Published : 09 Feb 2026, 12:29 AM
মাইক লাগানো একটি অটোরিকশা ভোটের গান বাজাতে বাজাতে চলে যেতেই মহাখালী আমতলী এলাকায় রাস্তার পাশের এক চায়ের দোকানি বলে উঠলেন, “ইলেকশন হইব তো?”
তফসিল ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, এ সপ্তাহের শেষেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট। কিন্তু ওই চা দোকানির মত অনেকের মুখেই একই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক পাড়ায় আবার চলছে অন্য আলাপ। বেশ কয়েকটি দলের নেতাদের মুখ থেকে ইতোমধ্যে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ শঙ্কার কথা এসেছে।
বিএনপি নেতারা ওই শঙ্কা ধরে অভিযোগের আঙুল তুলছেন জামায়াতে ইসলামীর দিকে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচনের ‘নিরপেক্ষতা ও স্পষ্টতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে’ বিএনপির অবস্থান কী হবে, সে আলোচনাও আছে দলটির মধ্যে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বরং বিএনপিকে নিয়েই পাল্টা সন্দেহের কথা বলছেন তারা।
রাজনীতির বিশ্লেষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে ‘ভোটের ফল বিপক্ষে গেলে প্রত্যাখান করার ক্ষেত্র প্রস্তুত রাখার চেষ্টা’ দেখতে পাচ্ছেন।
আর তিন দশকের বেশি সময় নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব পালন করে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া জেসমিন টুলী বলছেন, দলগুলো ‘চাপে রাখার কৌশল থেকে’ আগেই অভিযোগ তুলে রাখছে।
বিএনপি গত ৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তোলে। দলটির নির্বাচনি মুখপাত্র মাহদী আমিন লক্ষ্মীপুরে ‘ভোটের সিল তৈরির’ অভিযোগ করেন। ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ‘জাল ভোটের প্রস্তুতির’ কথাও সংবাদ সম্মেলনে বলেন।
ভোটে কারচুপি ও জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা ১১ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ূম। ২০ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে “কিছু মহল ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হুঁশিয়ার করে বলেন, “দিন শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং টেকে না, অতীতে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিণতি সবাই দেখেছে।”

শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুনুর রশীদ তার নির্বাচনি প্রচারের বক্তৃতায় বলেন, “ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চিন্তা করলে পিঠের চামড়া থাকবে না।”
কেবল বিএনপি নয়, জাতীয় পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন দলের তরফে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা অনিয়ম-কারচুপির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন অংশের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গত ২৫ জানুয়ারি নির্বাচনি প্রচারে অনুসারীদের বলেন, এই নির্বাচনে ‘ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ আশঙ্কা রয়েছে। তেমন হলে ‘ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত’ করতে হবে।
বিএনপির সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাইফুল হক। ঢাকা ১২ আসনের এই প্রার্থী বলেন, “বিএনপি যথেষ্ট কনফিডেন্ট। ইঞ্জিনিয়ারিং যে হতে পারে, সেটা বিএনপির বিবেচনার মধ্যে আছে। তাদের কাউন্টারপার্ট এরকম কিছু থাকতে পারে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা করতে পারে। এটা কীভাবে বন্ধ করা যায় বিএনপি সেই চেষ্টা করবে।”
বিষয়টির ব্যাখ্যা করে সাইফুল হক বলেন, “ভোটারদের কেন্দ্রে আনার একটা বিষয় আছে। হোপফুলি বিএনপি চেষ্টা করবে অনুপস্থিত ভোটারদের ভোটে আনতে। কিন্তু বিএনপির তো জামায়াতের মত ওই ধরনের তৎপরতা নাই।”
বিএনপি জোটের এই প্রার্থী অভিযোগ করেন, “সরকারের একটা অংশ জামায়াতের হয়ে কাজ করছে, এটা স্পষ্ট। এটাকে কিছুটা নিউট্রালাইজ করা যায় কিনা, এটা একটা প্রশ্ন। সরকার প্রফেশনালি নিরপেক্ষতা রাখতে পারছে না। এটাতো সবাই দেখতে পাচ্ছে।”
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ অবশ্য একাধিকবার বলেছেন, এবারের নির্বাচনে কোনো অনিয়ম-কারচুপির ‘সুযোগ নেই’।
তবে বিএনপির একাধিক ঘনিষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতের সাম্প্রতিক বেশ কিছু আচরণে তাদের সন্দেহ বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে ‘অস্বস্তি’ রয়েছে।
ওই অস্বস্তির বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, “কিছু না রটলে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আলোচনা হয় কী করে? এরকম রটতেছে কেন। ন্যাচারালি যা রটে, তা কিছুটা হলেও বটে।”
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পরিষদের এই নেতার ভাষ্য, “বিএনপি ধৈর্য ধরে অবজারভ করছে। ইলেকশন কমিশনকে বারবার জানাচ্ছে। তারা ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা আশা করি।”
বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমকে বলেন, “প্রথমত, অনেকগুলো ইনফরমেশন আসছে যে এগুলো হবে। অনেকের প্রেডিকশন আছে, কিছু কিছু ব্যাপারে আশঙ্কাও আছে যে, নির্বাচন নিয়ে সন্ত্রাস বা ঝুঁকিপূর্ণ সেন্টারগুলো আছে, সেখানে বিভিন্ন ধরনের ইয়ে করার জন্য একদল ষড়যন্ত্র করছে। এজন্য ওভারঅল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন কথাবার্তা আসছে।”

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো যে নির্বাচন কমিশনে জানানো হচ্ছে, সে কথাও বলেন দলটির এই নেতা।
“নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তাদেরকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি যে কোন চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র বা সন্ত্রাস হলে জনগণ যাতে প্রতিরোধ করে।”
বিএনপির পক্ষ থেকে যে জামায়াতের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হচ্ছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান জুবায়ের বলেন, “এগুলো তো বায়বীয় অভিযোগ। বিএনপি যে অভিযোগগুলা করছে, আমরা তো দেখছি বিএনপিই কাজগুলো করছে।
“তাদের কাজটাকে হালাল করার জন্য, জায়েজ করার জন্য তারা আমাদের ওপর এগুলা চাপিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াস নিচ্ছে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই ধরনের কোনো অন্যায় কাজের সাথে আমরা কখনো ছিলাম না, আমরা সামনেও থাকব না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলছেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ আশঙ্কার কথা আসতে পারে দুটি কারণে।
“একটি হচ্ছে, এই অন্তবর্তী সরকার কখনোই কোনো শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। প্রত্যেক ক্ষেত্রে দুই পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে…। প্রশাসন সাজানো থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রেই দুই দলের অবস্থান। নিজেদের জাজমেন্ট ইউজ না করে…।
“তো আপনি যখন শুরুতেই এরকম করেন, আগে থেকেই প্রশাসনের ভেতরে বা সব জায়গায় দুই দলের পছন্দের লোকজনকেই বসিয়ে রেখেছেন, আপনি তো শুরুতেই বিতর্ক সৃষ্টির রাস্তা তৈরি করে রেখেছেন।”
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পুরনো একটি কৌশলের কথা মনে করিয়ে দেন এই বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “নির্বাচনের রেজাল্ট যদি তাদের পক্ষে না যায়, সে কারণে তারা এই আলাপগুলো এখনই করে রাখছে, তারা যেন পরবর্তী সময়ে তা ব্যবহার করতে পারে–যে ‘আগেই বলেছিলাম, আমাদের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে হারানো হয়েছে’।”

আসিফ শাহান বলেন, “আমরা আগের ইলেকশনগুলোতেও দেখেছি। ইলেকশনের রেজাল্ট গ্রহণ না করার যে প্রবণতা, সেটার পরিবর্তন হবে বলে মনে হচ্ছে না। দুটো পার্টি–যেই হারুক বা জিতুক, আমার মনে হয় কোয়েশ্চেনগুলো রেইজ করা শুরু করবে। এটাকে দুটো পার্টি তাদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে।”
ভোটের চার দিন আগে এমন অবিশ্বাস, সন্দেহ দূর করতে সরকার কী করতে পারে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, “সরকারের এই মুহূর্তে আর কিছু করার নাই। সরকার যা করার করে ফেলছে। এখন যে যাই বলুক না কেন, কোনো দলই তাকে বিশ্বাস করবে না। কোনো দল বিশ্বাস করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
“এখন সরাসরি দেখা যাচ্ছে, চোখে পড়ছে–এরকম কোনো ঘটনা যেন কেউ তৈরি না করে, সেটা নিশ্চিত করা ছাড়া তার (সরকারের) কিছু করার নাই। কিন্তু প্রশাসনের কেউ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে–এরকম কোনো নিউজ বা ভিডিও যদি প্রচার হয়ে যায়, তাহলে সেটা হবে কফিনে শেষ পেরেক।”
অবশ্য নির্বাচন কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ভরসা রাখতে চান।
তিনি বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন হচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এখানে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা যদি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চেষ্টা না করেন, তাহলে তেমন কিছু ঘটার কোনো শঙ্কা নাই।
“আমার কাছে মনে হয় এটা চাপে রাখার জন্য। এবং পরবর্তীতে যেন তারা কথা বলতে পারে।”