Published : 27 Apr 2026, 02:58 PM
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনে পরিপক্বতা, স্বাধীনতা আন্দোলন আর দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নেতৃত্বের ভূমিকায়—বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আব্দুস সামাদ আজাদ।
জন্মেছেন ব্রিটিশ ভারতের সিলেটে ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি। ৮৩ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়ে ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নিজ জন্মস্থান জগন্নাথপুরে নামাজে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের মাধ্যমে ত্রিকালদর্শী বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের যবনিকাপাত ঘটে।
মৃত্যুতেই কি বিলীন হয়ে যায় সামাদ আজাদের মতো নেতাদের আজীবন সংগ্রাম? শেষ হয়ে যায় সব কীর্তি? না, রেশ রয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। বাংলাদেশের উন্মেষ, অভ্যুদয়, নির্মাণ, রূপায়ন ও রূপান্তর—কোথায় নেই তার সক্রিয় ভূমিকা? তিনি তো নিজেই ইতিহাস নির্মাতাদের একজন। রাজনীতিব্রতী এক আপাদমস্তক জননেতা, যার চিন্তা-চেতনায় ছিল দেশপ্রেম আর দলের প্রতি অঙ্গীকার।
সামাদ আজাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা ও দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যেও তিনি সকল দলের কাছে ছিলেন সমাদৃত। ছাত্রজীবনে তিনি যে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, আজীবন সেই একই রাজনীতি লালন করেছেন গভীর অধ্যবসায়ে। রাজনৈতিক জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, অর্জন ও অবমূল্যায়ন মেনে নিয়ে হয়ে উঠেছেন জাতির এক নির্ভরতার প্রতীক। যতদিন বেঁচে ছিলেন, দেশের দ্বন্দ্বমুখর রাজনীতিতে ছিলেন অনেকটা ঐক্যের কাণ্ডারী। বিভিন্ন দল-মত এবং শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ছিলেন সমান শ্রদ্ধার। দল ও দলের বাইরে তিনি ছিলেন সর্বদলীয় অভিভাবক।
১৯৪০ সাল থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। সিলেট জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের ভিপি হিসেবে নির্বাচন করেন। ১৯৫১ সালে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ‘গণতন্ত্রী দল' প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙার দশজন করে মিছিল করার প্রস্তাবক ছিলেন তিনি। ওই দিন তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের শুরু হয়। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের পর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে ন্যাপের সহ-সম্পাদক ও দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর আব্দুস সামাদ আজাদের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে তিনি আত্মগোপনে চলে যান, কিন্তু একসময় গ্রেপ্তার হন। প্রায় চার বছর জেলে থাকার পর ১৯৬২ সালে মুক্তি পান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এনডিএফ গঠিত হলে তিনি সম্মিলিত বিরোধী দলের এই জোটের দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তিনি আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন এবং বৃহত্তর সিলেট আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ও খন্দকার মোশতাক আহমেদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর আব্দুস সামাদ আজাদ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি গঠিত মন্ত্রিসভায় তাকে পুনরায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে তিনি তৎকালীন সিলেট-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি সরকারের কৃষি, সমবায় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর আব্দুস সামাদ আজাদকে এক সপ্তাহ গৃহবন্দি করে রাখা হয়। পরে ২২ অগাস্ট তাকে গ্রেপ্তার করে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত একই সেলে তিনি তাদের সঙ্গে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় সামরিক আদালতে আব্দুস সামাদ আজাদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। চার বছর কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এ সংক্রান্ত এক সাক্ষাৎকারে সামাদ আজাদ বলেছিলেন, "১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তো আমার মৃত্যুদিন হওয়ার কথা ছিল। আমি বর্ধিত জীবন নিয়ে বেঁচে আছি।" একইভাবে কারাগারে থাকাকালে তাজউদ্দীন আহমদ তার স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে বলেছিলেন, "আমাদের আর বাঁচার আশা নেই। সামাদ সাহেব যদি কারাগারের বাইরে থাকতেন, হয়তো কিছু একটা করতে পারতেন।" এই ছিল সামাদ আজাদের প্রতি জাতীয় নেতাদের নির্ভরতা। তিনি আমৃত্যু সেই নির্ভরতার মূল্য রেখেছেন। কারামুক্তির পর সেই সংকটময় সময়ে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে আত্মনিয়োগ করেন। দলে আত্মকলহ, চরম দ্বন্দ্ব ও ভাঙন দেখা দিলে তিনি দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করেন। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। পরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলের জ্যেষ্ঠতম প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে শুধু দলের ভেতর নয়, দেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে ছিলেন নির্ভরযোগ্য জাতীয় নেতা। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনে তিনি জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এই মেয়াদে তিনি ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে অসামান্য অবদান রাখেন। নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাতের মতো বিশ্ব সমাদৃত নেতাদের নিয়ে আসেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে।
আব্দুস সামাদ আজাদ দলীয় রাজনীতিতে যেমন প্রভাব বিস্তার করতেন, তেমনি দলের অভ্যন্তরে নানাভাবে অবদমিতও হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে রাষ্ট্রপতি করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে তা আর হয়নি। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের সভাপতির অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করা জ্যেষ্ঠ নেতাকে বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকে বঞ্চিত করায় অনেকে আহত হয়েছিলেন। তার অসুস্থতার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে দেখতে এসেছিলেন। মৃত্যুর খবর পেয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের নেতারা ছুটে যান হাসপাতালে। তবুও রুগ্ণ রাজনীতির কারণে তার নামাজে জানাজা জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে পারেনি; পালিত হয়নি রাষ্ট্রীয় শোক।
আব্দুস সামাদ আজাদের তিরোধান বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। সামাদ আজাদের অনুপস্থিতিতে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও মন্তব্য করেছিলেন, তিনি জীবিত থাকলে হয়তো দেশে 'ওয়ান ইলেভেন' হতো না। এই যে আস্থা ও বিশ্বাসে ক্রান্তিকালে নাম উচ্চারিত হওয়া, এটাই তো একজন রাজনীতিবিদের সার্থকতা। সামাদ আজাদ গত হয়েছেন ২০ বছর আগে। এখনো তার দলের নেতারা শুধু নয়, অন্যান্য দলের নেতাদেরও বিভিন্ন প্রসঙ্গ ও উপলক্ষে তার নাম নিতে হয়। এমন প্রভাবক রাজনীতিবিদ সত্যিই বিরল। আমৃত্যু যে দলকে সামাদ আজাদ ধ্যান-জ্ঞান মেনেছেন, সেই দলের এখন কার্যক্রম স্থগিত, নেতৃত্ব স্থবির। এই সময়েও অনেকে বলছেন, যদি সামাদ আজাদ বেঁচে থাকতেন তবে একটা পথ বাতলাতে পারতেন; দলকে ঐক্যবদ্ধ করে সময়ের চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসতেন।
আসলে সময়কে ধারণ করা বা সময়ের চাহিদা পূরণে নিজেকে সমর্পিত করাই একজন রাজনীতিবিদের বড় গুণ। সামাদ আজাদ অতীতে বারবার সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। মেধা, বিচক্ষণতা, যোগ্যতা ও একাগ্রতায় তিনি ক্রান্তিকালে দলকে পথ দেখিয়েছেন, দেশ ও জাতিকে সেবা দিয়েছেন। তাই বারবার দুর্যোগে, সংকটে আর উত্তরণে তার নাম নানাভাবে অনুভূত হয়, উচ্চারিত হয়। তিনি প্রকৃতপক্ষেই ক্রান্তিকালের সংশপ্তক। জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।