তৌফিক ইমরোজ খালিদী: দিব্যকণ্ঠের বরাভয়
সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি, অথচ উগ্র ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লেখার অপরাধে যখন সব দরজা বন্ধ, তখন দূর থেকেই অভয় দিয়েছিলেন—“আপনি লিখুন, আমি আছি।” তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে হাসান মাহমুদের স্মৃতিচারণ।
“অমৃতের সন্তান ধরণীর খেলা সাঙ্গ করিয়া ধুলিমাখা দেহে গৃহে ফিরিয়া গেল।”
তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা চিরকালই ছিল সংজ্ঞার অতীত—চেনা-অচেনা আর দেখা-অদেখার মাঝামাঝি অদ্ভুত এক নামহীন বন্ধন। আমাদের কখনো সামনাসামনি বসা হয়নি, মুখে মুখে একটি কথা বলা হয়নি; অথচ দূর থেকেই আমরা পরস্পরের কাজকে গভীরভাবে চিনেছি, মন থেকে সম্মান জানিয়েছি। সেই অদেখা মানুষটিই জীবনের কোনো এক অমানিশায় দিগন্তের ওপার থেকে অভয় দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আপনি লিখুন, আমি আছি।”
দেশের মিডিয়া জগতের সেই সৃষ্টিশীল দিকপাল, এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবক এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সর্বাধিনায়ক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ২ অক্টোবর হঠাৎই আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে বিদায় নিয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জগতে আজ যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো, দূরদর্শী ও নির্ভীক মানুষ হিসেবে তিনি ততটাই বৃহৎ ছিলেন। অনলাইন সাংবাদিকতাকে এক অনন্য ও আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেওয়া এই পথিকৃৎকে হারানোর খবরটি শুধু বেদনাদায়ক নয়, এক চরম আঘাত।
“পথ হাঁটেন সবাই, পথ তৈরি করেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদী পথিকৃৎ” — সাংবাদিক পাভেল রহমানের এই একটা কথায় সেটা স্পষ্ট।
“তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সবসময়ই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের একত্র রাখার কাজটি করেছে (মূর্খরা বলে ভারতীয় ন্যারেটিভ)। তিনি মূর্খদের কথায় কর্ণপাত করেননি। প্রথম আলো একটি স্লোগান প্রচার করত—‘বদলে যান বদলে ফেলুন’। তখন ইমরোজ ভাইয়ের পোর্টাল পাল্টা প্রচার শুরু করে—‘সবকিছু বদলাতে নেই। কিছু মূল্যবোধ এবং আদর্শ শাশ্বত’” — কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার।
আমাদের কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি, কথা হয়নি; কিন্তু আমরা পরস্পরের কাজকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনেছি ও সম্মান করেছি। সেই কত বছর আগে, যখন দেশ উগ্র ধর্মান্ধতার চোরাবালিতে ডুবছে, তখন আমি ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া তখন ধর্মান্ধদের ভয়ে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ করছে। শারিয়া আইনের ওপরে আমার লেখা, রাকিবুল হাসান পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি কয়েকটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে দেখানো হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখাতে রাজি হয়নি। দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় দুটো খবরের কাগজ আমার শারিয়া-সংক্রান্ত নিবন্ধ একটা প্রকাশের পরে আর ছাপতে রাজি হয়নি।
— সেই অমানিশায় দিগন্তের ওপার থেকে ভেসে এসেছিল: “আপনি লিখুন, আমি আছি।”
— তারপর থেকে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে অনেক স্পর্শকাতর ইসলামী বিষয়ে তথ্যসূত্রসমৃদ্ধ কলাম লিখে গেছি বছরের পর বছর। তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেগুলো লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান ধর্মান্ধ এই দেশে শারিয়া আইনের গঠনমূলক সেই সমালোচনাগুলো অনেকের তীক্ষ্ণ ও তীব্র ভ্রুকুটির কারণ হয়েছিল। দেশে কোনো মিডিয়া ধর্মীয় স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বিষয়ে লেখককে এতটা স্বাধীনতা দেওয়ার সাহস রাখে না। এখানেই তিনি অনন্য। শুধু তাই নয়, কোনো লেখকের অনেকগুলো কলাম নিয়ে আর কোনো মিডিয়া নিজের খরচে বই বের করেছে কিনা, আমি জানি না। এই অনন্য কাজটাও করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী; আমার কলামের বই বের করেছেন — ‘অতঃপর শারিয়া কী বলে?’। এটা আমার প্রথম বই ‘শারিয়া কী বলে, আমরা কী করি’র ধারাবাহিক ইসলামী সাহিত্যকর্ম।
— বাংলাদেশ সংবাদ-জগতের স্লেটে তিনি প্রস্তর স্বাক্ষরে নিজের পদচিহ্ন এঁকে গেছেন, সেটা কোনোদিন মলিন হবে না। জানি না এই উগ্র ধর্মান্ধ দেশে আর কোনো সম্পাদক কোনো ক্রিটিক্যাল ইসলামী লেখককে বলবেন কিনা: “আপনি লিখুন, আমি আছি।” সেই দিব্যকণ্ঠের বরাভয়!
হাসান মাহমুদ: কানাডাপ্রবাসী শারিয়া আইন ও সমাজবিষয়ক গবেষক।
