Published : 04 May 2026, 06:23 PM
হাওরের দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ যখন অকাল বন্যায় তলিয়ে যায়, তখন সেই ঘোলা জলের নিচে স্রেফ ধান নয়, ডুবে যায় কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনিও। প্রকৃতির রূঢ়তার চেয়েও এখানে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় অবহেলা আর কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা, যা একেকটি স্বপ্নভঙ্গকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুতে রূপ দেয়। গত কয়েক দিন ধরে হাওরের কৃষকের এমন আর্তনাদে ভরা খবর দেখছে বাংলাদেশ।
আগাম বন্যায় ডুবে যাচ্ছে কৃষকের ফসলের ক্ষেত। অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল, বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পানির চাপের কারণে সুনামগঞ্জসহ দেশের সাতটি জেলার হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এপ্রিলের শেষ দিকে টানা অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা নিচু জমিতে পানি জমিয়ে ধান কাটা বিলম্বিত করছে। অপরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাহীন ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ অনেক ক্ষেত্রে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে; কোথাও কোথাও বাঁধ ভেঙে ফসল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
২০১৮ সালে ঠিক এরকম পরিস্থিতি আমি দেখেছিলাম হাওরে। বিপর্যস্ত হাওর থেকে ফিরে এসে কৃষকের দুঃখের কথা লিখেছিলাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বন্যা, বজ্রপাত কিংবা লুটেরা বাজারব্যবস্থার অভিঘাত—কৃষককেই মরতে হচ্ছে। তারা সব হারিয়ে সংকল্পবদ্ধ হয়ে আবারও প্রাণপণে লড়েন। এর মধ্যে অনেকেই কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছেন, আবার অনেকেই কৃষিকেই প্রাণপণে আঁকড়ে ধরছেন। কৃষি ও কৃষক প্রশ্নে যে বক্তব্যগুলো জেলায় জেলায় কিংবা গ্রামে গ্রামে দিয়েছি, সেই অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং দিন যত যাচ্ছে, কৃষকের সংকট আরও বেড়েছে, আরও গভীর হয়েছে। প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত সংকটের মধ্যেই কৃষকের জীবনের ট্র্যাজেডি আরও নির্মম হয়ে উঠছে।
স্বপ্নভঙ্গ আর ঋণের চাপে পিষ্ট কৃষকের জীবনে প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন মৃত্যু যেন হয়ে ওঠে অবধারিত নিয়তি। এর মধ্যেই খবর পেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ৬ বিঘা জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে জমিতেই লুটিয়ে পড়লেন আহাদ মিয়া। ৫০ হাজার টাকার ঋণ করে আবাদ করেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ এই কৃষক।
একই দিনে একই ধরনের আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরে। তিন একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সইতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৬০ বছর বয়সী কৃষক আক্তার হোসেন। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে তার জমির ধান পানির নিচে চলে যায়। কিছু ধান কাটা হলেও পরিবহন সংকটে তা বাড়িতে আনতে পারেননি। বিকেলে জমিতে গিয়ে ধান তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান।
আসলে আমাদের দেশের কৃষকেরা চড়া সুদে দাদন ব্যবসায়ী কিংবা এনজিও ঋণের যে জালে বন্দি থাকেন, তাতে ফসল হারানো মানেই জীবনের সব অবলম্বন হারানো। সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া এই মানুষগুলোর কাছে ফসলের অপচয় কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং বেঁচে থাকার চরম অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্র কৃষকের এই মৃত্যুকে স্রেফ ‘অপঘাত’ হিসেবে দেখে দায় এড়াতে চায়।
কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ—উভয় কারণেই নাস্তানাবুদ হয়ে থাকেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই শুধু বজ্রপাতে দেশে ৭২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বড় একটি অংশই কৃষক। বেশিরভাগ ঘটনায় দেখা যায়, ধান কাটার মৌসুমে প্রচণ্ড ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে যখন তারা মাঠে কাজ করছেন, তখনই এই মৃত্যুগুলো ঘটছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কৃষকের জন্য ফসলের মাঠে কোনো কার্যকর সুরক্ষা কেন নেই? হাওর বা গ্রামীণ কৃষিজমিতে পর্যাপ্ত বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা ও নিরাপদ আশ্রয় নেই কেন? পর্যাপ্ত তালগাছ বা উঁচু প্রাকৃতিক সুরক্ষা কাঠামো, যা একসময় কিছুটা হলেও ঝুঁকি কমাত, তাও কেন নেই? উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা বা মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা অবকাঠামো এখন প্রায় অনুপস্থিত। ফলে কৃষকের মৃত্যু অনেক সময় ‘অপঘাত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হলেও, বাস্তবে এগুলোও একেকটি কাঠামোগত হত্যা। কৃষক কেন এই ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করবেন, আর রাষ্ট্র কেন তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না—এই প্রশ্নগুলো আজ আরও জোরালোভাবে সামনে আনা জরুরি।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, এই মৃত্যু বা বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো মানুষ কয়েক দিনের মধ্যেই ভুলে যায়। কারও কাছেই যেন এই মৃত্যুগুলো মনে রাখার দায় নেই। একজন কৃষকের মৃত্যু বা তার পরিবারের সারা জীবনের দুর্ভোগ নিয়ে সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক পরিসরে তেমন আলোচনা হয় না। কারণ, দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রাম রাজনীতির মূল স্রোতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিংবা নীতিনির্ধারণী আলোচনায়ও কৃষক বা শ্রমিকের কথা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের মধ্যেই পড়ে থাকে; তাদের পাশে দাঁড়ানোর কোনো কার্যকর কাঠামোগত ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। তাই এই মৃত্যুগুলোকে প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়। অথচ এর পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করা জরুরি। কেন একজন কৃষক বারবার এমন অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন? কেন তার জীবনের নিরাপত্তা, ফসলের সুরক্ষা থাকবে না? কেন একজন কৃষক তার ফসলের ন্যায্য ও লাভজনক দাম পাবেন না—তা নিয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত আলোচনা ও যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
প্রতিবছরই একই চিত্র সামনে আসে। সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক তার ফসল বিক্রি করতে পারেন না। এ বছরও খবর আসতে শুরু করেছে, সরকার যেখানে প্রতি মণ ধানের মূল্য ১৪৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে, সেখানে কৃষক বাধ্য হয়ে ৬০০ টাকারও কম দামে ধান বিক্রি করছেন। হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ; বন্যার কারণে ফসল তলিয়ে গেছে। যারা ধান কাটতে পেরেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ফসলের দাম প্রতিদিন কমছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সময়ে ধান কেনার মতো ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকের নিজের ঘরেও ধান সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তারা কম দামে ফসল বিক্রি করছেন, যা তাদের ক্ষতির বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রশ্নগুলোই বারবার সামনে আনা জরুরি, কারণ কৃষকের জীবন আর সংগ্রাম বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি, সমাজ ও ন্যায্যতার প্রশ্নের সঙ্গে কৃষি ও কৃষক গভীরভাবে যুক্ত। কৃষকের দুঃখকে অদৃশ্য করে রাখার প্রবণতা বন্ধ না হলে, হাওর তো বটেই, সারা দেশের কৃষকের বাস্তবতাও কোনোভাবেই বদলাবে না। তখন প্রতি বছরই কৃষকের যন্ত্রণাকাতর মৃত্যু ও সংকটের পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।
যতই সময় যাচ্ছে, ততই কৃষকের সংকট আরও গভীর ও বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। বন্যা, অতিবৃষ্টি, ফসলডুবির মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকির পাশাপাশি ভেজাল বীজ সরবরাহ, ভেজাল সার, ভিন্ন জাতের বীজ সরবরাহ এবং বীজের অঙ্কুরোদগমে বিলম্ব—এসব কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যায় কৃষকের জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না। কৃষককে কেন্দ্র করে মূলধারার রাজনীতিতে কার্যকর কোনো আলোচনা বা অগ্রাধিকারও দৃশ্যমান নয়। তাদের জীবন-জীবিকা, রুটি-রুজি, ফসলের ন্যায্য মূল্য—এসব মৌলিক বিষয় নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রায় অনুপস্থিতই থেকে যায়। ফলে কৃষক এক ধরনের নিদারুণ ও দীর্ঘস্থায়ী অবহেলার চক্রে আটকে থাকেন।
এই অবস্থার ভেতরে আরও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো বাজার ব্যবস্থার নানা স্তরে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। কখনও সার, কখনও বীজ, আবার কখনও ফসল বিপণনের মধ্যস্থতায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট কৃষকের ন্যায্য অধিকারকে সংকুচিত করে। এক সিন্ডিকেটের জায়গায় আরেক সিন্ডিকেট, এক রাজনৈতিক ছায়ার জায়গায় আরেক রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এই ধারাবাহিকতা কৃষকের দুর্দশাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও পাকাপোক্ত করে তুলছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নানা ধরনের সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু কৃষি খাত নিয়ে কোনো আলাদা সংস্কার কমিটি ছিল না। এ থেকেই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির অনেক কিছুই বোঝা যায়। দেশে এখনও বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত, অথচ সেই বাস্তবতায়ও এসব তথাকথিত সংস্কারে কৃষির কোনো জায়গা হয়নি। কৃষি খাত কতটা বৈষম্যের শিকার, এ থেকে সহজেই এটা অনুমান করা যায়।
তাছাড়া আরও একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো কৃষি খাতের ওপর ক্রমাগত বহিরাগত নীতিগত চাপ ও চুক্তির প্রভাব। আইএমএফ কিংবা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারকে ভর্তুকি কমানোর বেড়াজাল দেওয়া হয়। আর ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র তিন দিন আগে মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করে গেছেন, সেখানেও বলা আছে কৃষি ও শিল্প খাতে ভর্তুকি সীমিত করার মতো শর্ত এবং জিএমও খাদ্য ও বীজের বিস্তার। ফলে স্থানীয় বীজ বৈচিত্র্যের ওপর আরও অনেক বেশি চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে কৃষকের স্বনির্ভরতা ও কৃষির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে মার্কিন কর্পোরেট ও বহুজাতিকের হাতে ক্রমান্বয়ে চলে যাবে। প্রশ্ন হলো, আদৌ কি কৃষক স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারবে, নাকি ধীরে ধীরে সে কর্পোরেট ও মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে?
হাওরের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি কিছু তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আশু পদক্ষেপ হিসেবে হাওরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, ঋণ মওকুফ, বিশেষ প্রণোদনা, রেশনিং এবং সার-বীজ-কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কৃষি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধানের জন্য নদী ও খাল পুনঃখনন, টেকসই ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কিংবা গবেষণা করে এর কার্যকর বিকল্প, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ এবং পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে সুসংগঠিত পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে হাওর অঞ্চলে অবৈধ দখল ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
হাওরের কৃষকের সংকট কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ও রাজনৈতিক অবহেলার প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনিক অবহেলা, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। হাওরসহ অন্যান্য অঞ্চলে কৃষকদের রক্ষায় সংগঠন এবং জোরদার লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।