Published : 09 Oct 2025, 02:56 PM
গত কদিন ধরে ‘সেইফ-এক্সিট’ কথাটা নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলায় 'সেইফ এক্সিট' শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় 'নিরাপদ প্রস্থান' বা 'নিষ্ক্রমণ'। এটা দ্বারা নিরাপদ ও ঝামেলামুক্তভাবে কোনো স্থান, অবস্থা বা পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার পথকে বোঝানো হয়। সাধারণত জরুরি অবস্থার সময়, ভবন থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পথ ও উপায়গুলোকেও 'সেইফ এক্সিট' বলা হয়। কিন্তু রাজনীতিতে এই শব্দের একটা আলাদা মাহাত্ম্য বা অর্থ আছে। রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, কোনো দল বা ব্যক্তির ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার বা কোনো সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে বের হওয়ার একটি নিরাপদ ও সুবিধাজনক উপায়কে 'সেইফ এক্সিট' বলা যেতে পারে।
ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশের ‘সেইফ এক্সিট’ হওয়ার কথা ছিল দুঃশাসন, খুন, গুম, নির্বাচনহীনতা আর জুলুমের দুর্দিন কাটিয়ে দেশ পাবে সুশাসনের পথে এক সেইফ এক্সিট–ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে তাই ছিল জনপ্রত্যাশা। রক্ত, বলিদান, আত্মাহুতির সেই ছিল পরম চাওয়া। কিন্তু সমষ্টির আকাঙ্ক্ষা কেমন করে যেন ব্যক্তির ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। দেশের ‘সেইফ-এক্সিট’ নিয়ে আর কথা নেই, এখন বাহাস উঠেছে কর্তাব্যক্তিদের সেইফ-এক্সিট কতটা নিরাপদ হবে, নাকি ভয়াল হবে–সেই নিয়ে। নিরাপদ নিষ্ক্রমণের পথ খোঁজার তর্ক—হয়তো শুধুই বাহাস। তবে বাস্তবতা হল দেশের আমজনতাকে দেশেই থাকতে হবে দেশটা আবার অনিরাপদ হয়ে পড়লেও।
রাজনৈতিক ন্যারেটিভের বিবেচনায় এই আওয়াজ, আমাদের সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয়ের বার্তাই আনে। এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে, ছাত্রজনতার ডাকে গড়া অন্তর্বর্তী সরকার, অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার ভরকেন্দ্র থেকে দূরত্বেই অবস্থান করছে। পক্ষগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে দূরত্বও। নইলে এই সরকারের যারা বড় অংশীজন, সরকার গঠনের সময় যাদের নড়াচড়া দেখা গেছে, তাদেরই অন্যতম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে ফেলেছে, তারা নিজেদের সেইফ এক্সিটের কথা ভাবতেছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়েছে অথবা গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিট্রে করেছে। যখন সময় আসবে, তখন আমরা এদের নামও উন্মুক্ত করব।’
এর উত্তর অবশ্য দিয়েছেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনিও সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘উপদেষ্টাদের মধ্যে কারা সেইফ এক্সিট নিতে চান, এ বিষয়গুলো নাহিদ ইসলামকেই পরিষ্কার করতে হবে।’
আসলেই কি উপদেষ্টারা এক্সিট খুঁজছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমি একদম কোনো এক্সিট খুঁজছি না। দেশেই ছিলাম, এর আগেও বহু ঝড়ঝঞ্ঝা এসেছে। সেসব ঝড়ঝঞ্ঝা প্রতিহত করে দেশেই থেকেছি। বাকিটা জীবনও বাংলাদেশেই কাটিয়ে যাব।’
নাহিদ ইসলাম কিছুদিন আগেও উপদেষ্টা পরিষদে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সহকর্মী ছিলেন। নাহিদ ইসলামের সুহৃদ-সতীর্থ ছাত্রউপদেষ্টাদের দুয়েকজন এখনও রিজওয়ানার কলিগ। হঠাৎ করে পারস্পরিক সম্পর্কে কি এমন ঘটনা ঘটল যে উপদেষ্টাদের ‘সেইফ-এক্সিট’ নিয়ে কথা উঠছে? রাষ্ট্র-রাজনীতিতে তারা এমন কি করে বসলেন যে, তাদের এক্সিট সেইফ বা নিরাপদ হবে কি হবে না সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই প্রসঙ্গে একটা প্রশ্নও জাগছে। বর্তমান উপদেষ্টাদের সেইফ-এক্সিট না হলে, ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের কুশীলবরাও কি নিরাপদ থাকবেন?
সে প্রসঙ্গে কথা বলবার আগে একটু ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাই। ২০২৩ সালের মে মাসের কথা। দেশে তখন ক্ষমতার মসনদে স্বৈরাচার। রাজপথের আন্দোলনে বিএনপি।
সে সময় ঢাকার এক সমাবেশ থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, ‘যদি সেইফ এক্সিট চান, তাহলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।’
অন্যদিকে একই দিন বিকেলে ঢাকায় এক সমাবেশে এ কথার জবাবে তৎকালীন ক্ষমতাধর মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সেইফ এক্সিট চাইলে নির্বাচনে আসুন। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেইফ এক্সিট কারা নেবে–জনগণই তা নির্ধারণ করবে।’
ইতিহাসের কি রসিকতা দেখুন, এসব বাহাসের অল্প কিছুদিন পর খোদ ফ্যাসিবাদী দল-সরকার-নেতৃবৃন্দ সবাইকে কি রকম করুণভাবে ‘এক্সিট’ নিতে হয়েছে। সেই ‘এক্সিট’ যে সেইফ বা নিরাপদ হয়নি, তা তো বলাই বাহুল্য।
অন্তত এই ঘটনা কি শিক্ষা দেয়? সেইফ-এক্সিট চাইলে রাজনৈতিক দল, সরকার, ব্যক্তিকে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি নৈতিক থাকতে হয়, দায়িত্বশীল হতে হয়। ক্ষমতার জোরে, সম্পদের মোহে, নীতিহীনতার জোয়ারে আর যাই হোক, জনহৃদয়ে জায়গা পাওয়া যায় না। জনহৃদয় থেকে আসন উঠে গেলে, কোনো শক্তিই, আর সেইফ-এক্সিট দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।
জনহৃদয় থেকে আসন উঠে যায় কেন?
সুশাসন না দিলে। জনগণের ওপর নিপীড়ন চালালে। নিজেরা অবৈধ উপায়ে সম্পদ বানিয়ে জনগণকে কষ্ট আর বৈষম্যের সাগরে ভাসিয়ে দিলে। একসময় না একসময় জনগণ রক্ত দিয়ে হলেও দুঃশাসন তাড়ায়। মজলুমের শক্তি জালিমের ‘সেইফ-এক্সিট’ রুখে দেয়।
আমরা যদি পেছন ফিরে তাকাই তাহলে দেখব বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো দুঃশাসন কখনই সেইফ-এক্সিট পায়নি। এখানে রাজনীতি অদ্ভুত বৈপরীত্যময়। জনগণ ভালোবেসে যেসব রাজনৈতিক দলকে কাছে টেনেছে, হাত উজাড় করে টু-থার্ড মেজরিটি দিয়েছে, তারাই জনগণকে ক্ষমতার পাগলা ঘোড়ায় চড়ে পিষে মেরেছে। ফলাফল, রক্তাক্ত রাজনৈতিক বিভীষিকা আর ‘নন সেইফ-এক্সিট’। খুন, গণঅভ্যুত্থান, ১/১১ আর ৩৬ জুলাইর তাজা রক্তাক্ত স্মৃতিই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জনগণের ভালোবাসার, জনগণের আকাঙ্ক্ষার অমর্যাদা করলে তার ফল ভালো হয় না। জনগণ যা চায়, জনগণের সেই চাওয়াটা পড়তে না পারলে বিপদ কাটানো দায় হয়।
তাহলে এখন আমাদের রাজনীতিতে কি ঘটছে, যেখানে এইসব উৎকন্ঠা-উদ্বেগ আসছে?
প্রথমত, ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসার হুঙ্কার দিচ্ছে। দেশ ও বিদেশে বসে তাদের কুশীলবরা জোরেশোরেই নড়াচড়া করছে। এমনকি পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের কুশীলবদের আশ্রয় দেওয়া দেশও এখনো তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিকে এখনো তারা শত্রু চোখেই দেখছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে ফ্যাসিবাদের যে অংশীজনরা বসে আছে তারাও নড়াচড়া করছে। সামগ্রিকভাবে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে রোখা যায়নি। যে সুশাসন, যে রাজনীতি এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে মোকাবেলা করবে, তারাই এখন বহুপক্ষে বিভক্ত। দলীয়, ব্যাক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থেই তারা নিজেদের ভেতরের ঐক্যকে বিনষ্ট করে ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মিলিত শক্তিকে অনেকটাই খর্ব করেছে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকার, উপদেষ্টামণ্ডলি, ছাত্রজনতার ক্ষমতাসীন অংশ যে নৈতিকতা নিয়ে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে, জনগণ নিজেদের সেইফ বা নিরাপদ ভাবত, দেশ সেই সুশাসন পায়নি। মানুষের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান কোনো বিবেচনাতেই মানুষ সুস্থিরতার দেখা পাচ্ছে না। যাদের হাতে তারা নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখবে বলে আশা করেছিল, সেখানে তাদের আশাহত হতে হয়েছে। ফলে, জনতুষ্টি ব্যাপকভাবে অর্জিত হয়নি। জনগণ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন দেখছে না, বরং ক্ষমতাধর অনেকের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবার পুরনো নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেখছে। এটা তাদের আশাভঙ্গ করছে। এই জনহতাশা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিপত্তি তৈরি করছে কিনা সেটা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে মানুষ আর নিতে চাইছে না। নির্বাচনের মাধ্যমে একটা গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং একটা সুস্থিত রাজনৈতিক সরকার এখন আকাঙ্ক্ষিত জনপ্রত্যাশা। কিন্তু সেই পথে উত্তরণের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো মানুষ সুনিশ্চিত নয়। জুলাই সনদ, সনদ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, পিআর পদ্ধতি, গণভোট, গণভোটের সময় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলো যে আলাপ ও বিতর্ক তুলেছে সেখানে সুস্থিত ঐকমত্য সুদূর পরাহত বলে মনে হচ্ছে। ফলে, রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে মানুষের উৎকণ্ঠা দূর হচ্ছে না।
চতুর্থত, আবার এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা এতটাই প্রবল যে, দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, যোগাযোগ, আবাসন, নিরাপদ খাদ্য, ওষুধের দাম, সুচিকিৎসা-ইত্যকার নিত্যদিনের জনচাহিদার বিষয়গুলো খুব একটা মুখ্য হয়ে উঠছে না। না উপদেষ্টারা, না সরকার এসব সমস্যার সমাধান করছেন। না রাজনৈতিক পক্ষগুলো এসব নিয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছেন? সবাই আছেন নির্বাচন আর ক্ষমতার অংশীদার হবার প্রবণতায়। এমনকি যে ছাত্রজনতার ডাকে জনগণ রাজপথে নেমে ফ্যাসিবাদ তাড়াতে জানপ্রাণ দিয়েছিলেন সেসব পক্ষও এসব বিষয়ে অমনোযোগী। এসব প্রবণতা জনগণকে হতাশ করছে।
ফলে, রাজনৈতিক বিনির্মানের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক যে নতুন বন্দোবস্ত তৈরির আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল, সেখানে কোনো নতুন আলোর দেখা মিলছে না। সংস্কার, বিচার, রাজনৈতিক বিনির্মাণের যে আওয়াজ উঠেছিল তাও দিনে দিনে ফিকে হয়ে উঠছে। সরকারে, সরকারের বাইরে যারা ভরসা হয়ে উঠবার কথা ছিল, ভরসার মানুষরা দিনে দিনে, জনগণ থেকে দূরের মানুষ হয়ে উঠছেন। ফলে রাজনৈতিক উত্তরণের বিষয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা-অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সেটাই সবার ‘সেইফ-এক্সিট’ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
পুনশ্চ: পৃথিবীর কোথাও নীতিহীনতা আর ক্ষুদ্রস্বার্থ দিয়ে ‘বৃহৎ অর্জন’ সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এদেশের জনগণ বারবার আশা দেখেছে, রক্ত দিয়েছে, আবার প্রতারিতও হয়েছে। কিন্তু কখনই লড়াই থামায়নি। আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সেটা বুঝতে হবে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বা জনপ্রত্যাশার ‘সেইফ-এক্সিট’ না হলে, কোনো ব্যক্তি-উপদেষ্টা-সরকার-রাজনৈতিক দল কারও ‘সেইফ-এক্সিট’ অতীতেও হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।