Published : 05 Aug 2025, 08:42 PM
আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য যে সময়ের কথা দুমাস আগে অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল, সেই সময়সূচিই এবার নিজের মুখে ঘোষণা করলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, তবে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ তিনি দিলেন না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আজ এই মহান দিবসে আপনাদের সামনে এ বক্তব্য রাখার পর থেকেই আমরা আমাদের সর্বশেষ এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করব। আমরা এবার একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করব।
“অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠাব, যেন নির্বাচন কমিশন আগামী রমজানের আগে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।”
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী। সেই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিন মঙ্গলবার বাংলাদেশ উদযাপন করেছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর ৮ অগাস্ট দায়িত্ব নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই সরকারও এক বছর পূর্ণ করতে চলেছে।
গত জুন মাসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজন করার কথা বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে ১৩ জুন লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠকের পর এক ‘যৌথ ঘোষণায়’ বলা হয়, সব প্রস্তুতি শেষ হলে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই নির্বাচন হতে পারে।
তাতে সন্তুষ্ট হলেও বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও তফসিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ থেকেই ভোটের বিষয়ে আরো স্পষ্ট ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছিল।
কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঘোষণা না করে প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে সবার ‘দোয়া’ চেয়েছেন, যাতে ‘সুন্দরভাবে’ নির্বাচন করে এ দেশের সকল নাগরিক একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার কাজে সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “এবারের নির্বাচন যেন আনন্দ-উৎসবের দিক থেকে, শান্তি-শৃঙ্খলার দিক থেকে, ভোটার উপস্থিতির দিক থেকে, সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার দিক থেকে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকে সেজন্য সকল আয়োজন সম্পন্ন করতে আগামীকাল থেকে আমরা সকলেই মানসিক প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শুরু করব।”
ইউনূস বলেন, সরকার এবার প্রবাসী ভোটারদের ভোট দেওয়ার আয়োজন নিশ্চিত করতে চায়। নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাশাপাশি নারী ভোটাররা যেন দেশের সর্বত্র নির্দ্বিধায় আনন্দ-উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করার আগ্রহের কথা বলেন সরকারপ্রধান।
তিনি বলেন, “এবার যেন কেন্দ্রে কেন্দ্রে নারী ভোটারদের ঢল নামে আমরা সেই লক্ষ্যে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তিনটি নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ইউনূস বলেন, “দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেবার কারণে গত ১৫ বছর ধরে নাগরিকবৃন্দ ভোট দিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে আমরা আমাদের বকেয়া আনন্দসহ মহা আনন্দে ভোট দিতে চাই।
“নির্বাচনের দিনকে আমরা ঈদের উৎসবের মতো করতে চাই। এবারের ভোটের আনন্দ থাকবে সবার মধ্যে। আপনারা সবাই বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন।”
ভোটারদের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এখন থেকে প্রতিদিন আলাপ করুন, আপনার এলাকায় ভোটদান ব্যবস্থা কেমন হলে সুন্দর হয়, কেমন হলে আনন্দমুখর হয়, সেটা আগে থেকে ঠিক করার জন্য। নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজের ভিত্তি রচনা হবে এবারের নির্বাচনে। তার জন্য প্রস্তুতি নিন।”
‘সেরা ব্যক্তিকে’ নির্বাচিত করতে সবাইকে খোঁজ খবর নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের এই অতি মূল্যবান অধিকার ফিরে পেলাম, ভোটটা দেবার আগ মুহূর্তে যেন তাদের চেহারা আমাদের চোখে ভেসে ওঠে।”
তিনি বলেন, “ফেব্রুয়ারি বেশি দূরে নয়। নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি নিতে নিতেই ভোটের দিন এসে পড়বে। বহু বছর আমরা কেউ ভোট দিতে পারিনি। এবার আমরা সবাই ভোট দেব। কেউ বাদ যাবে না।
“সবাই যেন বলতে পারি নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে দেশকে রওনা করার জন্য আমি আমার ভোটটা দিয়েছিলাম। আমার ভোটেই দেশটা সেপথে রওনা হতে পেরেছিল।”

বিচার, সংস্কার
প্রায় ৩৫ মিনিটের ভাষণের শুরুতেই ‘জাতির সূর্য সন্তান’ জুলাই শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ইউনূস।
জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, দৃষ্টি হারিয়েছেন ‘জাতির পক্ষ থেকে’ তিনি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আমরা দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে দেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করব। তবে নির্বাচনের আগে আমাদের অত্যাবশ্যকীয় কয়েকটি কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদ।
“আজ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে, সকল রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে আমরা জাতির কাছে জুলাই ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করেছি। এই ঘোষণাপত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের মানুষের অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হয়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের তিনটি দায়িত্ব ছিল: সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা দেয়ালে দেয়ালে যে প্রত্যাশার কথা লিখে রেখেছিল তার অন্যতম ফোকাস ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার। সে লক্ষ্যে আমরা বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলাম। তাদের মধ্যে প্রধান প্রধান সংস্কার কমিশনগুলো যে সুপারিশ পেশ করেছে সেগুলোর মধ্যে স্বল্প সময়ের মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য বহু সংস্কার আমরা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি।”
এই সংস্কারগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাত, বিচার ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনে গতিশীলতা আসবে; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও হয়রানি হ্রাস পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান।
আর দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারকাজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কাজের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে ঐকমত্য কমিশন ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে। সেখানে যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলো বাদ দিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে ১৯টি মৌলিক সংস্কারের বিষয় চিহ্নিত করা হয়।
“দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ দিন ধরে আলোচনা শেষে ১৯টি বিষয়ের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে, যদিও কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।”
ইউনূস বলেন, “সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। ঐকমত্য কমিশনের পরিচালনায় দেশের সকল রাজনৈতিক দল মিলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়ত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে এসেছে।”
জুলাই সনদকে ‘একটি ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এটা শুধু আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নয়, বৃহত্তর পরিমণ্ডলের রাজনৈতিক ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দলিলতো স্মরণীয় হয়ে থাকবেই, এটা রচনার প্রক্রিয়াও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই দলিল প্রণয়নের জন্য আমি সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে এবং ঐকমত্য কমিশনের সদস্যবৃন্দকে, বিশেষ করে এই উদ্যোগের নেতৃত্বদানকারী প্রফেসর আলী রীয়াজকে জাতির পক্ষ থেকে অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির ‘চেষ্টা ছিল’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এবং এর বাস্তবায়নেও ঐকমত্যে পৌঁছাবে।”
জুলাই সনদ সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও সক্ষমতা, নাগরিক অধিকারের সত্যিকারের বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সামর্থ্যের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইউনূস।
তিনি বলেন, “আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে ভবিষ্যতের কোনো সরকারই যেন আর ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে। রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করতে হবে যাতে কখনো কোথাও ফ্যাসিবাদের লক্ষণ পাওয়া গেলেই সেটিকে যেন তাৎক্ষণিকভাবে সেখানেই নির্মূল করা যায়।
“আর যেন ১৬ বছরের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। বহু মানুষকে প্রাণ দিতে না হয়। আমাদের যেন আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন না হয়।”
জুলাই আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচারকাজ ‘দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে’ মন্তব্য করে সরকারপ্রধান বলেন, “বিচারের আনুষ্ঠানিক শুনানি পর্বও শুরু হয়েছে। ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞে যারা জড়িত তাদের বিচার এ দেশের মাটিতে হবেই।”
বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ তার সহযোগীদের বিচারের এই পুরো প্রক্রিয়া দেশবাসীর কাছে ‘স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান’ রাখার কথাও তিনি বলেন।
এবার ‘সর্বশেষ দায়িত্ব’ হিসেবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসে সকল নাগরিকের কাছে আমার আহ্বান, আসুন, ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রথম বড় পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হই।”