Published : 25 Dec 2025, 12:18 PM
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরলেন। তার দেশে ফেরার খবরটি কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্বপরিবারে বৃহস্পতিবার ঢাকায় পৌঁছালেন। সঙ্গে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান রয়েছেন। লন্ডনের হিথ্ররো বিমানবন্দর থেকে বুধবার রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনের নিয়মিত ফ্লাইটটি সিলেট হয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়ে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে তিনি যাচ্ছেন সংবর্ধনাস্থলে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনা। কারণ সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক থেকে নাজুকতর হয়েছে। সরকারের কার্যকর উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এরই মধ্যে এক ধরনের উগ্র ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে শান্তিকামী মানুষের বড় একটি অংশ একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। দল হিসেবে বিএনপির অতি নিন্দুকেরাও মনে করে এ দলটি অন্তত ‘উগ্র রাজনীতি’র ধারক নয়। দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতাও দলটির রয়েছে। ফলে এই দলের ‘প্রাণভোমরা’ তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের নয়, বরং একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যাশায় থাকা বহু মানুষের কাছেও আগ্রহরে কারণ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমান কেন লন্ডনে অবস্থান করছেন, সেটির পটভূমিও পাঠকদের জানা দরকার। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে দেশজুড়ে দলটির শাসনব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। একই সময় আওয়ামী লীগ শক্ত আন্দোলন গড়ে তোলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে নিজেদের পছন্দের বিচারপতিকে বসাতে বিচারপতির অবসর গ্রহণের বয়স বাড়ানোর উদ্যোগ আওয়ামী লীগের আন্দোলনকে আরও গণভিত্তি দেয়। এরপর দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করা হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয় এবং দেশ চরম অরাজকতার দিকে গড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, যা এক-এগারোর সরকার নামে পরিচিত।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমান বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব প্রবল চাপে পড়ে। গ্রেপ্তার, মামলা, রিমান্ড ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের দেশত্যাগ অনেকটাই বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালীন তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার বিচার ও রায় হয় এবং অনুপস্থিতিতেই সাজা কার্যকর করা হয়। এতে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়। ক্ষমতাসীনদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত’, আর বিএনপির দৃষ্টিতে তিনি ‘রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার’। এই দুই বিপরীত বয়ানের মধ্য দিয়েই গত প্রায় দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতটা হচ্ছে, নিরাপত্তার প্রশ্নটি ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয় না, যা উদ্বেগজনক। বাস্তবতা হলো, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে শুধু বিএনপিকেই ভাবলে চলবে না, তাকেও অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমাদের দেশে ‘ঘোলা জলে মাছ শিকার’ করার লোকের অভাব নেই। সম্প্রতি ওসমান হাদি নিহত হওয়ার ঘটনা সেই আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এখানে হত্যার রাজনীতি একটি পরিচিত ঘটনা। বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে ষড়যন্ত্র, উসকানি কিংবা সহিংসতা ঘটানোর নজিরও এ অঞ্চলে বিরল নয়। সুতরাং তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন যদি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও দলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো, তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন ঘিরে যে গুজব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার অনেকটাই কমবে এখন। সম্প্রতি নানা ধরনের গুজব ডালপালা মেলছে। যেমন, দেশে ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন হবে, অনির্বাচিতরাই দেশ চালাবে, একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সব ধরনের সুযোগ–সুবিধা দিয়ে শক্তিশালী করে তোলা হবে—এমন কথাবার্তা রাজনীতির আড্ডা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত ছড়িয়েছে।
একটি সক্রিয় ও সংগঠিত রাজনৈতিক দলের মাঠে থাকা মানেই এসব গুজব ও কারসাজির আশঙ্কা অনেকটা কমে যাওয়া। তারেক রহমানের আগমন মানেই বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঙ্গা হওয়া। আর বিএনপি চাঙ্গা হলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, অস্বচ্ছতা ও অলীক ধারণার জায়গা সংকুচিত হবে বলেই আশা করা যায়। কারণ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে, নির্বাচন হলে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাই তারা যে কোনো মূল্যে নির্বাচন চায়।
তারেক রহমান দেশে ফিরলেই যে বিএনপির ‘মরা গাঙ্গে বান’ ডাকাবে—কথা হয়তো অতিরঞ্জিত। তবে দল যে সাংগঠনিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। খালেদা জিয়া সাংগঠনিকভাবে দলীয় প্রধান হলেও, তার অসুস্থতাজনিত কারণে কার্যত তারেক রহমানই দলের প্রধান। দীর্ঘদিন পর মূল নেতার সরাসরি উপস্থিতি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে।
কিন্তু একই সঙ্গে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও শুরু হবে এখান থেকেই। আগামী দিনে দলটির মূল লক্ষ্য হবে—সব ধরনের বিরুদ্ধ শক্তিকে মোকাবিলা করে নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে আনা। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকার কারণে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় অন্য দল ও গোষ্ঠীগুলোর প্রধান টার্গেট হবে বিএনপি ও তারেক রহমান। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু একটি–দুটি দলের সঙ্গে নয়; বরং বহুমুখী শক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বিএনপিকে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উগ্র ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো তারেক রহমানকে দুর্বল করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে পারে। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে একটি সুর শোনা যাচ্ছে—‘বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিকে তো দেখেছি; এবার ভিন্ন কাউকে দেখা যাক।’
এই ‘ভিন্ন কেউ’ কিন্তু মোটেও হালকা বা বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়। তারা তলে তলে বেশ সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাদের কাছে এটি ‘নাও অর নেভার’ পরিস্থিতি। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে জিততে তারা মরিয়া। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে দুর্বল করতে সর্বোচ্চ কৌশল ও শক্তি প্রয়োগ করবে তারা—এটাই স্বাভাবিক।
তারেক রহমানকে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই রাজনীতির কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি কার্যকর ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সামষ্টিক অংশগ্রহণ, কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল স্তম্ভ যেহেতু দেশের সব নাগরিক, তাই জনস্বার্থকেই যাবতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে ইতিহাসের বিচ্যুতি ও ব্যর্থতাগুলো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পথচলায় তার পুনরাবৃত্তি রোধ করা জরুরি।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা ক্ষমতাসীনদের জন্যও একটি পরীক্ষা। একদিকে শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তনকে নিষ্কণ্টক করা, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মাঠ উন্মুক্ত ও বড় করার সুযোগ। সরকার যদি এটিকে সহনশীলতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক মহলেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির দেশে ফেরা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় শুরুর সম্ভাবনা। এটি প্রতিহিংসার পুনরাবৃত্তিও হতে পারে, আবার গণতন্ত্রের নতুন যাত্রাও হতে পারে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। এটা শাসক, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সবার ক্সেত্রে প্রযোজ্য। ব্যক্তি বা দল নয়, শেষ পর্যন্ত জয় হওয়া প্রয়োজন গণতন্ত্রের।
ইতিহাস প্রমাণ করে, কাউকে চিরদিন নির্বাসনে রাখা যায় না। জোর করে কাউকে রাজনীতি থেকে বাদও দেওয়া যায় না। প্রশ্ন একটাই, তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে আমরা সংকটের দিকে ঠেলে দেব, নাকি রাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেব? তারেক রহমানকেও নির্ধারণ করতে হবে, তিনি দেশে ফিরে কোন বার্তা দেবেন? পুরনোদের রেখে যাওয়া পথেই হাঁটবেন, নাকি নতুন করে শুরু করার কথা বলবেন? সম্ভাবনার পথ দেখাবেন?