০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নানা পাটেকর: কণ্ঠ যার আরেক চরিত্র

ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রের বাচিক অভিনয় আর পিটার ব্রুকের নীরবতার দর্শনকে যিনি ফ্রেমের সামনে জীবন্ত করেছেন। সংলাপের ভেতরের নিঃশ্বাস দিয়ে দর্শককে মুগ্ধ করা নানা পাটেকরের অভিনয়যাত্রার বয়ান।

নানা পাটেকর: কণ্ঠ যার আরেক চরিত্র

তারকা হওয়ার প্রচলিত ব্যাকরণ ভেঙে ভারতীয় সিনেমায় নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করেছেন নানা পাটেকর। ছবি: টাইমস অব ইনডিয়া

জয় প্রকাশ সরকার জয় প্রকাশ সরকার

Published : 09 Oct 2026, 08:19 AM

Updated : 09 Oct 2026, 08:19 AM

নায়ক হওয়ার জন্য সুন্দর মুখ দরকার। তিনি মুখের বদলে নিয়ে এসেছিলেন কণ্ঠ। নায়ককে সাধারণত আকর্ষণীয় হতে হয়, তিনি অনেক সময় হয়ে উঠতেন অস্বস্তিকর। নায়ক দর্শকের ভালোবাসা চান, তিনি কখনো কখনো দর্শককে ভয় পাইয়ে দিতেন। নায়ক পর্দার চরিত্রকে নিজের দিকে টেনে আনেন, তিনি যেন নিজেকে তুলে দিতেন চরিত্রের হাতে।

তিনি ভারতীয় সিনেমার সেই তারকা, যিনি তারকা হওয়ার প্রচলিত ব্যাকরণ মেনে চলেননি। ভারতীয় সিনেমা যে ‘নায়ক’-এর চেহারা তৈরি করে রেখেছিল, নানা পাটেকর সেই ছাঁচে নিজেকে ঢোকাননি। বরং নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন আলাদা একটি জায়গা।

নানা পাটেকরের নাম মনে পড়লে প্রথমে কোনো সিনেমার নাম মনে পড়ে না। কোনো চরিত্রের নামও হয়তো সঙ্গে সঙ্গে মনে আসে না। কিন্তু একটা কণ্ঠস্বর ঠিক মনে পড়ে যায়। মাথার ভেতর বেজে ওঠে একটা গলা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মুখ, একটা শরীর, একটা বিশেষ ভঙ্গি।

কণ্ঠের ওঠানামা, শব্দের ওপর চাপ, হঠাৎ থেমে যাওয়া, তারপর একটি শব্দকে এমনভাবে ছুড়ে দেওয়া, যেন সেটি শুধু কানে এসে পৌঁছায় না, শরীরেও এসে লাগে। তিনি সংলাপ বলতেন না, সংলাপকে যেন একটি শরীর দিতেন।

২.

‘নটসম্রাট’ ছবিতে গণপত রামচন্দ্র চরিত্রের কথা মনে পড়ছে খুব। একসময়ের বিখ্যাত মঞ্চাভিনেতা, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যিনি আশ্রয়হীন। নানা পাটেকরের কণ্ঠে তার সেই আর্তি- “এক তুফানালা কুনি ঘর দেতা থা?" (‘একটা তুফানকে কেউ কি ঘর দেয়?’)

এই সংলাপের শক্তি শুধু তার শব্দে নয়, শব্দের মাঝখানে যে, কণ্ঠ ক্রমশ ভেঙে পড়ে, আবার নিজেকে সামলে নেয়, তার মধ্যেও। কোথাও বহু বছর মঞ্চে অভিনয় করা এক প্রবীণ অভিনেতার বিশেষ উচ্চারণ, শব্দের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভ্যাস। আবার কোথাও সেই কণ্ঠই হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে আসা এক বৃদ্ধ মানুষের অসহায় নিঃশ্বাস হয়ে যায়।

‘কেউ কি ঘর দেবে?’ প্রশ্নটি একই থাকে। কিন্তু প্রতিবার তার অর্থ বদলে যায়। একবার মনে হয় আশ্রয়ের আবেদন, আরেকবার যেন নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চাওয়া। শেষে প্রশ্নটি আর কোনো বাড়ির দরজায় করা প্রশ্ন থাকে না। হয়ে ওঠে পৃথিবীর কাছে এক পরিত্যক্ত মানুষের শেষ আবেদন।

এইখানেই নানা পাটেকরের অভিনয়ের বিস্ময়। তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না। কণ্ঠের ওঠানামার মধ্য দিয়ে চরিত্রটির ভেতরের জীবনটাকে শ্রাব্য করে তুলতেন। তার কণ্ঠ তাই কেবল সংলাপের বাহন ছিল না। কণ্ঠই ছিল তার অভিনয়ের আরেকটি চরিত্র।

৩.

ভারতীয় নন্দনতত্ত্বে অভিনয়ের এই বহুমাত্রিকতার একটি পুরোনো ভিত্তি আছে। ভরতমুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ অভিনয়ের চারটি রূপের কথা বলে: আঙ্গিক, বাচিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক। শরীর, কণ্ঠ ও বাক্য, সাজসজ্জা এবং অন্তরের অনুভূতি- এই চারটি মিলে তৈরি হয় অভিনয়ের পূর্ণতা। বাচিক অভিনয় মানে শুধু সংলাপ মুখস্থ বলে যাওয়া নয়, কণ্ঠের সাহায্যে শব্দের মধ্যে অনুভূতি ও অর্থের নানা স্তর তৈরি করা।

নানা পাটেকরের বিশেষত্ব ছিল, একই কণ্ঠে তিনি রুদ্র ও করুণ রসের দুই প্রান্তে যাতায়াত করতে পারতেন। তার কণ্ঠে রাগ ছিল, বিদ্রোহ ছিল, তীক্ষ্ণতা ছিল। আবার সেই একই কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত হাস্যরস, ক্লান্তি, অসহায়তা, কখনো গভীর বিষন্নতা। তিনি চিৎকার করেও অভিনয় করতে পারতেন, আবার চুপ থেকেও একটি দৃশ্যের সমস্ত মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিতে পারতেন।

নীরবতার ওপর তার দখল ছিল অসাধারণ। অথচ অভিনয়শিল্পী নানা পাটেকরকে নিয়ে আলোচনায় এই দিকটি তুলনামূলকভাবে কম আসে। নাট্যনির্দেশক ও তাত্ত্বিক পিটার ব্রুক মঞ্চের শূন্যতা ও বিরতির মধ্যেও অর্থ সৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। মারাঠি মঞ্চে প্রশিক্ষিত নানা পাটেকর জানতেন, অভিনয়ে বিরতি মানে কেবল কথা না বলা নয়। কখন থামতে হবে, কতক্ষণ থামতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও অভিনয়ের অংশ।

ক্যামেরার সামনে তিনি মঞ্চের সেই বিদ্যাকে অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সংলাপের আগের নীরবতায় জমিয়েছেন হুমকি, সংলাপের পরের নীরবতায় বসিয়েছেন তার ওজন। দর্শককে সব কথা বলে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন তার হতো না। অনেক সময় তিনি চুপ করে থাকতেন, আর দর্শক সেই নীরবতার মধ্যে বিপদের উপস্থিতি টের পেতেন।

‘পরিন্দা’য় আন্নার চরিত্রে এই কৌশলের অসাধারণ প্রয়োগ দেখা যায়। তিনি চেঁচিয়ে ভয় দেখান না। ধীর, সংযত ভঙ্গিতে কথা বলেন। অথচ তার শান্ত স্বরেই তৈরি হয় আতঙ্ক। এই গ্যাংস্টারকে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করতে হয় না। তার উপস্থিতিই যথেষ্ট। আন্নার চরিত্রে নানা পাটেকর হিন্দি সিনেমার খলনায়ককে অন্য এক মাত্রা দিয়েছিলেন।

৪.

সত্তরের দশকে হিন্দি সিনেমার পর্দায় এসেছিল ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’। যার সবচেয়ে বড় প্রতীক অমিতাভ বচ্চন। সেই ক্রোধের ছিল নিজস্ব নাটকীয়তা, গম্ভীর কণ্ঠ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং নায়কের মতো করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভঙ্গি। ক্রোধের মধ্যেও সেখানে ছিল একধরনের নায়কোচিত সৌন্দর্য।

তবে নব্বইয়ের দশকে এসে ক্রোধের চেহারা কিছুটা বদলে যায়। বদলে যাওয়া সমাজবাস্তবতায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আর সব সময় নায়কের পোশাক পরে পর্দায় আসে না। সেই ক্ষোভে থাকে হতাশা, অসংলগ্নতা, ব্যক্তিগত ক্ষত, কখনো আত্মবিনাশের প্রবণতা। নানা পাটেকর সেই ক্রোধের এক ভিন্ন মুখ হয়ে ওঠেন।

‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতাপ নারায়ণ তিলক এমন এক চরিত্র, যে চারপাশের অন্যায় দেখে প্রথমে উদাসীন থাকে, পরে আর চুপ থাকতে পারে না। নানা পাটেকরের কণ্ঠে তার ক্ষোভ কেবল বক্তৃতার বিষয় হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে অসহায় মানুষের জমে থাকা রাগের প্রকাশ। এই ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এর আগে ‘অগ্নিসাক্ষী’র জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

প্রচলিত অর্থে নায়ক হওয়ার জন্য তৈরি কোনো মুখ ছিলেন না নানা পাটেকর। তার মুখে ছিল জীবনের খসখসে দাগ, কণ্ঠে অভিজ্ঞতার ভার। পর্দায় তিনি যখন রাগতেন, মনে হতো কোনো অভিনেতা রাগ করছেন না, একজন মানুষ সত্যিই আর সহ্য করতে পারছেন না। এ যেন ক্লান্ত নাগরিকের ক্ষোভ, যার আর কোনো ভাষা অবশিষ্ট নেই, আছে শুধু প্রতিবাদের স্বর।

তার অভিনয়ের পরিসর শুধু রাগ আর ক্ষোভে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠীকে মনে করুন। যে কণ্ঠ একদিন আতঙ্ক তৈরি করত, সেই কণ্ঠই এখানে হাসির উৎস। সংলাপের ওপর একই রকম নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু তার প্রয়োগ সম্পূর্ণ আলাদা। শব্দের সামান্য টান, উচ্চারণের ভঙ্গি, বিরতির জায়গা বদলে দিয়ে তিনি ভয়কে পরিণত করেন কৌতুকে।

‘রাজনীতি’তে তার চরিত্র ক্ষমতার ঠান্ডা হিসাব বোঝে। ‘আব তক ছাপ্পান’-এ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয়ের সময় বীরত্বের চেয়ে তার ক্লান্তি বেশি ধরা পড়ে। নিজের পরিচালিত ‘প্রহর: দ্য ফাইনাল এটাক’-এ তিনি দেখিয়েছিলেন, সৈনিকের শৃঙ্খলা ও মানুষের কোমলতা একই চরিত্রের মধ্যে সহাবস্থান করতে পারে।

চরিত্র বদলেছে, সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষাও বদলেছে। কিন্তু নানা পাটেকরের অভিনয়ের কেন্দ্রে থেকে গেছে মানুষকে তার স্ববিরোধিতাসহ দেখার ক্ষমতা। প্রতিটি চরিত্র যেন তার ভেতর থেকে অন্য একজন মানুষকে বের করে এনেছে। সেই মানুষ কখনো ক্রুদ্ধ, কখনো ভীতিকর, কখনো হাস্যকর, কখনো ভীষণ একা।

৫.

একজন অভিনেতার সম্পদ তার অভিনয়, কিন্তু অভিনয়জীবনের বাইরেও তো তার একটি জীবন থাকে। দর্শকের ভালোবাসা, মঞ্চের স্বীকৃতি, করতালি, এসব একসময় থেমে যায়। তখন কী অবশিষ্ট থাকে? ‘নটসম্রাট’-এর গণপত্র রামচন্দ্র চরিত্রটি সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হন। নানা পাটেকর চরিত্রটিকে কেবল বার্ধক্যের করুণ ছবি করে তোলেননি। তার মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন অভিনেতার অহংকার, পুরোনো গৌরবের স্মৃতি, অপমানের ক্ষত, হাস্যরস এবং শেষ পর্যন্ত আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা।

এই কারণেই তাকে শুধু একজন সফল অভিনেতা বলে মনে হয় না। তিনি অভিনয়ের এমন এক ভাষা তৈরি করেছিলেন, যেখানে শব্দের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত কণ্ঠ। আর কখনো কখনো সংলাপের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত আগে ও পরে থাকা নীরবতা। একটি শব্দ কীভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, কোথায় থামছে, কীভাবে বাক্যটি শেষ হচ্ছে, তার মধ্য দিয়েই তিনি চরিত্রের অন্তর্গত মানুষটিকে সামনে নিয়ে আসতেন।

নানা পাটেকরকে মনে রাখার জন্য তাই তার অভিনীত চরিত্রগুলোর তালিকা যথেষ্ট নয়। মনে রাখতে হয় তার বলা সংলাপ, সেই সংলাপের আগে জমে থাকা নীরবতা, শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ, আর বাক্যের শেষে পড়ে থাকা নিঃশ্বাসটুকুও।

কারণ শেষ পর্যন্ত একজন অভিনেতার কণ্ঠ শুধু তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে না। কখনো কখনো তা চরিত্রের শরীর পেরিয়ে দর্শকের স্মৃতির ভেতরেও বেঁচে থাকে। নানা পাটেকরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর হয়তো সেখানেই। তিনি চরিত্রকে কণ্ঠ দিয়েছিলেন, আর সেই কণ্ঠই তাকে চরিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে স্মরণীয় করে রেখেছে।

জয় প্রকাশ সরকার: লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল: jps.news.bd@gmail.com