Published : 27 Dec 2025, 10:01 PM
জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আসন সমঝোতা বা জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দলটির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা।
এনসিপির একজন যুগ্ম সদস্য সচিব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
‘আপত্তির’ কথা জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে শনিবার স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন সেই নেতাদের একজন, রফিকুল ইসলাম আইনী, তিনি এনসিপির একজন সংগঠক।
রাতে তিনি বলেন, “আপত্তির বিষয়টি আমরা লিখিতভাবে আহ্বায়ককে জানিয়েছি।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের গড়া রাজনৈতিক দলটির এই কেন্দ্রীয় সদস্যরা স্মারকলিপিতে বলেছেন, “জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা পর থেকেই শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে নেমেছে এনসিপি। ইতোমধ্যে তারা শতাধিক আসনে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে।
এছাড়া গেল ৭ ডিসেম্বর এনসিপির নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে তিন দলের ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’। এ জোটের বাকি দুই দল হল এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
সেই জোট গঠনের তিন সপ্তাহ না যেতেই জামায়াতের সঙ্গে দলটির আসন নিয়ে দর কষাকষি হওয়ার খবর এল।
এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এনসিপির সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরেই জোট গঠনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। এখন দেখা যাক কি হয়, জোট হলে আপনাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।”
ফেইসবুক পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে নির্বাচনি জোট হওয়ার আভাস দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ।
তিনি লেখেন, ৩০ আসনে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে ব্যাপারটা ‘আত্মঘাতী’ হবে।
“এখন পর্যন্ত এনসিপি-জামায়াতের আসন সমঝোতা হচ্ছে না, যা হচ্ছে সেটা নির্বাচনি জোট। জোটের নমিনেশনের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচন করতে পারবেন না।”
জোট বাঁধার গুঞ্জন সম্পর্কে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “এখনও আলোচনা হচ্ছে, চূড়ান্ত কিছু হয় নাই।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, জোট গঠনের ঘোষণা ‘দুয়েক দিনের মধ্যেই’ আসতে পারে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখনও আমাদের বিষয়টা চূড়ান্ত হয় নাই। বিষয়টা অফিসিয়ালি ঘোষণা হবে।”
কবে নাগাদ ঘোষণা আসতে পারে জানতে চাইলে আদীব বলেন, “জোট হলে এক-দুই দিনের মধ্যেই হবে, না হলে নাই।”
এ অবস্থায় শনিবার এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা।
একইসঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
জারার পদত্যাগের বিষয়টি এদিন সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
এরপরই জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়ে ‘আপত্তির’ কথা জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ককে দলের ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতার চিঠিতে দেওয়ার খবর এল।
স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মো. মুরসালীন।

এনসিপির একজন যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চিঠির বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেননি। স্বাক্ষর করাদের ডাকেওনি। তবে কি সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা দেখার পর কথা বলতে পারবো।”
দলের যুগ্ম সদস্য সচিব মুশফিক উস সালেহীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ বিষয়ে এখন কোনো কথা বলতে চাই না।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।
'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ও দলীয় মূল্যবোধের আলোকে সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তি সংক্রান্ত স্মারকলিপি' শিরোনামে নাহিদ ইসলামকে দেওয়া চিঠিতে দলের ওই কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, “দলের প্রতিষ্ঠাকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগ ও অবস্থান আপনাদের সামনে আনতে চাই। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলীয় জোটের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা সামনে এসেছে, সে বিষয়ে আমরা স্পষ্টভাবে আমাদের আপত্তি জানাচ্ছি।
“আমাদের আপত্তির ভিত্তি আমাদের দলের ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার প্রশ্ন।”
জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটেজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাস এবং পরবর্তীতে ছাত্রশক্তি বিষয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার, তাদের অনলাইন ফোর্সের মাধ্যমে এনসিপি ও ছাত্র সংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্রহননের চেষ্টার’ অভিযোগ তুলেছেন এনসিপির এই নেতারা।
তারা বলেছেন, “সর্বোপরি, ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত হয়ে উঠেছে।”
‘মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা রাখা, গণহত্যায় সহযোগিতা’ করায় জামায়াতের অবস্থান-বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে ‘সাংঘর্ষিক’ বলেও তুলে ধরেছেন তারা।
'গণতান্ত্রিক ও গণঅভ্যুত্থান' থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজকে মানবাধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা, নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অটুট রাখার এনসিপির দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের সঙ্গে জোটে ‘আপত্তি’ তোলা নেতারা।
তারা বলছেন, “জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এই নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
নাহিদ ইসলামকে লেখা স্মারকলিপিতে ওই নেতারা বলেছেন, "একই সাথে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, বিগত সময়ে আপনি ও সম্মানিত মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একাধিকবার ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষনা দিয়েছেন, সর্বশেষ সংস্কার প্রশ্নে একমত হয়ে 'গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট' গঠন করে সংস্কার বাস্তবায়নে ভবিষ্যত রাজনীতি করার ঘোষণা দিয়েছেন।
“এবং অতীতে আপনি (নাহিদ ইসলাম) ফেসবুক পোস্ট মারফত সংস্কারের ক্ষেত্রে জামায়াতের দ্বিচারিতা জাতির সম্মুখে উন্মোচন করেছেন। কিছুদিন আগেই সারাদেশের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়ে প্রায় দেড় হাজার জন ব্যক্তির কাছে মনোনয়নপত্র বিক্রি করে দুই দিনব্যাপী কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে বাছাই করে ১২৫ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এরপর আবার অল্প কিছু আসনের জন্য কোনো জোটে যাওয়া জাতির সাথে প্রতারণার সামিল।”
এ ধরনের জোট এনসিপির বহু কর্মী, সমর্থক এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মসহ নতুন ধারার রাজনীতিকে 'সমর্থন' করা বহু সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি করবে তুলে ধরে তারা বলছেন, “এই জোটের সম্ভাবনার খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে সামনে এসেছে, এর পরপরই আমাদের সমর্থনে থাকা কর্মী-সংগঠকসহ একটা বড় সংখ্যক মানুষ আমাদের দলের প্রতি তাদের সমর্থন সরিয়ে নিতে উদ্যত হয়েছেন।
“যদি আমাদেরকে সমর্থন করা মধ্যপন্থী এবং নতুন রাজনীতি প্রত্যাশা করা মানুষেরা তাদের সমর্থন সরিয়ে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পার্টির মধ্যপন্থী সমর্থক ভিত্তি হারাবো। আমরা কোনোভাবেই মনে করি না, দীর্ঘমেয়াদে তা আমাদের জন্য লাভজনক হবে। এর মাধ্যমে এনসিপি'র নিজস্ব মধ্যপন্থী রাজনৈতিক এজেন্সি ক্ষতিগ্রস্থ হবে।”
দলের যে কোনো জোটনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই নীতিগত প্রশ্নগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং জামায়াতের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক জোটে না যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে স্মারকলিপিতে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে অনুরোধ জানিয়েছেন ওই ৩০ নেতা।
‘নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে কৌশল নির্ধারিত হওয়া উচিত, কৌশলগত কারণে নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়’ বলে মত তুলে ধরেছেন তারা।
স্বাক্ষরকারীদের একজন এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও মিডিয়া সেলের সদস্য খান মুহাম্মদ মুরসালীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০ শতাধিক আমাদের হল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আছেন। কেউ একমত হবেন, কেউ একমত হবেন না। এটা একটা পার্টির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এখন এই জায়গায় কেউ আছে দ্বিমত পোষণ করছেন, কেউ আছেন একমত পোষণ করছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক একটা গণতান্ত্রিক চর্চা। কিন্তু আমরা অত্যন্ত নেক্কারজনকভাবে দেখছি যে মিডিয়াতে, বিভিন্ন মিডিয়াতে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যেভাবে ‘ফ্রেমিং’ করা হচ্ছে যে এটা একটা দল ভাঙার ষড়যন্ত্র।
“এরপরে অনেকে দল ছেড়ে চলে যাবে, দল ভেঙে যাবে, এনসিপি আসলে শেষ-এই যে এই ধরনের যে ফ্রেমিংগুলা, এগুলার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই এবং আমরা ঘৃণা ভরে, এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।”
তিনি বলেন, “কারণ হচ্ছে যে আমরা সবাই ইউনাইটেড আছি। এবং এনসিপি কোথায় যাবে না যাবে অথবা এনসিপি কোন সিদ্ধান্তটা নেবে? এই পলিসিগত সিদ্ধান্তে সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার আছে, পক্ষে এবং বিপক্ষে মত দেওয়ার। আমি নিজেও জামায়াতের সাথে জোট করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু তাই বলে এটা যে জোট ভাঙার ষড়যন্ত্র, মানে দল ভাঙার ষড়যন্ত্র, এইভাবে ‘ফ্রেমিং’ করাটা আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।”
জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তির বিষয়ে তিনি বলেন, “কিন্তু তার মানে তো এই না যে আমরা দল ছেড়ে যাচ্ছি কিংবা দল ভেঙে দিচ্ছি। বিষয়টা তো এমন না। এটা একটা পলিসিগত সিদ্ধান্ত। একটা সিদ্ধান্তের আমরা বিরোধিতা করেছি। এটা হচ্ছে মূল ব্যাপার। দ্বিমত পোষণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে কিন্তু পদত্যাগ নয়।”
আরও পড়ুন:
এনসিপি থেকে তাসনিম জারার পদত্যাগ
আসন ভাগের আলোচনায় জামায়াত-এনসিপি, ঘোষণা 'দুয়েক দিনের মধ্যেই'