Published : 12 Mar 2026, 12:48 AM
সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ আশঙ্কার কথা এসেছিল কয়েকজন বিএনপির প্রার্থীর তরফে।
সে সময় তাদের বিপক্ষ দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে আশঙ্কার কথা বলা হয়; তার পাল্টায় জামায়াতও একই আশঙ্কার কথা বলেছিল।
নির্বাচনের পর জামায়াত এবং তার জোটের দুই শরিক এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের পক্ষ থেকে জোরেশারেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তোলা হল।

তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরদ্ধে এই অভিযোগ তোলার পাশাপাশি দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
বিরোধী শিবিরের এই অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি সরকার ও দলের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি।
বৃহস্পতিবার সংসদের অধিবেশন বসছে, তার আগে জামায়াত ও তার মিত্ররা কেন এই অভিযোগ তুলছে? সরকারই বা কেন চুপ?
জামায়াত, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কয়েকজন নেতা বলেছেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদে ও সংসদের বাইরে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করবেন তারা।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ ‘আমলে’ নিচ্ছে না সরকার।
বরং বিরোধীদের পক্ষ থেকে ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’ হিসেবেই অভিযোগটিকে দেখছেন সরকারের কেউ-কেউ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা পাগলের প্রলাপের মতো; টোটালি ম্যাডনেস; একটি সর্বজন স্বীকৃত নির্বাচনকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, জনগণ তাদের একসেপ্ট করবে না।”
তিনি বলেন, “মানুষ এটা গ্রহণ করবে না। যারা দাবি করছে, এটা করে তারা নিজেদের খাটো করে ফেলছে। তারা মাটির তল পাচ্ছে না।”
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট হয়।
নির্বাচনে ২০৯ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পাঁচদিন পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি।
দুটি আসনের ফল ঘোষণা স্থগিত আছে, একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নতুন তফসিল হবে।
গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়ায় রাজনীতির মঞ্চে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেই। এবার ভোটেও ছিল না দলটি। ফলে বিএনপির এক সময়ের মিত্র জামায়াত ৬৮ নিয়ে সংসদের বিরোধী দলে আসনে বসছে।

কেন এই অভিযোগ?
গেল ৬ মার্চ জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে নির্বাচিত সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে’ ভূমিকা রেখেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে জামায়াত নেতা তাহের বলেন, “সম্প্রতি তিনি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, ‘যারা নারীদের উপযুক্ত অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও আমরা তাদের মূলধারা বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দিইনি।’
“তাহলে বোঝা যায়, আমরা, যে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ কথা আসছিল, বা আসছে, সেটাকেই উনি নিজেই স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।”
আব্দুল্লাহ তাহের বলেন, “আমরা এখন এটাকে জানতে চাই ওনার কাছে, বা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এবং আজকের সরকারের কাছে, যে তারা তাদের যোগসাজশে কী ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মূলধারা বা প্রধান দল হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তারা বাধাগ্রস্ত করেছে।”
তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট যে খলিলুর রহমান ছিলেন লন্ডন ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা। সেখান থেকে সরকারকে মোটিভেট করে, ষড়যন্ত্র করে বর্তমান যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদেরকে সুবিধা দেওয়ার জন্য উনি অব্যাহতভাবে কাজ করেছিলেন। তার সেই কাজের পুরস্কার হিসেবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রিওয়ার্ডটা পেয়েছেন।”
সে দিন জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৫৩টি আসনে অনিয়ম নিয়ে তারা অভিযোগ দায়ের করেছে।
জামায়াত নেতা তাহের এই অভিযোগ তোলার পরদিন শুক্রবার দলটি খলিলুর রহমান ও রিজওয়ানা হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তার পরে আর এ নিয়ে কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি।

জানতে চাইলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, “এই ইস্যুটি দুদিকেই যাবে। আমরা সংসদে সবকিছু সমাধানের পক্ষে। কিন্তু সংসদে সেই পরিবেশ তৈরি না হলে, আমরা রাজপথে আসবো। আমরা একা নই, আমাদের সঙ্গে যারা আছে, সবাই মিলে আন্দোলনে যাবো।”
এক প্রশ্নের জবাবে আযাদ দাবি করেন যে ‘উপদেষ্টা দুইজন তো আছেনই’, আরও কে কে আছেন, আস্তে আস্তে ‘বের হবে’।
সংসদ তাদের ভূমিকা নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনে পরাজিত এই প্রার্থী বলেন, “নতুন সংসদের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত-গঠনমূলকভাবে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা রাখবো। সংসদেই রাজনৈতিক ইস্যুগুলো সমাধানের পজিটিভ ভূমিকা রাখবো।
“সরকার নেতিবাচক রাজনীতি করলে আমাদের ইতিবাচক থাকার সুযোগ নাই।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আযাদ বলেন, “দেশে আরও বড় ইস্যু আছে, জুলাই সনদ আছে। জনগণের রায় বাস্তবায়ন না করা মানে তাদের অপমানিত করা।”
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যের শপথ নেন বিএনপির বিজয়ীরা। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত ও তার মিত্র দলের নির্বাচিত সদস্যরা দুই শপথই নিয়েছেন।
এ ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে, বিএনপি সরকার আসলে সংবিধান সংস্কার করবে কি না। সরকারি দলের তরফে বলা হয়েছে, তারা সংবিধান মেনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।
জামায়াত জোটের শরিক এবি পার্টির একজন সিনিয়র নেতা মনে করছেন, ‘জনসাধারণের মধ্যে ধারণা তৈরি করতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আলোচনা সামনে এনেছে জামায়াত।’’
স্থানীয়ভাবে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হতে পারে কিছু আসনে, কিন্তু সেটা এখন প্রমাণ করবে কীভাবে, বলেন তিনি।
জামায়াতের জোটে নির্বাচন করে কোনো আসন না পাওয়া এবি পার্টির এই নেতা গেল শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তথ্য, প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক।”

মানুষের মধ্যে ‘ধারণা’ তৈরি করার বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ তাহের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে নির্বাচনের দিন থেকে। এটা মানুষও বলছে, মানুষ বিশ্বাস করে।”
এই দাবি তোলার পেছনে জামায়াতে লক্ষ্য কী? জবাবে তিনি বলেন, “এই ইস্যুতে আমরা আলাপ করবো। সংসদেও আলোচনা হবে। জনগণ বিশ্বাস করে, জামায়াত বেশিরভাগ আসনে জিতেছে।”
জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগটিকে রাজনৈতিকভাবেই আলোচনায় রাখার পক্ষে জামায়াত।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন-সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি মাঠে রাজনৈতিক দাবিকেন্দ্রিক কর্মসূচিও দেবেন। এ ক্ষেত্রে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগের পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি থাকবে।
বিএনপির সরকার গঠনের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারিই অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করায় প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নির্বাচিত নাহিদ ইসলাম।
সে দিন তিনি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তুলে বলেন, “আমরা দেখলাম যে ফলাফলে কারচুপি হল, অনেকগুলো আসন হারিয়ে দেওয়া হল আমাদেরকে। পরিকল্পনা করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সরকারি দল নিয়ে নিল, এই সংবিধান সংস্কার যাতে না হয়, এই জটিলতা, এটা পুরাটাই কিন্তু একটা ইঞ্জিনিয়ারিং আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আজকে জাতির সামনে সেটা উন্মোচন হচ্ছে খলিলুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে।”
গেল ২ মার্চ চট্টগ্রামে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম আবারো খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ পুরষ্কার হিসেবে দেওয়া হল কিনা, তা সরকার স্পষ্ট করতে বলেছেন।
এ নিয়ে দলটি কোনো কর্মসূচি দেবে কি না, জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হোসাইন বলছেন, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে জানা যাবে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলছেন, “শুধু জামায়াতে ইসলামী নয় বিএনপি, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ প্রায় সকল দলের বিভিন্ন নেতারাই নির্বাচনে নানা ধরনের ‘কারচুপির’ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন।
“আমি নিজেও আমার নির্বাচনি এলাকায় সন্ত্রাস ও অনিয়মের সুস্পষ্ট অভিযোগ রিটার্নিং অফিসারের নিকট লিখিতভাবে জানিয়েছি। আমাদের দলের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার ফুয়াদও তার নির্বাচনি আসনে ব্যাপক অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন; কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি। নির্বাচন কমিশন কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি।”

নির্বাচনের দিন মাঝরাতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জাল ভোট ও দেরিতে ফল ঘোষণা নিয়ে অভিযোগ করেন ঢাকা-১৩ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোটের ফলাফলে ‘কারচুপি করে’ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের কয়েকজন প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করে এর প্রতিকার দাবি করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
নির্বাচনে ‘কারচুপির’ প্রতিকার না পেলে ‘নিজেদের পথ’ ধরার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদেরকে যদি বাধ্য করা হয় তাহলে রাজপথেও নামব।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন।
সোমবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে বলে মনে করি। আমার আসনেও হয়েছে, আমাকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
মঙ্গলবার আদালতে ঢাকা-১৩ আসনে ভোটে অনিয়ম নিয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছেন মামুনুল হক।
তিনি বলেছেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যু মূল ফোকাস। দ্বিতীয় বিষয়, নির্বাচনে কিছু আসনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। এই ইস্যুতে আমরা ২৪ এপ্রিলে গণসমাবেশ করবো।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবীর মিলনায়তনে গোলটেবিল বৈঠক করেছে তার দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের শরিক নেতারা ছিলেন সেখানে।

জোটগত কর্মসূচি কি আসবে?
নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ ইস্যুতে কর্মসূচি দিলে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে তা সমন্বিতভাবে দেওয়া হবে কি না, এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলছেন, “জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নে দেশবাসী রায় দিয়েছে। গণভোটের গণরায়কে অবহেলা করা চলবে না। আগামী এপ্রিল থেকেই এ ইস্যুতে সোচ্চার হবো আমরা।”
নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটেরও সমাপ্তি হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন কীভাবে (জোট) থাকবে, কীভাবে সক্রিয় হবে আলোচনা হয়নি।”
তবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১১ দল সমন্বিতভাবে কাজ করার একটা প্রয়োজনীয়তা তো দেখতে পাচ্ছি। রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে শক্তিশালী বিরোধী দল হতে হবে। আমরা এক না হলে শক্তিশালী হওয়া যাবে না।”
রোববার বিকালে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই উপদেষ্টাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত। এরপর এই ইস্যুতে এখনো কোনও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।”
এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “ঈদের পর বলা যাবে, ১১ দলীয় জোটের পরবর্তী অবস্থান কী হবে।”

বিএনপি কী বলছে
নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে ৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ আশঙ্কার কথা বলে বিএনপি। দনের নির্বাচনি মুখপাত্র মাহদী আমিন লক্ষ্মীপুরে ‘ভোটের সিল তৈরির’ অভিযোগ করেন। ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ‘জাল ভোটের প্রস্তুতির’ কথাও সংবাদ সম্মেলনে বলেন।
ভোটে কারচুপি ও জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ূম। ২০ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে “কিছু মহল ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করতে পারে।”
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হুঁশিয়ার করে বলেন, “দিন শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং টেকে না, অতীতে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিণতি সবাই দেখেছে।”
৭ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুনুর রশীদ তার নির্বাচনি প্রচারের বক্তৃতায় বলেন, “ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চিন্তা করলে পিঠের চামড়া থাকবে না।”
কেবল বিএনপি নয়, জাতীয় পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন দলের তরফে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা অনিয়ম-কারচুপির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপির একাধিক নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ নিয়ে কোনো দৃশ্যমান অবস্থান থাকবে না। নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার পক্ষে জ্যেষ্ঠ নেতারা।
ঢাকা-১৬ আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে ধানের শীষের প্রার্থী আমিনুল হকের আবেদন করেছেন। তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত। এ সংক্রান্ত হাইকোর্ট বেঞ্চ তার আবেদন গ্রহণ করেছে।
বিএনপির আইন সহায়তা উপকমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, তার মাধ্যমে আদালতে ৬টি আবেদন করা হয়েছে।
রোববার আরও দুটি আবেদন করার কথা বলেছেন তিনি। তবে কতজন আবেদন করেছেন, তা বলতে পারেননি রুহুল কুদ্দুস কাজল।
এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির এই সদস্য বলেন, “তারা (জামায়াত) মনের সুখে এই (‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’) অভিযোগ তুলেছে।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতার পর্যবেক্ষণ হল, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে জামায়াত। এক্ষেত্রে সংসদে ও সংসদের বাইরে প্রকৃত বিরোধী দলের ‘ভাবমূর্তি’ অর্জন করতে চায় দলটি। এজন্য ‘শক্ত ভাষায়’ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখা যাবে জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের।
বিএনপির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে’র অভিযোগ রাজনৈতিক। এটা ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’।
শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারা দুনিয়া দেখেছে, দেশের মানুষ দেখেছে নির্বাচন কেমন হয়েছে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ হবে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রকৃতপক্ষে। ওরা (জামায়াত) এত ভোট পায় কী করে। এটাকে ইস্যু করে কোনো লাভ হবে না।”
আগের খবর:
খলিলুর ও রিজওয়ানা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জড়িত’ ছিলেন: জামায়াতের তাহের