Published : 02 Mar 2026, 09:10 PM
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারটাই সম্ভবত ত্রুটিপূর্ণ। এই চেয়ারে যিনিই বসেছেন, তিনিই বিতর্কিত হয়েছেন। তারই জবানের লাগাম থাকেনি। সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও ওই লিগ্যাসি ভাঙতে পারেননি। এবার নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন?
কোনো এক অদ্ভুত কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর থেকেই এখানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা (দু-একজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে) এমন সব কথা বলেন, যা রসিকতা এবং অনেক সময় বিতর্কেরও জন্ম দেয়। ফলে তাদের সিরিয়াস কথা নিয়েও মানুষ ঠাট্টা করতে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে একটা অভিন্ন বিষয় খেয়াল করা যায়, যেমন তারা একই কথা বারবার একইভাবে বলেন। মনে হয় কথাটি তিনি এই প্রথম বললেন।
উই আর লুকিং ফর শত্রুজ; আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে; দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো; বিএনপির লোকেরা পিলার ধরে নাড়া দিয়েছে বলে রানা প্লাজা ভেঙে গেছে; পুলিশ থেকে দূরে থাকুন—এ সবই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বচন।
মবের আলোচনায় পেঁয়াজের দাম

বচনে আর আচরণে অতীতের সব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ছাপিয়ে গেছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এর মূল কারণ তাকে একইসঙ্গে স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রাখা। সাংবাদিকরা তাকে দেশের নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা, বিশেষ করে মব সন্ত্রাস নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি পেঁয়াজ ও আলুর দাম নিয়ে কথা বলতেন। থানা বা পুলিশের কর্মকাণ্ড পরিদর্শনে গিয়ে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আজ তারা কী রান্নাবান্না করেছেন—এসব নিয়ে কথা বলে বা প্রশ্ন করে আলোচিত হন। এগুলো নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রলও হয়।
গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩টায় নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেও বিতর্কের জন্ম দেন এই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। ওইদিন ২টার দিকে তার আকস্মিক সংবাদ সম্মেলনের কথা জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ।
প্রশ্ন ওঠে, গভীর রাতে কেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সংবাদ সম্মেলন ডাকতে হলো? সকালে ডাকলে কী সমস্যা হতো? আবার এত রাতে সংবাদ সম্মেলন ডেকেও তিনি সেরকম জরুরি কিছুই বলেননি যা সকালে বললে কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হতো। অর্থাৎ জরুরি সংবাদ সম্মেলন নাম দেওয়া হলেও সেখানে তেমন জরুরি কিছুই ছিল না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন তার পদত্যাগের দাবি ওঠার মধ্যে। ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে গণপদযাত্রা কর্মসূচি পালনের ডাক দিয়েছিল। এর আগে সারা দেশে ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তার পদত্যাগের আলটিমেটামেরও মধ্যেই তিনি মধ্য রাতে ওই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন।
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তবে ১৬ অগাস্ট সাখাওয়াত হোসেনকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা করা হয় জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে। নানা কারণে শেষদিকে তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হলেও তিনি শেষদিন পর্যন্ত স্বপদে বহাল ছিলেন। অর্থাৎ কোনো সমালোচনাই তিনি গায়ে মাখেননি।
লুকিং ফর শত্রুজ

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি রসিকতার জন্ম দিয়েছিলেন বিএনপি-জামায়াত আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। কেবল কথায় নয়, গেটআপ-মেকআপেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আলাদা, অন্যরকম। ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে জেলমাখা খাড়া চুলের এমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে দেখেনি বাংলাদেশ। তার অমর বাণী, ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত যেমন কথা বলার সময় দুই-তৃতীয়াংশ ইংরেজি ব্যবহার করতেন, লুৎফুজ্জামান বাবরও সেরকম ইংরেজি বলার চেষ্টা করতেন। তবে মুহিত সাহেবের ইংরেজি যেরকম ব্যাকরণসম্মত (মাঝে মধ্যে বাংলিশ), বাবর সাহেবের ইংরেজি ছিল একেবারেই উল্টো, অভিনব, বলা চলে ইংবঙ্গীয়।
আল্লাহর মাল

২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আলতাফ হোসেন চৌধুরী; যিনি তার একটি উক্তির জন্য আজও স্মরণীয়। নওশীন নামে এক শিশু দুর্ঘটনায় মারা গেলে মন্ত্রী মহোদয় ওই শিশুর অভিভাবককে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘কেঁদে কী হবে, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।’
এরকম কথা আমরা হামেশাই শোকগ্রস্ত ব্যক্তিকে বলে থাকি। কিন্তু যখন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই কথা বলেন, তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তিনি দায়িত্ব এড়ানোর জন্য বলছেন কি না। ফলে তার ওই বাক্যটি নিয়ে নানারকম তীর্যক মন্তব্য শুরু হয় এবং ব্যাপক সমালোচনা হয়। একপর্যায়ে লোকে আলতাফ হোসেন চৌধুরীকে সংক্ষেপে ‘আল্লাহর মাল’ বলে উল্লেখ করতে শুরু করে। আলতাফ হোসেন চৌধুরী একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘দেশে খুন বেড়েছে, অপরাধ বাড়েনি’। তার এই কথাটি নিয়েও বেশ রসিকতা হয়।
নাড়া দিস না

আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীরও একসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অতিশুদ্ধ বাংলা বলায় যার জুড়ি নেই। বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তৃতার অনেক বাংলা শব্দের অর্থ আমাদের অভিধান দেখে খুঁজে নিতে হতো। বিশেষ করে তিনি যখন জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি ছিলেন, তখন প্রায়ই নানা বিষয় নিয়ে সংসদেও মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতেন। ইংরেজিতে এই কমিটির নাম পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি। বাংলায় সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটি। কিন্তু জনাব আলমগীর এই কমিটিকে বলতেন গণহিসাব সম্পর্কিত কমিটি।
কম্পিউটারের সফটওয়্যারকে কোমল সম্ভার এবং হার্ডওয়্যারকে কঠিন সম্ভার নাম দিয়েও তিনি আলোচিত হয়েছিলেন। বক্তৃতায় তিনি অতি সচেতনভাবে ইংরেজি শব্দ এড়িয়ে যান। খেয়াল করে দেখেছি, কথা বলার সময় তিনি যদি কাঙ্ক্ষিত শব্দ না পান, তখন একটু চুপ থাকেন এবং মাঝে মধ্যে একটু কাশি দেন। শব্দটি পেয়ে গেলে কথা বলা শুরু করেন।
তবে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন ঢাকার অদূরে সাভারে রানা প্লাজা ধসে হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর সময়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পরে তিনি ভবন ধসের কারণ হিসেবে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, হরতাল সমর্থকরা ভবনের পিলার ধরে নাড়াচাড়া করার কারণে ভবনটি ধসে পড়তে পারে। এরপর তার ওই কথাকে কোড করে নানারকম ব্যঙ্গ কার্টুনও হয়েছে, যেখানে তার ছবি দিয়ে লেখা ছিল, ‘নাড়া দিস না’।
মহীউদ্দীন খান আলমগীর তার পূর্বসুরি সাহারা খাতুনকে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে মন্তব্য করেও বেশ রসিকতার জন্ম দেন।
পুলিশ থেকে দূরে থাকুন

আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলেন শামসুল হক টুকু। যিনি পরবর্তীকালে ডেপুটি স্পিকার হন। বর্তমানে কারাবন্দি। অমৃত বচনে পিছিয়ে ছিলেন না তিনিও। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকদের দূরত্ব তৈরি হলে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, পুলিশের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সংবাদ করুন। তখন সাংবাদিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, ট্রাকের পেছনে যেমন লেখা থাকে ১০০ হাত দূরে থাকুন; এখন থেকে পুলিশের পোশাকেও কি ওরকম কোনো লেখা থাকবে?
বিচ্ছিন্ন ঘটনা
আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত কোনো অঘটন ঘটলেই সেটিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে মন্তব্য করা আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটা মুদ্রাদোষ। তারা স্বীকার করতে চান না এই ঘটনাটি একইরকম অন্য ঘটনার ধারাবাহিকতা। ফলে দেশে যখন একটার পর একটা জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটতে লাগল, তখন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেছেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুন হলে সেটি যেমন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ তেমনি কোনো বিদেশি নাগরিক খুন হলে সেটিও ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। রাজধানীর কড়া নিরাপত্তা বলয়ে হামলা যেমন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, তেমনি ঝিনাইদহের মতো দূর মফস্বলে কোনো পল্লী চিকিৎসকের ওপর হামলাও ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। বস্তুত আমাদের জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি এবং ক্ষমতাবানদের জনবিচ্ছিন্নতারই বহিঃপ্রকাশ এ জাতীয় বক্তব্য।
অতীতের যে কেনো সময়ের চেয়ে ভালো

“দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।” সাহারা খাতুন যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন এই বাক্যটি তিনি কত জায়গায় কতবার বলেছেন, ওই পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই কারও কাছে নেই। থাকলে দেখা যেত, সংখ্যাটা বেশ বড়। তিনি যখনই কোনো অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতেন বা সাংবাদিকরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করতেন, তিনি ওই একই বাক্য বলতেন, কোনোরকম জড়তা ছাড়াই।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি খুন হওয়ার পর সাহারা খাতুন বলেছিলেন, “আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে!” এরপর প্রতি বছর সাগর-রুনি হত্যার বার্ষিকীতে সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাহারা খাতুনের ওই বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “৪৮ ঘণ্টা কবে শেষ হবে!” নাগরিকদের নিরাপত্তা ইস্যুতে সাহারা খাতুন একবার ঢাকাবাসীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, “ঘরে তালা মেরে ঈদ করতে বাড়ি যাবেন।”
দেশে কোনো আইএস নেই

“দেশে কোনো আইএস নেই”—এই কথাটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল কতবার বলেছেন তা বলা মুশকিল। তবে যখনই তাকে দেশের জঙ্গিবাদ নিয়ে প্রশ্ন করা হতো, তিনি একই কথা বলতেন যে, দেশের এসব নাকশতা করছে স্থানীয় জঙ্গিরা, বিশেষ করে জেএমবি। দেশে আইএস-এর কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০২৬ সালের ১৩ অগাস্ট রংপুরে পুলিশের এক অনুষ্ঠানে তিনি আরেকটু এগিয়ে বলেন, “দেশে আইএস-ফাইএস বলে কিছু নেই।”
দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার ওই সময়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে নির্মমভাবে খুন হন কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। ওই সময়ে এই ঘটনা নিয়েও বারবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যথারীতি তিনি বলতে থাকেন, “দ্রুতই তনু হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে।” এই কথাটিও একইভাবে একই ভঙ্গিতে, দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি যে কতবার বলেছেন, তার হিসাব সম্ভবত কারও কাছে নেই। কিন্তু এখনও জানা যায়নি তনুর খুনি কারা এবং তাদের কী হয়েছে?
অতীতের লিগ্যাসি
হালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাই যে এরকম রসিকতা করেন, তা নয়; বরং এই ‘ঐতিহ্য’ গোড়া থেকেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়েও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মালেক উকিল বলেছিলেন, “পুলিশ বুঝে উঠতে পারেনি!”
এরপর জিয়াউর রহমানের আমলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন শাহজাদা নামে এক কিশোর। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেছিলেন, “পুলিশকে চট করে দোষ দেওয়া যাবে না।”
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মতিন চৌধুরী। ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের মারামারি হলে মতিন চৌধুরী ছাত্রদলের নেতাদের বলেন, “তোমরা শিবিরের ছেলেদের সঙ্গে মারামারি কর কেন? ওরা তো ভদ্র!”
১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তখন দ্বিতীয় দফায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। একবার তিনি বলেন, “অপরাধী যেই হোক, বাইশ হাত মাটির নিচ থেকে হোক আর সমুদ্রের তলদেশ থেকে হোক তাকে গ্রেপ্তার করা হবেই!”
তবে এতসব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমও ছিলেন। ছিয়ানব্বইয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম। তিনি যতদিন দায়িত্বে ছিলেন, কোনো ধরনের বেফাঁস মন্তব্য করেননি বা এমন কোনো কথা বলেননি যা নিয়ে পরে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। তানজিম আহমেদ সোহেল তাজও আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বলে শোনা যায় না।
কী করবেন সালাহউদ্দিন?

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ—যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জুলাই সনদ তৈরির প্রক্রিয়ায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে শুধু বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাই নয়, বরং বলা হয়, তিনি বাংলাদেশের সংবিধানকে বিকৃতির হাত থেকে বাঁচানোয় বড় ভূমিকা রেখেছেন। ভবিষ্যতে তার এই অবদান নিয়ে হয়তো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
সংবিধান ও আইন বোঝা এরকম একজন মানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়েও হয়তো বড় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, এমন কথাও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনগণের প্রধান মাথাব্যথা হয়ে উঠেছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিশেষ করে লাগামহীন মব সন্ত্রাস। ওই জায়গা থেকে মব নির্মূল করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে জনমনে স্বস্তি দেওয়ার দায়িত্ব প্রধানত যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর—ওই চেয়ারে সালাহউদ্দিন আহমদের মতো একজন দক্ষ প্রশাসককে বসানো সময়য়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলেই মনে করা হচ্ছে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। সত্যিই তিনি কতটা সফল হবেন বা তিনি কতদিন বিতর্কিত কথা না বলে বা কোনো ধরনের বিতর্ক তৈরি না করে থাকতে পারবেন, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।