Published : 13 Jul 2025, 09:31 AM
দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ঢুকেই ডনাল্ড ট্রাম্প যেন নিজের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন—শুরুটা করলেন আমদানির ওপর একের পর এক শুল্ক বসিয়ে। গড়পড়তা বেসলাইন শুল্ক ১০ শতাংশ, আর চীনের মতো ‘বিশেষ বিরাগভাজন’ দেশের জন্য বরাদ্দ ৩০ শতাংশের কড়া হার। জুন নাগাদ এই শুল্ক-আনন্দের ফলাফল? ২.৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে গড়ে ১৫–১৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
তবে ট্রাম্প এখানেই থামেননি—যেন খনি খুঁড়ে শুল্ক তোলা শুরু করেছেন। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা—সবকিছুতেই ৫০ শতাংশ করে শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন। গাড়ির ক্ষেত্রেও ছাড় নেই, হুট করেই ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে দিলেন। আইনি ভিত্তি থাক বা না থাক, তিনি এই শুল্ক যুদ্ধে ভরসা রাখছেন সেই পুরোনো 'আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন' (আইইপিএ)-এর ওপর, যা আদালত ইতোমধ্যেই ভুরু কুঁচকে দেখছে। তবু আপিল চলা পর্যন্ত ট্রাম্পের শুল্ক-কেল্লা অটুট—আইন কার্যকরই থাকছে।
এ বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল—মাত্র চার মাসেই শুল্কের গড় হার ২.৫ শতাংশ থেকে হুড়মুড় করে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশে, যা গত একশ বছরের ইতিহাসে এক নতুন 'উপলক্ষ'। জুলাইয়ে এসে বাজল আরেকটি ঢাক: শুল্ক থেকে প্রথমবারের মতো এক অর্থবছরে আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেল! ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট আশাবাদী—এই গতিতে চললে ২০২৫ সালের মধ্যে রাজস্ব গিয়ে ঠেকতে পারে ৩০০ বিলিয়নে। ট্রাম্প তো খুশি—আবারও প্রমাণ করলেন, আমেরিকাকে 'মহাশুল্ক রাষ্ট্র' বানাতে তিনিই উপযুক্ত নেতা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় ঋণগ্রস্ত দেশ
বিপুল অঙ্কের ঋণের চাপে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে ধনবান দেশটা এখন ঋণের পাহাড় টেনে নিয়ে চলছে—নাকি সেই পাহাড়ই এখন দেশটাকে টেনে নিচে নামাচ্ছে, তা বোঝা দায়। সরকারি ঋণ এরই মধ্যে রেকর্ড ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার (৩৪ লাখ কোটি ডলার) ছাড়িয়েছে। প্রতি ১০০ দিনে এক ট্রিলিয়ন ডলার করে ঋণ বাড়ছে, যা শুধু তাদের জন্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে, বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, ২০২৩ সালে দেশটির জাতীয় ঋণসীমা বৃদ্ধি নিয়ে রীতিমতো অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।
মার্কিন অর্থনীতির জন্য এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করার বিষয়টি। এটি তাদের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে মূলধনকে সরিয়ে নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়ে সুদ পরিশোধে (এক ট্রিলিয়ন ডলার, প্রতি বছরে) বেশি ব্যয় করছে, যা জলবায়ু খাত বা অবকাঠামোগত উদ্যোগের জন্য কোন সুযোগই রাখতে পারছে না। উন্নত দেশের ঋণগ্রস্ততার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো বিদেশী সাহায্য কম পাচ্ছে এবং ক্রমে, এই পরিস্থিতি তাদের রপ্তানি চাহিদা সংকুচিত করতে পারে।
পিটার জি. পিটারসন ফাউন্ডেশনের এক হিসেব অনুযায়ী ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত, (২০২৫ অর্থবছরে) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুদ বাবদ পরিশোধ করেছে ৬৬৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬০১ বিলিয়ন ডলার। এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এছাড়াও, কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) আগামী দশকে নেট সুদ পরিশোধ বছরে ১৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। আগামী বছরেই যু্ক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঋণের বিপরীতে এক ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে যা ২০৩৫ সালে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
সুদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকায়, ফেডারেল সরকার সম্ভবত ফেডারেল বাজেটের একটি বড় অংশ (এক তৃতীয়াংশ) সুদ পরিশোধ খাতে ব্যয় করবে। ওয়াশিংনটনের দ্রুত প্রসারমান ঋণের ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে বিনিয়োগ ব্যাহত করবে।
এদিকে, ২০২৪ অর্থবছরে, ফেডারেল সরকার বাজেট অনুযায়ী ৬.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। যেহেতু সরকার তার রাজস্ব সংগ্রহের চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে, তাই ২০২৪ সালের ঘাটতি ছিল ১.৮৩ ট্রিলিয়ন ডলার। গত ৫০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাত্র চারবার উদ্বৃত্ত বাজেটের মুখ দেখেছে। সম্প্রতি সেটি ঘটেছে ২০০১ সালে। ব্যয় এবং রাজস্ব সমান থাকার কারণে যখন কোনও ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত থাকে না, তখন বাজেটকে সুষম বাজেট বলা হয়।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সরকারি তথ্য অনুসারে ২০১৫ সালের স্থির মূল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছিল ২২.৬৭ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪ সালের বর্তমান মূল্যে তা ২৮.৪৮৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
মুদ্রা এবং বাণিজ্য অস্থিরতা
বিশ্বের সবচেয়ে ধনবান দেশটা এখন ঋণের পাহাড় টেনে নিয়ে চলছে—নাকি সেই পাহাড়ই এখন দেশটাকে টেনে নিচে নামাচ্ছে, তা বোঝা দায়। উন্নত দেশ তাদের রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য আরও ঋণ ইস্যু করার সঙ্গে সঙ্গে (ডলার) মুদ্রার অবমূল্যায়ন হতে পারে। এতে করে ডলার-নির্ভর ঋণী দেশের জন্য কর্জ পরিশোধ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এসব দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ২ থেকে চার গুণ বেশি খরচে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণশীল অর্থনীতি (উচ্চ মার্কিন শুল্ক) পণ্য ও সেবা সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করবে এবং বিশ্বব্যাপী জিডিপির হার এক শতাংশ কমিয়ে দিবে। আর, অবধারিতভাবে, বিশ্ব বাণিজ্যের মধ্যে ফাটল তৈরি করবে।
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর ঋণ সেই সঙ্গে প্রাথমিক রিজার্ভ মুদ্রা ইস্যুকারী হিসাবে মার্কিন ঋণের অস্থিরতা সার্বভৌম বন্ড বাজারকে বেসামাল করে দিতে পারে। এতে ঘটতে পারে মার্কিন বন্ডের দ্রুত দরপতন। এতে করে অত্যন্ত ঋণগ্রস্ত উদীয়মান বাজারগুলোর জন্য ঋণের খরচ বেড়ে যেতে পারে। এই চলমান সময়ে প্রকৃত অর্থায়নের খরচ ইতিমধ্যেই দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিশ্বব্যাপী আর্থিক জামানতের প্রায় ৬০ শতাংশ গঠন করে। বন্ড বাজারে আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে এটি ৬০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি রেপো (সরকার/কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বন্ড কিনে নেয়া) বাজারকে অস্থিতিশীল করতে পারে, যা ২০০৮ সালে ঘটেছিল। আইএমএফ স্পষ্টভাবে মার্কিন রাজস্ব ঘাটতিকে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছে, সার্বভৌম-ব্যাংক প্রতিক্রিয়া লুপগুলো হ্রাস করার জন্য ‘ফ্রন্টলোডেড রাজস্ব সমন্বয়’ করার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি ঋণের চূড়ার ওপর আরোহন করেছে। সরকারি দায়ের পরিমাণ বিস্ময়করভাবে ৩৬.২ ট্রিলিয়ন ডলার (২৮.৬৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ড), যা দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ঋণের দ্বিগুণেরও বেশি। এর গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এটি বলা যেতে পারে যে মার্কিন সুদের পরিমাণ তাদের প্রতিরক্ষা এবং মেডিকেয়ারের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
বিতর্কিত সরকারি ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টা
মার্কিন জাতীয় ঋণ টেকসই না হওয়ার পথে থাকায়, সরকারি ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, বিশেষ করে ইলন মাস্কের বিতর্কিত DOGE (ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্মেন্ট এফিসিয়েন্সি) সৃষ্টির মাধ্যমে, যদিও এই উদ্যোগ বাস্তবে তেমন কিছু সাশ্রয় করতে পারেনি।
আর কে এর উদ্যোক্তা? আর কেউ নন, মহাকাশের দখলদার, টেসলার ঈশ্বর, এক ও অদ্বিতীয় ইলন মাস্ক।
DOGE-এর লক্ষ্য শুনলে মনে হবে যেন সরকারি ব্যয়ের ‘ডায়েট প্ল্যান’ বানানো হয়েছে। বাস্তবে কী হয়েছে? কিছু কাগজে-কলমে কাটাকাটি ছাড়া বাজেটের মেদ আছে যেই-তেই, জিমে যাচ্ছে না।পাশাপাশি, মাস্ক ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা দেশের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে হচ্ছে।
এটি সরাসরি DOGE-এর লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি হিসেব বলছে—DOGE নাকি ১৯০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে (২৯ জুন, ২০২৫ পর্যন্ত)। কিন্তু স্বাধীন বিশ্লেষকরা একহাত নিয়ে বলছেন, ওই ‘সাশ্রয়ের’ খরচেই ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়ে গেছে! মানে মাটি খুঁড়ে হাতির পা পেলেও সেটা নাকি কঙ্কাল।
উচ্চ শুল্ক ব্যর্থ হতে পারে
শুল্ক আরোপ অর্থনীতিতে কোনো ভালো ফল বয়ে আনছে কি না তা নিয়ে একটি অর্থনৈতিক মডেল রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, শুল্ক আরোপ মানেই দেশপ্রেম, কর্মসংস্থান এবং মেইড ইন আমেরিকার জয়গান। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলেন, গল্পটা এতটা 'সরল' নয়। তারা বলছেন—দাম বাড়ালে সবাই দেশি জিনিস কিনবে, এমন ভাবা মোটেও বিজ্ঞতার পরিচয় নয়। কারণ, আছে এক জটিল কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য—আর্মিংটন স্থিতিস্থাপকতা মডেল।
আর্মিংটন স্থিতিস্থাপকতার মডেল দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি করা পণ্যের মধ্যে প্রতিস্থাপনের স্থিতিস্থাপকতাকে বোঝায়। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য এবং গণনামূলক সাধারণ ভারসাম্য (সিজিই) মডেলগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার হিসেবে কাজ করে। এই মডেল নির্ধারণ করে কীভাবে গ্রাহক বা সংস্থাগুলো আপেক্ষিক দামের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশি ও বিদেশি পণ্যের মধ্যে কোনটি ক্রয় করবে তা পছন্দ করে নেয়।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি আর্মিংটন স্থিতিস্থাপকতা বেশি হয়, তাহলে দাম পরিবর্তন হলে গ্রাহকরা দেশি ও আমদানি করা পণ্যের মধ্যে সহজেই স্থান পরিবর্তন করে। আর যদি স্থিতিস্থাপকতা কম হয়, তাহলে দেশি ও আমদানিকৃত পণ্যের ব্যবহারে তেমন পরিবর্তন হয় না। এর মানে, দামের পরিবর্তন (এখানে দাম বৃদ্ধি) পণ্যের চাহিদায় সামান্য প্রভাব ফেলে। পল আর্মিংটন নামে একজন বিশিষ্ট মার্কিন অর্থনীতিবিদ ১৯৬৯ সালে একটি গবেষণাপত্রে এই ধারণা প্রকাশ করেন।
এই মডেল অনুযায়ী, ট্রাম্প ২০১৮ সালে উচ্চ শুল্ক চাপালেন, সেই ‘ম্যাজিক’ দেখা গেল না। আর্মিংটন স্থিতিস্থাপকতা কম থাকায় মোটরগাড়ি, যন্ত্রপাতি আর জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্যেও আমদানি বন্ধ করলেন না। কারণ, দেশীয় ইস্পাত আরও ব্যয়বহুল ছিল, প্রয়োজনীয় গ্রেড বা স্পেসিফিকেশন সবসময় পাওয়া যেত না। ফলে, দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তিতে আবদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইস্পাত আমদানি করেছে, বিশেষত কানাডা, মেক্সিকো এবং ইইউ থেকে (যারা পরে শুল্ক ছাড় পেয়েছে।
শুল্ক তো বসানো হয়েছিল দেশীয় শিল্প ও চাকরি বাঁচাতে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টোটা। সরবরাহ চেইন এলোমেলো, কাঁচামালের দাম বাড়ছে, চাকরি কমছে। এতে করে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায় আর পাল্টাপাল্টি শুল্কের কারণে—যেমন আগের ট্রাম্প টার্মে— মার্কিন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছিল। আরো যা ঘটে তাহলো চূড়ান্ত বা ফাইন্যাল পণ্য, যেমন, মোটর উৎপাদন, সুরক্ষিত খাত (যেমন, ইস্পাত)-এর তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার ফলে মার্কিন সংস্থাগুলোই বরং বিচ্ছিন্ন বা একঘরে হতে যেতে পারে, অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা হ্রাস পেতে পারে এবং ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ঘটনা ঘটতে পারে।
এখন তো দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পীয় শুল্কনীতি বিশ্বব্যাপী বিভাজন তৈরি করছে। ইইউ, চীন ও এবং আসিয়ানের দেশগুলো পাল্টা প্রতিশোধমূলক শুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে ‘বিশ্বায়ন’ এখন টুকরো টুকরো হয়ে আঞ্চলিক জোটে পরিণত হচ্ছে। আর ডলার? লেনদেনের মধ্যমণি থেকেও একটু একটু করে কোণঠাসা হচ্ছে। ডলারের মাধ্যমে লেনদেন কমে যাচ্ছে এবং সর্বোপরি প্রবৃদ্ধিকে হ্রাস করছে।
জে.পি. মরগানের হিসেব বলছে, এর ফলে বিশ্ব জিডিপি ১ শতাংশ কমতে পারে—শুধু তা-ই নয়, এর দ্বিগুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আর্থিক ব্যবস্থায়। অর্থাৎ, শুল্ক দিয়ে অর্থনীতি বাঁচানো নয়, বরং ডোবানোই যেন এখন একমাত্র অর্জন।
ডব্লিউটিও: অস্তিত্ব আছে, অথচ অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন
এক সময় যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ছিল মুক্ত বাণিজ্যের পাহারাদার, সেটিই আজ পক্ষাঘাতে আইসিইউতে, মাথায় অক্সিজেন মাস্ক আর বুকে প্রশ্নচিহ্ন। অবস্থা এমন—দরকারি কাজগুলো করার মতো সামর্থ্য নেই, আবার বাতিলও করা যাচ্ছে না। একে বলা যায় প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা।
মূল সংকট শুরু হয়েছে যেখান থেকে—বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিয়ে। ডব্লিউটিওর আপিল সংস্থা ছিল বাণিজ্য-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির শেষ আদালত। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র একরকম ভেটো-মার্কা অচলাবস্থা তৈরি করেছে—নতুন বিচারক নিয়োগেই তারা বারবার বাধা দিচ্ছে। ফলে, এখন বিশ্ব বাণিজ্যের বড় কোনো দ্বন্দ্ব উঠলে সেটা নালিশ হয়ে পড়ে থাকে—মেটার ইনবক্সের মতো, কেউ পড়ে না, উত্তরও আসে না।
আলোচনার অচলাবস্থা: জটিল নতুন নিয়মের (যেমন, ডিজিটাল বাণিজ্য, মৎস্য ভর্তুকি, কৃষি সংস্কার) ইত্যাদির ওপর ওপর ১৬৪ জন সদস্যের মধ্যে ঐকমত্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে, দোহা রাউন্ড পথভ্রষ্ট হয়েছে।
দোহা রাউন্ড ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) শুরু করা হওয়া এক দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার প্রক্রিয়া, যা শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে কাতারের দোহা শহরে। লক্ষ্য ছিল—বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও ন্যায়সংগত, ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়নবান্ধব করা। ওই রাউন্ডে আলোচনা হচ্ছিল— কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর পণ্যে শুল্ক ও বাধা কমানো, ওষুধ, প্রযুক্তি ও বাজার প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সমতা আনা এবং ডিজিটাল বা ই-কমার্সসহ নতুন খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা।
এই সব ব্যাপারে ১৬৪টি সদস্য দেশের মধ্যে একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা ছিল ভিন্ন। কেউ কৃষিভর্তুকি ছাড়তে চায় না, কেউ শিল্পখাতে প্রবেশাধিকার দিতে রাজি নয়। ফলে, একসময় এই দোহা উন্নয়ন এজেন্ডা কার্যত স্থবির হয়ে যায়—কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই। এজন্য কেউ কেউ একে এখন ব্যঙ্গ করে বলে ‘Derailed Round’—অর্থাৎ, পথভ্রষ্ট হওয়া আলোচনা।