Published : 05 Nov 2025, 10:35 PM
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৩৭টি আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। বাকি ৬৩টি আসন ফাঁকা। প্রশ্ন হলো, এই আসনগুলো কি জোটের প্রার্থীদের জন্য খালি রাখা হলো? বিএনপির সঙ্গে কোন কোন দল জোট করছে এবং কাদেরকে কতগুলো আসন ছেড়ে দেওয়া হবে? ফাঁকা এই ৬৩টি আসনই কি শরিকরা পাবে, নাকি প্রথম দফায় যেসব হেভিওয়েট বা গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী বাদ পড়েছেন, তাদেরও অনেকে যুক্ত হতে পারেন? প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপির অঙ্কটা আসলে কী? কারা কোন যুক্তিতে মনোনয়ন পেলেন আর কারাই বা বাদ পড়লেন?
গত ৩ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শারীরিকভাবে ভীষণ অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও বরাবরের মতো এবারও তিনটি আসন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা নির্বাচন করবেন। ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসন থেকে তিনি দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন করবেন বগুড়া-৬ আসনে।
বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা দেশবাসী জানে। এই অবস্থায় তিনি সশরীরে নির্বাচনি গণসংযোগ করতে পারবেন কি না সেটি যেমন প্রশ্ন, তেমনি তারেক রহমান কবে দেশে ফিরছেন, তা নিয়েও রাজনীতিতে আছে নানা সমীকরণ। কিন্তু তারপরও এই দুজনকে চারটি আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি কী বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলে?
রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের যত সমালোচনা করাই হোক না কেন, বাস্তবতা হলো, খালেদা জিয়া এখনও বিএনপির ঐক্যের প্রতীক। তার শারীরিক অবস্থা যাই থাকুক না কেন, তাকে প্রার্থী করার অর্থই হলো দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা এবং সেইসঙ্গে অন্য দলগুলোর ওপরেও এটি একটি বাড়তি চাপ। ম্যারাডোনা শেষদিকে খেলতে না পারলেও তার মাঠে থাকাটাই যেমন প্রতিপক্ষের জন্য বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ হতো, খালেদা জিয়ার নির্বাচনের মাঠে থাকাও সেরকম। অর্থাৎ শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যদি তিনটি আসনে সশরীরে গণসংযোগ করতে নাও পারেন, যদি তিনি বিভিন্ন সমাবেশে ভার্চুয়ালিও বক্তব্য দেন, তারপরও ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও জনপ্রিয়তার কারণে তিনি সবগুলো আসনে জয়ী হবেন—এটি মোটামুটি নিশ্চিত। অর্থাৎ প্রার্থী মনোনয়নে এটি হচ্ছে বিএনপির প্রথম অঙ্ক।
বিএনপি ঘোষিত ২৩৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮১ জন এবারই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ১৫১ জন আগে কোনো না কোনো নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন। তবে এবার প্রাথমিক তালিকায় নেই বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট বা গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির নয়াপল্টনের কার্যালয় পাহারা দিয়ে রাখা দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও প্রার্থী তালিকা নেই—যা অনেককেই বিস্মিত করেছে। এবার বাদ পড়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও রফিকুল ইসলাম মিয়া। ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলেকে অবশ্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, রফিকুল ইসলাম মিয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছে শারীরিক অসুস্থতার কারণে। তবে আওয়ামী লীগের আমলে নির্যাতিত এবং দলের ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও এবার মনোনয়ন পাননি। বাদ পড়েছেন সদ্য মনোনীত যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরও। এছাড়া দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে আব্দুস সালাম, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আসলাম চৌধুরী, আমিনুর রশীদ ইয়াসিন এবং ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপনের নামও নেই প্রার্থীর তালিকায়।
এখানে বিএনপির অঙ্কটা পরিষ্কার নয়। তবে অনেকে মনে করছেন, যে ৬৩টি আসন ফাঁকা আছে, তার অনেকগুলো আসনে হয়তো এই নেতারা মনোনয়ন পাবেন। আবার যদি সংসদে উচ্চকক্ষ হয়, তাহলে সেখানে মনোনয়নের জন্যও তাদেরকে প্রাথমিক তালিকার বাইরে রাখা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন কিংবা উচ্চকক্ষ-কোথাও জায়গা না হলেও দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের কেউ কেউ টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কিংবা সরকারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব পেতে পারেন—এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণার সময়ই দলের মহাসচিব বলেছিলেন, এটিই চূড়ান্ত নয়। যেকোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে। ঠিক তাই হলো। ২৪ ঘণ্টা না যেতেই বাদ পড়েছেন মাদারীপুর-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া কামাল জামান মোল্লা। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অনিবার্য কারণে ওই আসনে তার প্রার্থিতা স্থগিত করা হয়েছে। এমনকি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতেও নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে কামাল মোল্লার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের খবর। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ অনেক নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে কামাল মোল্লার ঘনিষ্ঠতার কিছু ছবি ভাসছে ফেইসবুকে। এসব কারণেই তিনি বাদ পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রশ্ন আসতে পারে হঠাৎ কেন প্রার্থী ঘোষণা করা হলো? ফেব্রুয়ারিতে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষিত সময়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে কি না—এ নিয়ে যখন জনমনে সংশয়ের অন্ত নেই; যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগে গণভোট নাকি জাতীয় নির্বাচন, এই নিয়ে তর্ক এবং যে তর্কের অবসানে অন্তর্বর্তী সরকার বল ঠেলে দিয়েছে রাজনীতিবিদদের কোর্টে—ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ করে ২৩৭ আসনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের রাজনীতিটা কী?
যদিও একটু খোঁজখবর যারা রাখেন, তাদের অজানা নেই, জামায়াতে ইসলামী আসলে এই বছরের শুরুতেই ৩০০ আসনের প্রায় সব কয়টিতেই কে কোন আসনে লড়বেন, তা জানিয়ে দিয়েছে। দলীয় সবুজ সংকেত পাওয়া এই প্রার্থীরা ভোটের মাঠে যথেষ্ট সক্রিয় আছেন। তবে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ঘোষণা না দিয়ে প্রার্থীদের সক্রিয় রাখার এমন সক্ষমতা জামায়াতেরই আছে। তাই তাদের পক্ষে গণভোটের আগে নির্বাচন নয়, এমন দাবির দ্বৈতনীতিতে খেলা সম্ভব হচ্ছে।
বিএনপির পক্ষে এমনটা সম্ভব নয়, তারা তা করতেও চায়নি। আর চায়নি বলেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছে। এমন প্রকাশ্যে তালিকা ঘোষণা করে বিএনপি কি অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত ও এনসিপির ওপর চাপ তৈরি করতে চাইল, যাতে কোনোভাবেই ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনটা ঝুলে না যায়? অর্থাৎ বিএনপি নিজে নির্বাচনের ট্রেনে চড়ার মধ্য দিয়ে কি অন্য দলগুলোকেও এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আসতে উদ্বুদ্ধ করছে বা তাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে?
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের বৈঠকের পরদিনই বিএনপি তাদের দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করলো—যেদিন দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গণভোট ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলাকে এক সপ্তাহ সময় দিয়েছেন।
শোনা যাচ্ছে, সেনাবাহিনী কোনোভাবেই নির্বাচন বিলম্বিত হোক তা চায় না। অর্থাৎ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক অনৈক্য বা বিভক্তি যতই থাকুক, সেনাবাহিনী চায় প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যাতে জাতীয় নির্বাচন হয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনী মাঠে আছে। তারাও এখন ব্যারাকে ফিরতে চায়—এমনটাও শোনা যায়। সেইসঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক—এমন অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ীরাও দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগ আটকে আছে। উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও হুমকিতে পড়েছে। ফলে তারা মনে করেন, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যত দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে, দেশের অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গল। তাছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য আছে এবং ভূরাজনৈতিক নানা স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে, সেসব দেশের পক্ষ থেকেও দ্রুত নির্বাচনের তাগিদ আছে বলে শোনা যায়। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই কি তাহলে বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করল?
তবে প্রার্থীদের মনোনয়নই শেষ কথা নয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে রাজনীতির হাওয়া বদল হবে। সব দল তাদের প্রার্থী ঘোষণার পরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বঞ্চিতদের বিক্ষোভ ইত্যাদি যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সংঘাতও শুরু হতে পারে। অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে কী ভূমিকা পালন করবে, তাতেও হয়তো ভোটের অনেক অঙ্ক নির্ভর করবে। সুতরাং, প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি নির্বাচনের ট্রেনের যে যাত্রা শুরু করল, সেই ট্রেনটি কত দ্রুত সময়ে এবং কতটা নির্ঝঞ্ঝাটে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, সেটি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দল এবং সরকারের সক্ষমতার ওপর।