Published : 17 Aug 2025, 04:33 PM
একটি সরকার যায়, আরেকটি আসে। কিন্তু দেশের ভাগ্য বদলায় না। বদলায় না মানুষ, বদলায় না ব্যবস্থার চরিত্র। উল্টো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিদেশে টাকা পাচার—এসব কেবল বাড়তেই থাকে। আমরা একটা প্রজন্ম তারুণ্যের উত্তাপ নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আমরা ভেবেছিলাম, তাকে সরাতে পারলে দেশে গণতন্ত্র আসবে। কিন্তু বুঝতে বেশি সময় লাগল না যে, এক ধরনের স্বৈরাচার যায়, আরেক ধরনের স্বৈরাচার আসে। দুর্নীতির মাত্রা কমে না বরং তার রং বদলায়, পদ্ধতি বদলায়, কিন্তু উদ্দেশ্য ওই পুরোনো, ক্ষমতাকে নিজের এবং নিজের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর লাভের জন্য ব্যবহার করা।
এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় আমরা ভেবেছিলাম, মানুষ ভোট দিতে পারবে, মতপ্রকাশ করতে পারবে, দেশ পরিচালনায় জবাবদিহি থাকবে। কিন্তু তার বদলে পেলাম কমিশন বাণিজ্যের বটগাছ। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হতে লাগল ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায়। রাষ্ট্রীয় প্রকল্প মানেই বাণিজ্য। নীতি নয়, আদর্শ নয়—সবই তখন বাণিজ্যিক লেনদেনের বস্তু।
ওই সরকার গেল, আরেক সরকার এল। কিন্তু দুর্নীতি কমল না, বরং আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাংক খালি হতে লাগল, ভাণ্ডার ফাঁকা হতে লাগল, টাকাগুলো খুঁজে পাওয়া গেল বিদেশি ব্যাংকে, বিদেশি বাড়িতে, বিদেশি ব্যবসায়। ব্যাংক থেকে টাকা লোপাট হয়ে গেল, অথচ কেউ কিছু করল না। বরং চোরদেরই আমরা আবার নেতৃত্বে বসালাম। এই অদলবদলের মধ্যে দেশ চলে আসছে নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে।
এরপর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আবার পালাবদল হলো। আবার একটি নতুন সরকার, নতুন মুখ, নতুন আশা নিয়ে যাত্রা শুরু করল। কিন্তু শুরুতেই বুঝিয়ে দিল, তারা পুরোনো পথেই হাঁটবে। তাদের মুখে নতুন কথা, কিন্তু কাজে পুরোনো কৌশল। দুর্নীতি থামেনি। দুর্নীতি এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গেছে যে, একজন সাধারণ মানুষ চাইলেও আর কোনো সরকারি কাজ নিয়মমাফিক করতে পারে না। ফাইল নড়াতে টাকা লাগে, অনুমোদন পেতে ঘুষ লাগে, চাকরি পেতে সুপারিশ লাগে, এমনকি বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তির জন্যও মাধ্যম লাগে, লাগে টাকাও।
এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশে এখন এমন এক সময় চলছে, যেখানে দুর্নীতি আর পাচার একে অন্যের পরিপূরক। রাষ্ট্রের ভেতরে গোষ্ঠীভিত্তিক এক লুটেরা শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা কেবল রাষ্ট্রের সম্পদ নয় জনগণের স্বপ্ন, আস্থা ও প্রত্যাশা লুট করে নিচ্ছে। তারা জানে এই দেশে থাকার প্রয়োজন নেই, তারা বিদেশে বাড়ি করছে, সন্তানদের বিদেশে পড়াচ্ছে, পাসপোর্ট নিচ্ছে দ্বিতীয় দেশের, নাগরিকত্ব নিচ্ছে উন্নত রাষ্ট্রের। তাদের কাছে বাংলাদেশ এখন ‘উৎসস্থান’—যেখান থেকে টাকা তুলতে হবে, জমা দিতে হবে বিদেশের সুরক্ষিত অ্যাকাউন্টে।
এভাবেই রাজনীতি এখন পরিণত হয়েছে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়। এতে বিনিয়োগ কম, ঝুঁকি কম, আর মুনাফা প্রায় নিশ্চিত। রাজনীতিতে ঢুকতে লাগে কিছু পৃষ্ঠপোষকতা, কিছু ক্ষমতার নেটওয়ার্ক, কিছু কৌশল। তারপর একবার এমপি-মন্ত্রী হলে পেছনে তাকাতে হয় না। সরকারি টেন্ডার, বরাদ্দ, বিদেশ সফর, প্রকল্প, নিয়োগ, কমিটি—সব কিছুতেই সুযোগ। অন্য সব ব্যবসা করে এত দ্রুত এত লাভ সম্ভব নয়। ফলে যারা আগে ব্যবসায়ী ছিল, তারাও এখন রাজনীতিতে আসছে, প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসা বাড়াচ্ছে, কিংবা রাজনীতির প্রভাবেই ব্যবসার বৈধতা নিচ্ছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, নষ্ট রাজনীতির সেই পুরনো রোগে তরুণদেরও আক্রান্ত হতে দেখছি। আমরা ভেবেছিলাম, নতুন প্রজন্মই ভাঙবে এই দুর্নীতির দেয়াল। কিন্তু দেখা গেল, তারাও কেউ কেউ দেশ নিয়ে ভাবার চেয়ে পুরোনোদের মত ‘নিজে বড় হওয়ার’ প্রকল্পে মনোযোগী।
আশা করা হয়েছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অরাজনৈতিক নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যাত্রা করায় দেশে নতুন কিছু হবে। একটা বড় পরিবর্তন আসবে। এক বছরের অভিজ্ঞতা কি খুব আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো বার্তা দিচ্ছে? আমরা তো দেখছি, ওই পুরোনো পথে হাঁটারই সব আয়োজন, প্রস্তুতি। দখল, চাঁদাবাজি কোনোটা তো বন্ধ হয়নি। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপিও তো নতুন পথে হাঁটছে না। বিএনপি তো সেই পুরোনো কায়দাই বজায় রেখেছে। গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ বাতিল, দায়মুক্ত হয়ে জামায়াত ইসলামী দাপটের সঙ্গে রাজনীতির মাঠে উপস্থিত। কেউই কোনো নতুন পথ দেখাচ্ছে না। আর জনগণের হাতে কোনো বিকল্প আছে?
আমরা এক ধরনের রাজনৈতিক চক্রে আটকা পড়েছি। যারা ক্ষমতায় থাকে তারা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ গড়ে তোলে। যারা বিরোধী দলে থাকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া থাকে, যাতে পরবর্তী সময়ে ওই সুযোগ তারা নিতে পারে। কেউ কোনো আদর্শে দাঁড়িয়ে নেই। কেউ জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করছে না। সবই নিজের জন্য, গোষ্ঠীর জন্য।
তবে অবস্থা এমন নয় যে কোনো পথ নেই। সমস্যা হলো, পথ আছে, কিন্তু ওই পথে চলার মানুষ নেই। দেশে প্রতিদিনই হাজারও তরুণ উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে, কিন্তু তারা রাজনীতিতে আগ্রহী নয়। তারা রাজনীতি বলতে বোঝে কুৎসা, দুর্নীতি, গোষ্ঠীবাজি। ফলে মেধাবীরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। এতে রাজনীতি চলে যায় তাদের হাতে, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ক্ষমতা, প্রভাব ও অর্থ। অথচ এই দেশ বদলাতে হলে, সৎ, মেধাবী ও নীতিবান মানুষদের রাজনীতিতে আসতেই হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের অনাস্থা। এক সময় মানুষ আদালতের ওপর বিশ্বাস রাখত, এখন সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। বিচার বিলম্বিত হয়, পক্ষপাতিত্ব হয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়। প্রশাসন দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন—সব জায়গাতেই নিরপেক্ষতার অভাব। ফলে দুর্নীতিবাজরা রক্ষা পায়, সাধারণ মানুষ ভোগে।
রাষ্ট্র যদি চায় এই পরিস্থিতি বদলাতে, তবে প্রথমেই দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নেতৃত্বে থাকা মানুষদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারা আপসহীন। আর সেটি শুধু কথায় নয়, কাজে দেখাতে হবে। নিজেদের দলের দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রাখতে হবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বিরোধীদলকে দমন নয় বরং ন্যায়সঙ্গত রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দরকার নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কার। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে ক্ষমতার প্রকৃত মালিকানা জনগণকে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন মানেই আতঙ্ক, অর্থের খেলা, প্রভাব বিস্তার, কারচুপি। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। নির্বাচনে সেনা মোতায়েন, সিসিটিভি, ডিজিটাল নজরদারি—সবই থাকতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন কখনো সম্ভব নয়, এ কথা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
তৃতীয়ত, তরুণ সমাজকে রাজনীতিতে আনা জরুরি। কিন্তু সেটা করতে হলে শিক্ষায় ও সমাজে নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চা বাড়াতে হবে। তরুণদের মনে যদি রাষ্ট্র নিয়ে ভালোবাসা না থাকে, তারা কখনোই সৎ রাজনীতি করবে না। ফলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, আলোচনা সভা, বিতর্ক, গণতন্ত্র চর্চার উদ্যোগ নিতে হবে। ছাত্র রাজনীতি থাকবে, কিন্তু তা হবে পাঠাগারনির্ভর, চর্চানির্ভর—চাঁদাবাজি ও অস্ত্রনির্ভর নয়।
সবশেষে, নাগরিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মী সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিরোধ গড়তে হবে, সচেতনতা তৈরি করতে হবে। মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও মানবিকতা জাগাতে হবে। যারা বিদেশে টাকা পাচার করে, তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। যারা মানুষের টাকা লুট করছে, তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে।
পরিবর্তন সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। একটি জাতি যখন ঠিক করে, তখন ইতিহাস বদলায়। বাংলাদেশও পারে। শুধু দরকার নেতৃত্বে সৎ সাহসী মানুষের আগমন। দরকার মেধাবী ও সততার জায়গায় থাকা নাগরিকদের সাহসিকতা। আর দরকার আমাদের সবার সম্মিলিত চাপ, যাতে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর বুঝে নেয়, এই জাতি আর দুর্নীতির সঙ্গে আপস করবে না।