাজ করছেন। কর্মহীনতা ও আকামা (কাজ ও বসবাসের আইনি অনুমতিপত্র) সংকটে থাকা এই প্রবাসী বলেন, “কাজ নেই, আকামার সমস্যাও বাড়ছে। টিকেটের দাম বেশি হওয়ায় দেশেও ফিরতে পারছি না। বাংলাদেশ বিমান ফ্লাইট চালু করলে টিকেটের দাম কমত এবং আমরা দেশে ফিরে অন্তত স্বস্তি পেতাম।”

বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব কুয়েতের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সেলিম হাওলাদার বলেন, বর্তমানে প্রবাসীদের মূল দাবি বিমানের ঢাকা-কুয়েত ফ্লাইট দ্রুত চালু করা। ফ্লাইট চালু হলে টিকেটের দাম সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং জরুরি প্রয়োজনে সহজে দেশে ফিরতে পারবেন বলে তাদের আশা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছেন তারা।