৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

‘কানেক্টিভিটির’ নামে বাংলাদেশকে ইজারা নয়: জামায়াত আমির

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের কুষ্টিয়া অভিমুখে লং মার্চ শুরু।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 31 Oct 2026, 09:33 AM

Updated : 31 Oct 2026, 09:56 AM

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্বের বিগ-বির সম্প্রসারণ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে সন্দিহান জামায়াত আমির শফিকুর রহমান।

তিনি বলেছেন, “দুই দিন আগে চার দিনের সফর শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ফিরেছেন। কী জন্য গিয়েছিলেন, কী করে এসেছেন, জাতির সামনে তাকে এটা খোলাসা করতে হবে।

“বিশেষ করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লুকোচুরি হচ্ছে কি না, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না।”

শনিবার সকালে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেইটে ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লং মার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন শফিকুর রহমান। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচারসহ সাত দফা দাবিতে চতুর্থ লং মার্চ হিসেবে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

সরকারের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, “অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছিল, তাদের পরিণতি তারা এখন ভোগ করছে। তাদের তো দিদি-দাদা ছিল, আপনাদের কে আছে? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে পার পাবেন না।”

সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা না দিলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণের এই দাবি, ৭০ ভাগ মানুষের ভোট—এই দুইটাকে ইনশাল্লাহ আমরা অপমানিত হতে দেব না। আদায় করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।”

বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার জন্য যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “এই মুক্তি দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আরেকবার লড়াই করতে হবে। আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে।”

সাত দফা দাবির মূল দফা গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “এটি বাস্তবায়ন হলে বাকি ছয় দফারও প্রয়োজন হতো না। কোনো চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিবাজ কিংবা মাদক সম্রাট মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না।”

শফিকুর রহমান বলেন, “বিএনপি জাতির সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রতারণা করেছে। কথা দিয়ে কথা ভঙ্গ করেছে।

“জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচার করেছে। জাতির আকাঙ্ক্ষাকে, গণরায়কে উপহাস করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা বিএনপিকে বলেছিলাম, ভালোয় ভালোয় এখান থেকে ফিরে আসুন, গণরায় বাস্তবায়ন করুন। না হলে আপনাদেরকে উচ্চ মূল্য দিতে হবে। সেদিকেই সম্ভবত বিএনপি এগোচ্ছে।”

‘সময় থাকতে হাঁটুন, না হলে বিপদে পড়বেন’

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সরকারকে সতর্ক করেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদ।

সমাবেশে তিনি বলেন, “এই সরকার আসার পর সমস্ত জেলা অফিস, জেলা পরিষদ অফিস, ওয়াসা অফিস, বিভিন্ন করপোরেশন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা—সবগুলি এখন বিএনপি অফিসে পরিণত হয়েছে।”

এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের জমি দখলের অভিযোগ এনে অলি আহমদ বলেন, “দিনশেষে সবকিছুর দোষ আপনারই কাঁধে আসবে। যারা আছে এখন আপনার সাথে, তারা তখন পালাবে। তারা তখন বলবে না যে, ‘আমরা এটার জন্য দোষী, প্রধানমন্ত্রী এটা ঠিক করে নাই’।”

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “অনুরোধ করব, সময় থাকতে হাঁটুন, না হলে বিপদে পড়বেন। আমি বারবার আপনাকে সাবধান করে দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আপনি শুনছেন না। আপনি একটার পর একটা ভুল করে যাচ্ছেন।”

নব্বই দশকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে অলি আহমদ বলেন, “১৯৯৬ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বিএনপি শুনে নাই, তখন যে অবস্থা হয়েছিল, ওই অবস্থা আবার পুনরায় এখানে হবে। রাতে না ঘুমিয়ে আইন পাস করতে হবে আপনাদের। ওই সময়ের জন্য অপেক্ষা করবেন না।”

দেশ পরিচালনায় সঠিক নিয়ম ও ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “সিস্টেম যদি ঠিক না থাকে, কখনও ওই দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। আপনি ইউরোপে যান, আমেরিকাতে যান, প্রেসিডেন্ট কে হলেন না হলেন—কিছু আসে যায় না। সিস্টেমে তার এটা টেক কেয়ার করে। আমাদের এখানে সিস্টেম নাই।”

অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অলি আহমদ বলেন, “দয়া করে ভালো মানুষদের পরামর্শ নেন। মূর্খদের সাথে বসে কোনো লাভ নাই।

“অনভিজ্ঞ দলীয় লোকদের সাথে বসে কোনো লাভ নাই। যারা জানে তাদের সাথে বসে কাজ করেন, ঠিক পথে চলেন।”

‘যমজ সন্তানের একটি অবৈধ হলে, দ্বিতীয়টি বৈধ হতে পারে না’

গণভোটের রায় কার্যকর না করাকে দেশের বর্তমান সংকটের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।

তিনি বলেন, “২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একই সঙ্গে দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল সরকার গঠনের নির্বাচন, সংসদ নির্বাচন। আরেকটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের নির্বাচন, হ্যাঁ-না ভোটের গণভোটের নির্বাচন।”

সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সরকার ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে এবং গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব জয়ী হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৩টি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কারের মাধ্যমে গণভোটের রায় কার্যকর করে সংবিধান সংস্কারের পরিকল্পনা ছিল দাবি করে মামুনুল হক বলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের একজন মুখপাত্র গণভোটকে অবৈধ আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন।

গণভোট অবৈধ হলে একই তফসিলে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ও সরকারও বৈধ হতে পারে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “একই মায়ের পেটে জন্মগ্রহণকারী দুই যমজ সন্তানের মধ্যে একটি যদি অবৈধ হয়, দ্বিতীয় সন্তান কোনোদিন বৈধ হতে পারে না।”

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারের সংকট, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির জন্য সংবিধান সংস্কার না করা এবং গণভোটের রায় কার্যকর না করাকে দায়ী করেন মামুনুল হক।

তিনি বলেন, প্রশাসনে নির্লজ্জ দলীয়করণ করা হয়েছে। এসব সমস্যার মূল কারণ সংবিধান সংস্কার না করা এবং গণভোটের গণরায় কার্যকর না করা।

সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।

সভা হবে পথে পথে

শফিকুর রহমানের বক্তব্যের পর বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। এই বহর হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাবে। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এই যাত্রাপথে ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হবে। পথে একাধিক পথসভা হবে।

ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা দিয়ে খুলনা বিভাগের দিকে যাবে লং মার্চের গাড়িবহর। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা শেষে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ হবে।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ঢাকা থেকে ৬৫০ থেকে ৭০০টি গাড়ি নিয়ে লং মার্চ শুরু হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি যুক্ত হয়ে কুষ্টিয়া পৌঁছানো পর্যন্ত বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি হবে বলে আশা করছেন তারা।

লং মার্চ শান্তিপূর্ণ রাখতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পথে কোথাও উসকানিমূলক বক্তব্য বা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন স্লোগান দেওয়া যাবে না। কোনো ধরনের উসকানি বা বাধার মুখে পড়লেও গাড়ি থেকে না নেমে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য এ কর্মসূচি পালন করছে।

এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লং মার্চ করেছিল ১১ দলীয় ঐক্য। আগামী ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে তাদের পরবর্তী লং মার্চ করার কথা রয়েছে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ১১ দলীয় ঐক্য।