১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

কী মধু ভিসি পদে, সবাই কেন ইঁদুর দৌড়ে?

ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু উপাচার্য পদে দলীয় অনুগত বসানোর পুরোনো চর্চা বদলায় না। নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি আর রাজনৈতিক ক্যাডার তৈরির চক্র ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ শিক্ষার পরিবেশ ফেরানোর উপায় কী?

কী মধু ভিসি পদে, সবাই কেন ইঁদুর দৌড়ে?

প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর প্রশাসনের সহায়তায় ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস ছাড়েন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম।

আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ

Published : 15 Oct 2026, 01:31 PM

Updated : 15 Oct 2026, 01:31 PM

টানা ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর প্রশাসনের সহযোগিতায় ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস ছাড়েন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছে তার। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন অবস্থায় কার্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের রাতের আঁধারে ক্যাম্পাস ছাড়ার ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। যেমন রাতের আঁধারে ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এ কে এম নুরুন নবী। শুধু তা-ই নয়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছিল তদন্ত কমিটি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক খোন্দকার নাসিরউদ্দিন। নানা অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়ে আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম অহিদুজ্জামান। শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে বিতর্কিত হওয়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস এম ইমামুল হককেও আন্দোলনের মুখে ছুটি দেওয়া হয়েছিল। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ থেকে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়ার ইস্যুতে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জাহাঙ্গীরনগরের সাবেক ভিসি ফারজানা ইসলাম। তার অপসারণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ। ২০১৯ সালের অক্টোবরে আলোচনায় আসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মীজানুর রহমান—যিনি এর আগে ‘বিশেষ কর্মকর্তার’ পদ তৈরি করে এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ছাত্রলীগের ১২ জন নেতাকে নিয়োগ দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। ওই বছরের অক্টোবরে তিনি বলেছিলেন, যুবলীগের দায়িত্ব পেলে তিনি উপাচার্য পদ ছেড়ে দিতে রাজি আছেন।

কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে বারবার ‘সংস্কার’ শব্দটি উচ্চারিত হলেও রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো ইতিবাচক সংস্কার হয়েছে—এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির সরকার গঠনের পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ নিয়ে এমন সব ঘটনা ঘটেছে—যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ এই পদটি যে মূলত একটি রাজনৈতিক পদ, সেটি নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে চুয়েট এবং এর ঠিক আগেই রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ভিসি পদে কী এমন মধু যে যেকোনো মূল্যে এই চেয়ারে বসার জন্য শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মুখিয়ে থাকেন এবং যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের অনুগতরাই কেন ভিসি হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হন? দলনিরপেক্ষ কোনো শিক্ষক কেন ভিসি হতে পারেন না বা সরকারও কেন দলীয় অনুগত শিক্ষকদেরই ভিসি বানাতে চায়?

প্রসঙ্গত, চুয়েটের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে। কিন্তু ৫৬ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে অধ্যাপক শরীফুল আলমকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এরপরই তাকে প্রতিহত করতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই আন্দোলনের শরিক হয়েছেন। নিয়োগ পাওয়ার ২১ দিন পরে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকলেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন। ভিসির কক্ষেই তাকে অবরুদ্ধ করে বাইরে তালা ঝুলিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। তারা সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে চায়।

এই ঘটনার আগেই আলোচনায় আসেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপাচার্যের কক্ষে ঢুকে তাকে পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করেন স্থানীয় বিএনপির কিছু লোক। সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, মব সৃষ্টি করে তাকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। এ সময় উপাচার্যের মুঠোফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরার সিপিইউ ও হার্ডডিস্ক খুলে নেওয়া এবং কয়েকটি কক্ষে তালা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এরপরে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরাই তাকে ক্যাম্পাসে নিয়ে যান। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে উপাচার্যের কক্ষের তালা কেটে খুলে দেওয়া হয়। ভিসিকে নাজেহাল করার ঘটনায় রাজপাড়া থানায় দায়ের করা মামলায় ৫০–৬০ জনকে আসামি করা হয়। কয়েকজন গ্রেপ্তারও হন।

বিএনপি সরকার গঠনের এক মাসের মাথায় গত ১৭ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম ছিল: ‘পুরোনো ধারায় দলের অনুগত শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ’। খবরে বলা হয়, দেশের ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন যাদের নাম ঘোষণা করেছেন, তাদের একজন বিএনপির পদে রয়েছেন। ছয়জন বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা। সংবাদ সম্মেলন করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ঘোষণা সম্ভবত দেশে এই প্রথম ঘটল।

প্রশ্ন হলো, একই যোগ্যতাসম্পন্ন বা অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো শিক্ষক যদি সরাসরি কোনো দলের—বিশেষ করে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য পোষণ না করেন বা সেই দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকেন—তাহলে তার পক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়া সম্ভব? বিগত বছরগুলোতে ভিসি নিয়োগে কীরকম দলীয়করণ হয়েছে, সেটা দেশবাসী জানে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরেও সেই প্রবণতা ও প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ভিসি একটি প্রশাসনিক পদ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করা তার প্রধান দায়িত্ব। ভিসিদের কতজন তা করার চেষ্টা করেন আর কতজন ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন—সেটি পুরোনো প্রশ্ন; যে প্রশ্নের উত্তরও সবার জানা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব কম উপাচার্যই বিতর্কমুক্ত থাকতে পেরেছেন বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ভিসি খুঁজে পাওয়াই খুব কঠিন, যার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতিসহ অন্য আরও এক বা একাধিক অভিযোগ ওঠেনি।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার পরেই তারা প্রথমত ওই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছেন নিজের ও পরিবারের আর্থিক উন্নয়নে। তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল না। তাদের বড় অগ্রাধিকার যেহেতু বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে অর্থ উপার্জন, ফলে তাদের অধিক আগ্রহ থাকে অবকাঠামো নির্মাণ, বিভিন্ন কেনাকাটা এবং অবশ্যই নিয়োগে। আর এসব করতে গিয়ে তারা তাদের শিক্ষকচরিত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে অপরাপর দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাতারে চলে যান।

মূলত এই পদগুলো এতটাই দলীয়করণ করা হয়েছে যে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে চব্বিশের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, কোষাধ্যক্ষসহ শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারাও পদত্যাগ করেন। অনেকে এখনো পলাতক। শুধু ভিসি-প্রোভিসি নন, অনেক শিক্ষক ও শিক্ষকনেতাও আত্মগোপনে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারেন না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, এমনকি প্রক্টর পদে থাকা অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যেসব দলীয়করণ (দলবাজি) ও নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে; এসব পদে নিয়োগ নিয়ে যে ধরনের রাজনীতি হয়েছে বা এই পদগুলোকে যেভাবে দলীয় আনুগত্যের পুরস্কারে পরিণত করা হয়েছে এবং সর্বোপরি এসব পদকে যেভাবে ক্ষমতার কেন্দ্র ও টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত করা হয়েছে—তাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরাট অংশের মনে ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর হওয়ার বাসনা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন হলো, এই অসুখ থেকে মুক্তির উপায় কী? এক কথায় হয়তো এর উত্তর দেওয়া কঠিন, কিন্তু এই অসুখের কার্যকর ওষুধ বের করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষকেরও রাজনৈতিক বিশ্বাস থাকতে পারে; কিন্তু ওই বিশ্বাস তাকে দলীয় কর্মী বা ক্যাডারে পরিণত করলে তিনি আর যাই হোক শিক্ষক থাকেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের শিক্ষক প্রয়োজন, দলীয় ক্যাডার নয়।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: aminalrasheed@gmail.com