Published : 30 Jun 2026, 02:15 PM
ইতালির রোমের বাংলাদেশি এক পরিবারের তিন সদস্যকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ।
তার খোঁজে ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছেন তদন্তকারীরা। এর মধ্যে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও সামনে আসছে।
শাহাদাত রোম মহানগর বিএনপির মন্তেমারিও শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব ছিলেন বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নোয়াখালী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছাবের আহাম্মেদ অবশ্য দাবি করছেন, নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে শাহাদাতকে আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
শাহাদাতকে গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে ইতালীয় পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রাজনৈতিক সহকর্মী বা পরিচিতরা হয়ত তাকে পালিয়ে থাকতে সহায়তা করছে।
ইতালির সংবাদমাধ্যম ইল মেসাজ্জেরোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৩ বছর বয়সি শাহাদাত হোসেন রোমে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ। এ কারণে সেখানকার পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে তার ছবি প্রকাশের আগেই দেশে-বিদেশে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়া তার বেশ কিছু ছবি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন ‘সক্রিয় নেতা’। ওই রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার সোশাল মিডিয়ার সূত্রগুলোও এখন তদন্তের আওতায় এনেছে ইতালীয় পুলিশ।
ইল মেসাজ্জেরো লিখেছে, ফেইসবুকে প্রোফাইলে তার অসংখ্য ছবি রয়েছে, যেখানে রোমে ও বাংলাদেশে তাকে সমাবেশ, সেমিনার, বিক্ষোভ ও মঞ্চে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। দলীয় নেতাদের পাশে বসে থাকা এবং ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটির পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার ছবি রয়েছে।
এসব ছবি ও ভিডিও থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি রোমের বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কে বেশ ভালোভাবেই যুক্ত ছিলেন।
পত্রিকাটি লিখেছে, সন্দেহ করা হচ্ছে, দলের কোনো বন্ধু বা তার কোনো সমর্থক তাকে লুকিয়ে রেখেছে কিংবা হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। হয়ত তাকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে সহায়তা করা হয়েছে, সেখানে তার স্ত্রী ও মেয়ে থাকেন। শাহাদাত বাংলাদেশেও চলে গিয়ে থাকতে পারেন, সেখানে তার বহু আত্মীয় স্বজন রয়েছে।
পুলিশ এখনো কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছে না এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন—এমন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
শাহাদাতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা বাংলাদেশে হলেও পরে তা রোমেও অব্যাহত ছিল বলে ইল মেসাজ্জেরোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ইতালি বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কিছু ‘খারাপ’ মানুষের জন্য বিএনপির ‘দুর্নাম’ হচ্ছে।
এই শাহাদাৎকে কে বা কারা দলে অন্তর্ভুক্ত করিয়েছিল বা এখানে কোনো স্বার্থ লুকিয়ে ছিল কি না তা এখনই খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

রোমের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শাহাদাত ইতালি বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঢালী নাসির উদ্দীন ও ইতালির বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ফেইসবুকে তাদের সঙ্গে শাহাদাতের বেশ কিছু ছবিও রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে ইতালি বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঢালী নাসির উদ্দীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
ইতালির বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসারের বক্তব্যও জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
রোম প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পুলিশের বিশেষ তদন্ত ইউনিট হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তারে ইতালিজুড়ে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিভিন্ন সীমান্তপথ, সড়ক ও সম্ভাব্য পালানোর রুটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কাসালোত্তির আশপাশের গ্রামীণ এলাকা এবং চোচিয়ারিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন খামারবাড়িতে তল্লাশিও চালানো হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের দিন ২৬ জুন ফ্রোসিনোনে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতালিতে বসবাসের অনুমতিপত্র (রেসিডেন্স পারমিট) সংগ্রহ করেছিলেন শাহাদাত।
তবে তাকে পালিয়ে থাকতে সহায়তা করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনেনি ইতালীয় কর্তৃপক্ষ।
ইতালির সংবাদমাধ্যম ফ্যানপোস্ট লিখেছে, হত্যাকাণ্ডের পর শাহাদাত আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন–এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। সে কারণে টাইবার নদীসহ আশপাশের জলপথেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

গত ২৬ জুন রাতে রোমের কাসালোত্তি এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে বাংলাদেশি এক পরিবারের ৩ সদস্যকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। তারা হলেন—কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু আক্তার (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা।
তাদের ছেলে আমির হোসেন আয়ানকে (২০) গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নিহত বাবুলের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে। শাহাদাতও নোয়াখালীর ছেলে। তাদের দুজনের আগে থেকে পরিচয় ছিল।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে। তবে এখন তদন্তকারীদের ধারণা, পুরো ঘটনা আরও দীর্ঘ সময় ধরে ঘটতে পারে।
তদন্ত বলছে, শাহাদাত প্রথমে আরজু ও তার মেয়ে আরিশাকে হত্যা করেন। এরপর কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পর বাবুলের ওপর হামলা চালানো হয়। সবশেষে বাসায় ফিরে আক্রান্ত হন আয়ান।
আহত আয়ান তদন্তকারীদের বলেছেন, সেদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরেই তিনি দেখেন, শাহাদাৎ বাসায় বসে আছেন। বাসায় ঢোকার পর প্রথমে তিনি অস্বাভাবিক কিছু বুঝতে পারেননি, কারণ শাহাদাৎ তিনজনকে খুন করে লাশ লুকিয়ে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের রক্তের দাগ পরিষ্কার করে ফেলেছিলেন।
পরে বাবা-মায়ের কক্ষের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খাটের নিচ থেকে ছোট বোনের একটি পা বেরিয়ে থাকতে দেখে আয়ান বুঝতে পারেন, ভয়াবহ কিছু ঘটেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শাহাদাৎ ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান বলে তার ভাষ্য।
তবে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন এবং চিৎকার করে আশপাশের লোকজনদের ডাকেন।
আয়ান তদন্তকারীদের বলেন, "সে আমার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছে। আমি বাসায় ফিরে তাকে দেখেছি। সে আমাকেও হত্যার জন্য অপেক্ষা করছিল। গত সপ্তাহে আমাদের ঝগড়া হয়েছিল।"
তিনি দাবি করেন, তার বাবা কমিউনিটির কাছে শাহাদাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।

আয়ানের ভাষ্য, শাহাদাত তার মায়ের প্রতি ‘অস্বাভাবিক’ আচরণ করতেন। এ কারণে তাকে কমিউনিটি থেকে বহিষ্কারের অনুরোধ করেছিলেন তার বাবা।
শাহাদাতের এক রুমমেট, যিনি পেশায় দোকানদার, ইতালীয় সংবাদমাধ্যম ফ্যানপেজকে বলেন, আরজুই রোমে শাহাদাতকে একটি বাসা খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন। সে সময় তাকে নিজের আত্মীয় বলেও পরিচয় দিয়েছিলেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সোশাল মিডিয়া পোস্টের বরাত দিয়ে ইল মেসাজ্জেরো লিখেছে, বাংলাদেশে থাকার সময় শাহাদাতের সঙ্গে আরজুর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে পরে পারিবারিকভাবে বাবুলের সঙ্গে আরজুর বিয়ে হয়।
তদন্তকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহাদাতের একটি পোস্টও খতিয়ে দেখছেন।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা আগে কিশোর কুমারের ‘মেরা জীবন কোরা কাগজ’ গানটি শেয়ার করে ওই ফেইসবুক পোস্টে শাহাদাত লেখেন, “একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকে মরার মত করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সাথে নিয়ে মরা উচিৎ। তাতে কারো জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।”

আরও পড়ুন
ইতালিতে স্বামী-স্ত্রী-মেয়ে খুন: সন্দেহভাজন শাহাদাত ছিলেন ‘পরিবার-বিচ্ছিন্ন’
ইতালিতে স্বামী-স্ত্রী-মেয়ে খুন: নোয়াখালীর বাড়িতে উড়ো চিঠিতে এসেছিল হত্যার হুমকি