ভাইব কোডিং থেকে এজেন্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং
সফটওয়্যার প্রকৌশলের আসল বাধা এখন আর টাইপিংয়ের গতি নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হলো নিজের চিন্তার স্বচ্ছতা আর ওই কাজটিকে নিখুঁতভাবে যাচাই করার ক্ষমতা।
গত দশ বছর ধরে নিজে হাতে কোড লিখলেও আমার জার্নির শুরুটা কিন্তু ডেটা ড্রিভেন ওয়ার্ল্ড থেকে। ডেটা বিশ্লেষণ করা আর ওই ডেটা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, এটাই ছিল আমার আসল কাজ। পরে কাজের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে সফটওয়্যার লেখা শুরু করি। মানে দাঁড়াল, এই দুটো টেক্সটবুক জগত একদম কাছে গিয়ে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, মেশিন লার্নিং আর সফটওয়্যার উন্নয়ন একদম উল্টো মেরুর দুটো জিনিস। প্রচলিত সফটওয়্যার উন্নয়নে আমরা কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম বা রুল সেট করে দিই। ওই নিয়মের ওপর ভিত্তি করে একটা ফলাফল চলে আসে। কিন্তু মেশিন লার্নিংয়ের ক্ষেত্রটি একদম উল্টো। এখানে ডেটাই সফটওয়্যার তৈরি করে। সোজা কথায়, ডেটা নিজেই শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয় কীভাবে রুলগুলোকে সেট করতে হবে।
ডেটা দিয়ে রুল সেটের এই চমৎকার ধারণাটাই এখন সফটওয়্যার প্রকৌশলের পুরোনো রূপটাকে একেবারে বদলে দিচ্ছে। সম্প্রতি গুগল একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। নাম হচ্ছে ‘দ্য নিউ এসডিএলসি উইথ ভাইব কোডিং’। সেখানে দেখানো হয়েছে আমাদের চেনা কোড লেখার জীবনচক্র বা এসডিএলসি কতটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আমরা এখন বড় একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে সাধারণ প্রম্পট বা নির্দেশ দিয়ে হালকা কোড বানিয়ে নেওয়া, আর অন্যদিকে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট দিয়ে একদম ব্যবহারের উপযোগী সফটওয়্যার তৈরি করা। এটাকে বলা হচ্ছে এজেন্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং।
ওই গবেষণাপত্রে একটি দারুণ কথা বলা হয়েছে। আজকাল শুধু কোড তৈরির সমস্যাটি কিন্তু একেবারেই সমাধানের পথে। যে কোনো ভালো এআই মডেল এখন এক ক্লিকেই দুর্দান্ত কোড লিখে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের আসল দক্ষতা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। সেটা হলো যাচাইকরণ, বিচারবুদ্ধি আর দিকনির্দেশনা।
মানে এআই যে কোডটা দিল, সেটা আসলেই কাজ করছে কি না, তার মান কেমন, আর পুরো প্রজেক্টটিকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া দরকার, এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু এখনো মানুষেরই।
পুরো প্রক্রিয়াটিকে এখানে একটি স্কেলে ভাগ করা হয়েছে। শুরুতে আসে 'ভাইব কোডিং'। নামটা যেমন অনানুষ্ঠানিক, কাজটাও ঠিক সেরকম। আপনি শুধু এআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে করতে একটি প্রোটোটাইপ বানিয়ে ফেললেন। শুরুর খরচ একদম নেই বললেই চলে, আর দ্রুত কাজ হয়ে যায় বলে মনেও স্বস্তি আসে।
কিন্তু প্রজেক্ট যখন আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করে, তখন এই ভাইব কোডিং বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কোডের ভেতরে এক ধরনের কাঠামোগত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অদৃশ্য ‘টেকনিক্যাল ডেবট’ জমতে জমতে পাহাড় হয়ে যায়। তিন-চার মাস পরেই দেখা যায় ওই কোড আর কোনোভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।
এর ঠিক বিপরীতে আছে ‘এজেন্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং’। এটা হলো আসল পেশাদার পর্যায়ের কাজ। এখানে শুধু নির্দেশ দিয়ে কোড না লিখে আগে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রেমওয়ার্ক বা স্পেসিফিকেশন তৈরি করা হয়। অনুসরণ করা হয় টেস্ট ড্রিভেন ডেভেলপমেন্ট।
কোড পরীক্ষা করার জন্য থাকে নিরাপদ পরীক্ষামূলক পরিবেশ, সঙ্গে থাকে স্বয়ংক্রিয় সিআই/সিডি গেইট আর মানুষের কড়া নজরদারি। শুরুতে এটার পেছনে বিনিয়োগ একটু বেশি লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ একদম হাতের মধ্যে থাকে। তিন-চার মাস পর ভাইব কোডিংয়ের খরচ যেখানে বাড়তেই থাকে, এজেন্টিক ইঞ্জিনিয়ারিং সেখানে বেশ সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল।
গুগলের ওই গবেষণা চমৎকার একটি সূত্র দিয়েছে। একটি প্রকৃত এআই এজেন্ট মানে কিন্তু শুধু একটি বৃহৎ ভাষা মডেল বা এলএলএম নয়। এজেন্ট তৈরি হয় দুটো জিনিসের নিখুঁত সমন্বয়ে, মডেল এবং তার হারনেস।
এখানে মডেলের অবদান মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশই হচ্ছে হারনেস বা কাঠামো। এই কাঠামোর ভেতরে থাকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা ডেটাবেজ, তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা, আর পুরো ব্যবস্থা পরিচালনার একটি সমন্বয় চক্র। বেশিরভাগ সময় কোনো এআই এজেন্ট ব্যর্থ হলে বুঝতে হবে সমস্যাটা মডেলের দুর্বলতা নয়, বরং চারপাশের এই হারনেস ব্যবস্থাটি ঠিকমতো সাজাতে না পারা।
আজকের বাস্তব জগতে যে কোনো সাধারণ বৈশিষ্ট্য যুক্ত করার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ এআই এজেন্ট একাই নামিয়ে ফেলতে পারে। পুনরাবৃত্তিমূলক কোড বা সাধারণ যুক্তি লেখার মতো যান্ত্রিক খাটুনিগুলো ওরাই সামলায়।
কিন্তু বাকি যে জটিল ২০ শতাংশ কাজ, যেমন পেঁচানো বিজনেস লজিক, একাধিক সিস্টেমের ইন্টিগ্রেশন কিংবা সামগ্রিক আর্কিটেকচারাল ভাবনা, সেখানে মানুষের বিচারবুদ্ধি আর প্রেক্ষাপট ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কোড লেখকের ভূমিকা এখন টাইপিস্ট থেকে একলাফে কারখানা ব্যবস্থাপকের মতো হয়ে গেছে।
কারণ, এখনকার কোড লেখকদের মূলত দুটো মোডে সুইচ করে কাজ করতে হয়। একটা হলো 'কন্ডাক্টর' মোড। যেখানে আপনি কোডিং পরিবেশের ভেতরে এআই সহযোগীকে পাশে নিয়ে রিয়েল টাইমে প্রতি লাইনে দিকনির্দেশনা দেবেন।
আর অন্যটা হলো 'অরকেস্ট্রেটর' মোড। এটা আরও ওপরের স্তরের কাজ। এখানে আপনি কয়েকটি স্বাধীন এআই এজেন্টকে একটি বড় লক্ষ্য বুঝিয়ে দিয়ে নিজে কিছুটা চিন্তা মুক্ত হয়ে বসবেন। ব্যাকগ্রাউন্ড কাজ শেষ করে এজেন্টরা যখন কাজের খসড়া পাঠাবে, আপনি শুধু পর্যালোচনা আর যাচাইয়ের কাজটা শেষ করবেন।
দিনশেষে, এই নতুন এআইয়ের যুগে এসে কন্টেক্সট প্রকৌশল বা সঠিক তথ্যভিত্তি সাজানোই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় দক্ষতা। একটি সাধারণ প্রম্পট এআইকে শুধু বলে যে কী করতে হবে। কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য, নির্দেশিকা আর স্থাপত্য নকশা, এগুলোই এআইকে শিখিয়ে দেয় কাজটা ঠিক কীভাবে আপনার প্রতিষ্ঠানের মান মেনে করতে হবে।
মোদ্দা কথা, সফটওয়্যার প্রকৌশলের আসল বাধা এখন আর টাইপিংয়ের গতি নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হলো নিজের চিন্তার স্বচ্ছতা আর ওই কাজটিকে নিখুঁতভাবে যাচাই করার ক্ষমতা।
রকিবুল হাসান: টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক লেখক। ই-মেইল: rakibul.hassan.mail@gmail.com
