অভিমানে দূরে জামায়াত, নেই যুগপৎ আন্দোলনে

“বিএনপি আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে যেটা ঘোষণা করছে, সেটা তো যুগপৎ হলো না”, বলছেন জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ।

ওয়াসেক বিল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 Feb 2023, 03:40 AM
Updated : 4 Feb 2023, 03:40 AM

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেও ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বরের পর আর কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেয়নি জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরানোসহ ১০ দাবিতে বিভাগীয় শহরগুলোতে শনিবারের সমাবেশের দিনও হাত গুটিয়ে থাকবে দলটি।

বিএনপির সঙ্গে দূরত্বের বিষয়টি জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দের কথাতেও স্পষ্ট। বিএনপি আলোচনা না করে কর্মসূচি দিলে জামায়াত তাতে অংশ নেবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাদের আলোচনার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই। বরং ‘দূরত্ব রাখার’ নির্দেশ আছে। ফলে জামায়াত তাদের কর্মসূচিতে এল কি এল না, সেটা নিয়ে তারা ‘ভাবছেন না’।

১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে বিএনপি। পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জোট ছেড়ে চলে গেলেও দলের একটি অংশ বিজেপি নামে দল গঠন করে থেকে যায় জোটে।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ও পায় তারা। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি হয় জোটের। এরপর বিএনপি জোটের আকার বাড়িয়ে ১৮ দলীয় এবং পরে ২০ দলীয় জোট গঠন করে।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই জোটের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে আরও একটি জোট গঠন করে বিএনপি।

এবার জোট বাদ দিয়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। তবে জোট ভেঙে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।

গত ৮ ডিসেম্বর রাজধানীতে করা এক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধির প্রশ্নে জোট ভেঙে দেয়ার বিষয়টি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

পরদিন শরিক দলের কয়েকজন নেতাকে ডেকে নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হয় বলে ২২ ডিসেম্বর জানান বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম।

জোট ভেঙে দিলেও সাবেক শরিকরা সবাই বিএনপির দাবিতে ‘একমত’ পোষণ করে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়।

শুরুতে মাঠে নামলেও পরে আগ্রহ হারায় জামায়াত

১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠের বিভাগীয় সমাবেশ থেকে বিএনপি ১০ দফা দাবিতে কর্মসূচির ঘোষণা দেয় ২৪ ডিসেম্বর।

একই দিন গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় জামায়াত। তারাও বিএনপির মতই ১০ দফা দাবি এবং ২৪ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সব জেলায় মিছিল করার সিদ্ধান্ত জানায়।

তবে সেদিন ঢাকায় আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের কারণে দলটির সমালোচনার মুখে ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর কর্মসূচি স্থগিত করে বিএনপি। পরদিন বিজ্ঞপ্তি আসে জামায়াতেরও। তারাও ঢাকার কর্মসূচি স্থগিত করে।

২৪ ডিসেম্বর জেলায় জেলায় বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতও মিছিল করেছে বলে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানায় দলটি।

১৭ ডিসেম্বর বিএনপি জানায়, ঢাকার স্থগিত ‘গণমিছিলটি’ হবে ৩০ ডিসেম্বর। সেটি শুরু হবে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় থেকে। পরদিন আসে জামায়াতের বিজ্ঞপ্তি, তারা বায়তুল মোকাররমে জড়ো হয়ে মিছিল বের করার ঘোষণা দেয়।

৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দিয়ে সেখানে যায়নি জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। পরে মালিবাগে ঝটিকা মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ৫ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় ১৫ জনকে।

সেদিনের পর এখন পর্যন্ত যুগপৎ কর্মসূচির ঘোষণা এসেছে আরও চারটি। এর মধ্যে ১১ জানুয়ারি ‘অবস্থান কর্মসূচি’, ‘বিদ্যুতের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার ও ১০ দফা দাবিতে’ ১৬ জানুয়ারি ‘বিক্ষোভ সমাবেশ’ এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সমাবেশ ডাকা হয়।

চতুর্থ কর্মসূচিটি পালিত হবে শনিবার। দেশের সব বিভাগীয় শহরে এই সমাবেশের এই কর্মসূচি যুগপৎভাবেই পালিত হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি।

তবে এই চারটি কর্মসূচির একটিতেও নেই জামায়াত।

অসন্তোষ গোপন রাখেননি জামায়াত নেতা

বিএনপির কর্মসূচির দিন ২০ দলের সাবেক শরিক ও গণতন্ত্র মঞ্চ মাঠে নামলেও জামায়াত কেন দূরে, এই প্রশ্নে দলের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দের বক্তব্য উঠে এসেছে ‘অভিমান’ আর ‘অসন্তোষের’ সুর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তারা যুগপৎ আন্দোলনে আছে। কিন্তু বিএনপি আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে যেটা ঘোষণা করছে, সেটা তো যুগপৎ হল না। আমরা আলাদা দল, আলাদা কর্মসূচি আছে। বিএনপির কর্মসূচি সফল করা তো আমাদের দায়িত্ব না।”

এ বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত আলোচনা করেছে কি না প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “আলোচনার সিদ্ধান্ত আছে। কিন্তু সেভাবে আলোচনা হয়নি।”

তাহলে কি জামায়াত আলোচনার চেষ্টা করছে? এর উত্তরে মতিউর বলেন, “চেষ্টার তো কিছু নাই। বিএনপি বলেছে যুগপৎ আন্দোলন করবে। কে না বলেছেন এই কথা? মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নজরুল ইসলাম খান বলেছেন। এখন তারা যদি সেটা না করে, তাহলে তো আমাদের দায় নেই।”

তাহলে কি বিএনপির সাথে কোনো যোগাযোগই হয়নি? জামায়াতের প্রচার সম্পাদকের উত্তর, “যোগাযোগ হয়েছে, কিন্তু সেভাবে আলোচনা হয়নি।”

মতিউর রহমান আকন্দের বিএনপিকে নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ পাচ্ছে কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল তার কাছে।

উত্তরে তিনি বলেন, “কথা শক্তভাবে বললে সেটা যদি অসন্তুষ্টি মনে করেন, তাতে কিছু যায় আসে না। তবে রাজনীতিতে নামলে যেটা বাস্তব সেই কথাটা তো বলতে হবে।”

যুগপৎ আন্দোলনে সমমনাদের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য গত ২৬ ডিসেম্বর লিঁয়াজো কমিটি গঠন করে বিএনপি। গত ২৯ জানুয়ারি ২০ দলের পর সাবেক শরিকদের নিয়ে গঠন করা ১২ দলীয় জোটের সঙ্গে আলোচনাতেও বসে দলটি।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মতিউর রহমান বলেন, “তারা বাংলাদেশের সকল লোকের সঙ্গে বসবে বা বসেছে, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমাদের কথা হল, অবশ্যই জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তা না করে নিজেরা নিজেরা কর্মসূচি ঘোষণা করলে সেটা তো পরিপূর্ণ যুগপৎ আন্দোলন হলো না।”

বিএনপি কী বলছে?

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান আকন্দের এই বক্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, জোটের ওই সাবেক শরিকের সঙ্গে তাদের দূরত্ব রাখতে বলা হয়েছে। এমনকি এ প্রসঙ্গে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে।

২০ দলীয় জোটে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জামায়াত নিয়ে আমরা কোনো কথা বলতে চাই না। তবে কারা যুগপৎ আন্দোলন করছেন, সেটা আপনারা দেখছেন। তারা তো মাঠেই আছে। আবার সরকারের দমন পীড়নে অনেকেই সেভাবে আসতে পারছে না, সেটাও আপনারা জানেন।”

যুগপৎ আন্দোলনে কারা

জামায়াতের গুটিয়ে থাকার মধ্যে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে যারা সক্রিয় আছেন, তাদের মধ্যে এই মুহূর্তে বেশি আলোচিত সাতটি দল ও সংগঠনের মোর্চা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’।

এই মঞ্চের দলগুলো হল: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

২২ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করা ১২ দলীয় জোটের দলগুলো হলো: জাতীয় পার্টি (জাফর), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় দল, এনডিপি, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (একাংশ), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (একাংশ), ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (একাংশ), বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি (একাংশ) এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (একাংশ)।

২৯ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করা ১১ দলের ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের’ দলগুলো হল: ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জাগপা (খন্দকার লুৎফুর), ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল), বাংলাদেশ ন্যাপ, বিকল্পধারা (নুরুল আমিন), সাম্যবাদী দল, গণদল, ন্যাপ-ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, পিপলস লীগ ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি।

চার দলের জোট ‘গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য’ও পালন করছে যুগপৎ কর্মসূচি। এই জোটের দলগুলো হল: সাম্যবাদী দল (মার্কবাদী-লেলিনবাদী), সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এবং প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল।

একক দল হিসেবে অলি আহমেদের এলডিপি, মোস্তফা মহসিন মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরাম এবং বাবুল সরদার চাখারীর বাংলাদেশ পিপলস পার্টিও বিএনপির সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই দাবিতে একই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে।