Published : 25 Jul 2026, 05:08 PM
সমুদ্রে জাহাজের আনাগোনা বা গর্জন শুনলে তিমিরা বিশেষ ধরনের শব্দ তৈরি করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
বিজ্ঞানীদের দাবি, তিমির এ ডাক বা ‘ক্লিকের প্যাটার্ন’ এতই সুনির্দিষ্ট যে, তা বিশ্লেষণ করে কাছাকাছি কোনো জাহাজ আছে কি না তা অনুমান করা সম্ভব।
টানা চার বছর ধরে ক্যারিবীয় দ্বীপ ডমিনিকার উপকূলে ১৫টি স্পার্ম হোয়েলের যোগাযোগের ওপর গবেষণা চালিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছেন ‘প্রজেক্ট সিটি’ বা ‘সেটেসিয়ান ট্রান্সলেশন ইনিশিয়েটিভ’ নামের এক অলাভজনক গবেষণা সংগঠনের গবেষকরা।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ইকোলজিক্যাল ইনফরম্যাটিক্স’-এ।
গবেষকরা বলছেন, আশপাশে জাহাজের চলাচলের সময় তিমিদের ‘কোডা’ বা যোগাযোগের সংক্ষিপ্ত শব্দের ছন্দে স্পষ্ট পরিবর্তন আসে। জাহাজের উপস্থিত টের পেলে এদের ডাকের সময়সীমা বা দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট ধরন বেশি প্রাধান্য পায়।
‘প্রজেক্ট সিটি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডেভিড গ্রুবার বলেছেন, “এ গবেষণায় বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে যে, তিমিরা কি জাহাজগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, নাকি আশপাশে জাহাজের উপস্থিতির কারণে এদের কণ্ঠস্বরে এমন প্রভাব পড়ছে? এরা জাহাজ নিয়ে কী বলছে তা যদি আমরা বুঝতে পারি তবে তা সামুদ্রিক নীতিমালা ও আইন তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।”
স্বাভাবিক অবস্থায় ডমিনিকা উপকূলের একটি তিমি, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অ্যাটউড’, এক নির্দিষ্ট ছন্দে পাঁচবার ‘ক্লিক’ শব্দ করে কথা বলছিল, যা ওই অঞ্চলের নির্দিষ্ট তিমি দলের নিজস্ব ধরণ।
তবে আশপাশে কোনো জাহাজের শব্দ বা ইঞ্জিনের শব্দ আসার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাটউড একই ছন্দের বিভিন্ন শব্দ তুলনামূলক দ্রুতগতিতে করতে শুরু করে ও এসব শব্দের মধ্যবর্তী বিরতি কমিয়ে আনে।
সমুদ্রে জাহাজের চলাচলের সময় কেবল আওয়াজ বা গতি পরিবর্তন নয়, তিমি নিজেদের ডাকের ধরনই বদলে ফেলে।
‘প্রজেক্ট সিটি’-এর ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গাসপার বেগাস বলেছেন, “তিমিদের এ ডাকের মেলবন্ধন এতটাই সুনির্দিষ্ট যে, কেবল এদের আওয়াজ শুনেই আশপাশে জাহাজের উপস্থিতি অনুমান করা সম্ভব।”
গবেষণার জন্য ১৫টি তিমির দল থেকে এক হাজারটিরও বেশি ‘কোডা’ বা শব্দমালা রেকর্ড করেছেন গবেষকরা। তিমিদের যেন কোনো কষ্ট না হয় সেজন্য ড্রোন প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে এদের দেহে অডিও ট্যাগ বসানো হয়। পরে ডিজিটালি জাহাজের ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করে তিমিদের পরিবর্তিত সুরের সঙ্গে তা গবেষকরা মিলিয়েছেন।
সাধারণত সামুদ্রিক প্রাণীরা অতিরিক্ত শব্দদূষণে নিজেদের আওয়াজ বাড়িয়ে দেয় বা চিৎকার করে। তবে গবেষকরা অবাক হয়ে দেখেছেন, স্পার্ম তিমিরা আওয়াজ বাড়ানোর বদলে নিজেদের কোডার ধরন ও প্রকাশের গতি পরিবর্তনকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
এর আগের গবেষণায় স্পার্ম তিমির ডাকে মানুষের ‘স্বরবর্ণের’ মতো ধ্বনি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছিলেন প্রজেক্ট সিটির গবেষকরা। তাদের মতে, তিমিদের ব্যবহৃত একাধিক ‘ক্লিক’ শব্দের মধ্যবর্তী ব্যবধান কমিয়ে গতি বাড়িয়ে দিলে তা মানুষের স্বরবর্ণ ‘আআআআ’ ও ‘ইইইই’-এর মতো শোনায়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, আশপাশে জাহাজ বা শব্দদূষণ থাকলে তিমিরা ‘আআআআ’ সদৃশ ধ্বনি বেশি ব্যবহার করে।
গাসপার বেগাস বলেছেন, “গবেষণাটিতে প্রথমবার ধারণা পাওয়া গেল যে, তিমিদের এসব স্বরবর্ণ সদৃশ ধ্বনি হয়ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বহন করে। কারণ জাহাজের গোলমালের মধ্যে এরা এসব ধ্বনির ব্যবহারে স্পষ্ট পরিবর্তন আনছে।”
তিমিদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মানুষের ‘ভাষা’ বা ‘স্বরবর্ণের’ সঙ্গে তুলনা করা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী আগে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, বিষয়টি মানুষের ভাষার সঙ্গে অতিরিক্ত জোর করে মেলানোর মতো।
ডেভিড গ্রুবার বলেছেন, সেই সমালোচনা মাথায় রেখে তারা সরাসরি ‘ভাষা’ বা ‘স্বরবর্ণ’ না বলে ‘স্বরবর্ণ-সদৃশ’ পরিভাষা ব্যবহার করছেন।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক গবেষণা সংস্থা ‘সিফাস’-এর আন্ডারওয়াটার নয়েজ বিশেষজ্ঞ নেথান মার্চেন্ট বলেছেন, জাহাজের শব্দ ছাড়াও অন্য কোনো অজানা কারণে তিমিদের যোগাযোগের এ পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে তার প্রাথমিক ধারণা অনুসারে, জাহাজের উপস্থিতির সঙ্গেই এ পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি এ গবেষণায় সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
মার্চেন্ট বলেছেন, এর আগেও বেশ কিছু গবেষণায় জাহাজের বিকট শব্দের উপস্থিতিতে সামুদ্রিক প্রাণীদের আচরণ ও ডাকের শব্দের মাত্রায় পরিবর্তন আসার প্রমাণ মিলেছে।
“গবেষণাটিকে যা আলাদা করে তুলেছে তা হচ্ছে, এখানে তিমিদের ডাকের সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। পানির নিচের শব্দদূষণ কীভাবে তিমির মতো প্রাণীদের ওপর প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে নতুন মাত্রা যোগ করল এ গবেষণা।”
তিমিদের এসব সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের প্রকৃত মানে কী তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
“জাহাজের হইচইয়ের মধ্যে তিমিরা কি নিজেদের সাধারণ কথাগুলোই কষ্ট করে বলতে চাইছে, নাকি এ শব্দের উপস্থিতিতে এরা সম্পূর্ণ নতুন বা ভিন্ন কিছু প্রকাশ করছে? এমন প্রশ্ন সত্যিই রোমাঞ্চকর।”