০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মোহাম্মদ ফরহাদ: শান্ত স্বরের অমিত শক্তি

ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, চিনি ছাড়া চা আর যুক্তিনির্ভর শান্ত কণ্ঠ। বোদার মেঠোপথ থেকে পুরানা পল্টন—কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সাদামাটা জীবন ও জননেতা হয়ে ওঠার স্মৃতিচারণ।

মোহাম্মদ ফরহাদ: শান্ত স্বরের অমিত শক্তি

মোহাম্মদ ফরহাদ (৫ জুলাই ১৯৩৮ - ৯ অক্টোবর ১৯৮৭)।

চিররঞ্জন সরকার চিররঞ্জন সরকার

Published : 09 Oct 2026, 04:59 PM

Updated : 09 Oct 2026, 05:20 PM

কিছু মানুষকে প্রথম দেখার স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। সময়ের ধুলো জমে, জীবনের কত মানুষ আসে-যায়, কত মুখ বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়, কিন্তু কোনো কোনো মুখ আশ্চর্যভাবে থেকে যায়। কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ তেমনই একজন। তাকে প্রথম দেখেছিলাম পঞ্চগড়ের বোদায়, বন্ধু রেজাদের বাড়িতে। তখন আমি ক্লাস এইটের ছাত্র। রেজাদের বাড়ি ছিল আমার দ্বিতীয় ঘরের মতো। তাই সেখানে তার আসা-যাওয়া আমার কাছে ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তখন কে জানত, ছোটখাটো গড়নের ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা সেই মানুষটি একদিন আমার রাজনৈতিক চিন্তার জগতে এত গভীর ছাপ রেখে যাবেন!

কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আমার কাছে ‘কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ’ থাকলেন না, হয়ে গেলেন ‘ফরহাদ ভাই’। সম্বোধনের এই সামান্য পরিবর্তনের মধ্যেই যেন দূরত্বটা কমে গিয়েছিল। তার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা বয়সে অনেক ছোট মানুষকেও সহজে আপন করে নিত।

ফরহাদ ভাইয়ের জীবনযাপন ছিল তার পোশাকের মতোই সাদামাটা। সাদাভাত, আলু আর টাকি মাছের ভর্তা ছিল তার পছন্দের খাবার। বোদায় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এলে নিজেই কখনো কখনো খাবারের মেন্যু বলে দিতেন। তার জীবনের বিলাসিতাও ছিল খুব সামান্য। সকালে পত্রিকা পড়তে পড়তে চিনি ছাড়া এক কাপ চা এবং একটি স্টার সিগারেট। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যের কথা ভাবলে মনে হয়, কত কম জিনিস নিয়ে একজন মানুষ বড় হতে পারে!

তবে তাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে তার কথা বলার ধরনের জন্য। তিনি কখনো গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা করতেন না। জনসভায় তার ভঙ্গিতে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। খুব ধীরে, পরিষ্কার করে, যুক্তি সাজিয়ে কথা বলতেন। মনে হতো, তিনি বক্তৃতা করছেন না, শ্রোতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। অথচ তার সেই শান্ত স্বরেই এমন এক শক্তি ছিল, যা মানুষকে থামিয়ে দিত, তার কথা শুনতে বাধ্য করত। গ্রামের অশিক্ষিত মানুষও তার কথা শুনে বুঝতে পারতেন, ভাবতে পারতেন। তখন হয়তো পুরোপুরি বুঝিনি, কিন্তু পরে উপলব্ধি করেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলার এই ক্ষমতাই একজন প্রকৃত নেতাকে আলাদা করে।

তখন আমাদের পরিমণ্ডলেও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, নির্বাচন এসব নিয়ে কথাবার্তা শুনেই বড় হয়েছি। পরে সত্যেন সেনের বই, সোমেন চন্দের গল্প, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতির টানাপোড়েন পড়তে পড়তে বাম রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলো। তারপর একদিন ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম, আমি আর দর্শক নেই, রাজনীতির ভেতরে ঢুকে পড়েছি।

সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির নামের মধ্যেই এক ধরনের আবেগ ছিল। আর ফরহাদ ভাই ছিলেন সেই আবেগের অন্যতম কেন্দ্র।

একবার শুনলাম, বড় একটি সভা হবে। সেখানে মনি সিংহ ও ফরহাদ ভাই বক্তব্য দেবেন। আমি অনেক আগেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। বুকের ভেতর তখন কেমন একটা ধুকপুকানি। এতদিন নাম শুনেছি, এবার সামনে থেকে দেখব। মঞ্চে যখন ফরহাদ ভাই উঠলেন, তার কথার ধরন আমাকে বিস্মিত করেছিল। তিনি দেশ, গণতন্ত্র, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নিয়ে বলছিলেন। কিন্তু তার ভাষায় উত্তেজনার চেয়ে যুক্তি বেশি, স্লোগানের চেয়ে চিন্তা বেশি। সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল, রাজনীতি শুধু মিছিলের বিষয় নয়, রাজনীতি আসলে চিন্তারও বিষয়।

তরুণ কর্মীদের প্রতি তার আলাদা এক মমতা ছিল। আমাদের মতো অখ্যাত কর্মীর সঙ্গেও তিনি মন দিয়ে কথা বলতেন। একদিন জনসভা শেষে চা খেতে খেতে বলেছিলেন, শুধু মিছিল করলেই হবে না, পড়াশোনাও করতে হবে। রাজনীতি না বুঝে রাজনীতি করলে সেটা বিপজ্জনক। কথাটি তখন হয়তো মাথায় ঢোকেনি। পরে জীবনের নানা বাঁকে এসে বুঝেছি, তিনি কত গভীর একটি কথা বলেছিলেন। তিনি কর্মী চাইতেন, কিন্তু অন্ধ অনুসারী চাইতেন না। তিনি প্রশ্ন করতে শেখাতেন, চিন্তা করতে শেখাতেন।

আশির দশকের বাংলাদেশ ছিল উত্তাল। সামরিক শাসন, আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি, শ্রমিক অসন্তোষ, রাজপথের মিছিল সব মিলিয়ে চারপাশে ছিল অস্থিরতা। সেই সময় ফরহাদ ভাইয়ের মধ্যে যে ভারসাম্য দেখেছি, সেটিই তাকে আমার কাছে আলাদা করে তুলেছিল। তিনি আদর্শে দৃঢ় ছিলেন, কিন্তু বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতেন না। মতের বিরোধকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত করতেন না। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও তার সম্মান ছিল।

তারপর এলো সেই দিন, যেদিন শুনলাম ফরহাদ ভাই আর নেই।

১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়নে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর সংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছাল। খবরটি যেন হঠাৎ করে একটি পরিচিত পৃথিবীর দরজা বন্ধ করে দিল। পার্টি অফিসে গিয়ে দেখলাম, সবাই অস্বাভাবিক নীরব। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না। কারও চোখে জল, কেউ চুপচাপ সিগারেট টানছে। মনে হচ্ছিল, একজন মানুষ চলে যাননি, একটি সময় চলে গেছে।

মস্কো থেকে তার মরদেহ ঢাকায় আনা হলো। বিমানবন্দরে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামল। কারও মুখে কথা নেই, চোখে জল। স্লোগান উঠছে, কিন্তু স্লোগানের ভেতরেও কান্নার শব্দ। তার শেষ ইচ্ছা ছিল, জন্মস্থান পঞ্চগড়ের বোদার মাটিতে যেন তার মৃতদেহটি নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে মরদেহ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় বোদায়।

হেলিকপ্টারটি যখন বোদার আকাশে ভেসে উঠল, নিচে তখন মানুষ আর মানুষ। মাঠ, রাস্তা, আশপাশের জায়গা, এমনকি ধানের ক্ষেত পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। বহু মানুষ বহু দূর থেকে হেঁটে এসেছিলেন। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, ছাত্র, গৃহবধূ, তরুণ, বৃদ্ধ, শিশু। মনে হয়েছিল, একটি মানুষকে বিদায় জানাতে পুরো উত্তরবাংলা যেন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সেদিন বোদার মাঠে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছিলাম, একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ আসলে মানুষের হৃদয়। কোনো পাথরের ফলক নয়, কোনো সরকারি ভবন নয়, মানুষের চোখের জলই হয়তো একজন মানুষের জীবনের সত্যিকারের মূল্যায়ন।

পরে তার মরদেহ আবার ঢাকায় আনা হয়। পুরানা পল্টনে পার্টি অফিসের সামনে শেষ জানাজা। যে জায়গায় তিনি জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন, তরুণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, মিছিল করেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, সেখানেই তাকে শেষবারের মতো দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল। রিকশাচালক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ সবাই এসেছিলেন। সেদিন ঢাকা শহরও থমকে গিয়েছিল।

আজ এত বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে ফরহাদ ভাইয়ের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। এখন রাজনীতিতে হিংসা-বিদ্বেষ বেড়েছে। শোরগোল বেড়েছে, কিন্তু যুক্তির জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ব্যক্তিপূজা বেড়েছে, কিন্তু আদর্শের কথা কম শোনা যায়। এমন সময়ে তার শান্ত কণ্ঠ আরও প্রয়োজনীয় মনে হয়।

আমার কাছে ফরহাদ ভাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন একজন শিক্ষকের মতো। তিনি শিখিয়েছিলেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়, মানুষের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবাও। মিছিল করার পাশাপাশি পড়াশোনা করতে হবে, স্লোগান দেওয়ার আগে বিষয়টি বুঝতে হবে, আর সবকিছুর আগে মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এত বছর পর আজ ফরহাদ ভাইয়ের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। এখনকার রাজনীতিতে বিভেদ আর কৌশল অনেক বেড়েছে, কিন্তু আদর্শের গুরুত্ব কমেছে। যুক্তির চেয়ে শোরগোল বেশি, মানুষের চেয়ে নেতার বন্দনা বেশি। এমন সময়ে ফরহাদ ভাইয়ের মতো মানুষের অভাব খুব অনুভব করি। আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে শোষণ ও বৈষম্য যত দিন থাকবে, তত দিন বাম রাজনীতির প্রয়োজনও থাকবে। তবে সময়ের সঙ্গে এই রাজনীতিকেও বদলাতে হবে। মার্ক্সবাদ বা লেনিনবাদকে ধর্মগ্রন্থের মতো আঁকড়ে থাকলে চলবে না। সময় ও বাস্তবতা বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের ভাষায় তাদের কথা বলতে হবে। ফরহাদ ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলোর মধ্যে এটিও একটি।

আজকের তরুণদের অনেকেই হয়তো তার নাম জানে না। কিন্তু আমরা যারা আশির দশকের উত্তাল সময় দেখেছি, তারা জানি, বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে ফরহাদ ভাই ছিলেন এক বিশেষ মানুষ। তিনি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, ছিলেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। আমার কাছে তিনি সেই মানুষ, যিনি বুঝিয়েছিলেন, রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, মানুষের জন্য ভাবা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোও।

আজও তার নাম মনে পড়লে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ বোদায় নিয়ে আসার দৃশ্য, মাঠজুড়ে মানুষের ভিড়, স্বজন হারানোর মতো কান্না আর পুরানা পল্টনে শেষ জানাজার সেই জনসমুদ্র। তিনি কবরে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন, কিন্তু মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা আর আদর্শ এখনও যেন কথা বলে চলেছে। শোষিত মানুষের অধিকার আর তরুণদের প্রতিবাদের মধ্যে আমি আজও ফরহাদ ভাইয়ের স্মৃতি খুঁজে পাই!

আজ কেবলই মনে হয়, সেই উক্তি:

‘মৃত্যুতে নিঃশেষ নও কমরেড ফরহাদ

তোমার কর্মযজ্ঞ এতই বিরাট!’

চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com