Published : 14 Sep 2025, 07:27 PM
অপার হয়ে বসে থাকার পর ফরিদা পারভীনকে পারে লয়ে গেলেন দয়াময়। দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভুগে অবশেষে ‘পারে’ পাড়ি জমালেন এই বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী। অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগী ও গুণগ্রাহী অশ্রুসজল চোখে, ভাঙা হৃদয়ে বিদায় জানিয়েছে তাকে।
বড় বেশি অসময়ে ঘটল তার প্রয়াণ, যখন একটা বদ হাওয়া লেগেছে খাঁচায়। বদ হাওয়াটা ছিল অনেক দিন ধরেই, হালে এটা ঝড়ো হাওয়ায় পরিণত হয়েছে, বাউলের গান গাওয়াকে অপরাধ বলে প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, বাউলদের আখড়া ভাঙা হচ্ছে মহোৎসব করে। আমরা বেদনার্ত হচ্ছি, তখন তার এই বিদায়ে লালনের গানের সঙ্গে মিলিয়ে মনে পড়ছে-‘একটা বদ হাওয়া লেগে খাঁচায়,/ পাখি কখন জানি উড়ে যায়…।’
ফরিদা পারভীনের গানের সঙ্গে আমার পরিচয় চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে। আমি তখন মাধ্যমিকের ছাত্র। তখন পর্যন্ত গান শোনার প্রধান উৎস ছিল মামার কিনে দেওয়া থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডিও আর বাজারে গানের ক্যাসেট বিক্রির দোকান থেকে হুটহাট ভেসে আসা সুর—‘মিলন হবে কতদিনে, আমার মনের মানুষেরই সনে’। মূলত তার মাধ্যমেই লালনের গানের মহাসমুদ্রে আমার অবগাহনের শুরু।
শুধু আমার কাছে নয়, লালনকে নাগরিক মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল সাঁকোটার নামও ফরিদা পারভীন। তিনি লালনকে ধারণ করেছেন, বহন করেছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন এবং জনপ্রিয়ও করেছেন। যদিও লালন তার স্বমহিমায় উজ্জ্বল, তবুও ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ ও অন্তর্দৃষ্টি লালনকে নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছে।
২০১৭ সালের এই রকম সেপ্টেম্বর মাসেই ফরিদা পারভীনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। রাজধানীর তেজকুনিপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় তার প্রতিষ্ঠিত ‘অচিন পাখি সঙ্গীত একাডেমি’র কার্যালয়ে। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের আরণ্যক নাট্যদলের ৪৫ বছর পূর্তি উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো। সেখানে অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনে জানতে পেরেছিলাম লালনসঙ্গীত নিয়ে তার দীর্ঘ যাত্রা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে।
ফরিদা পারভীনের জন্ম নাটোরে, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের এলাকায়। বনলতা সেন আর ফরিদা পারভীন। একজনের বিচরণ কবিতার কল্পজগতে, আরেকজনের এই লৌকিক জগতে। তবে দুজনের মিল এই যে, উভয়েই বাঙালির মনে ‘দু-দণ্ড শান্তি’ দিয়েছেন।
পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে লালনের গান গেয়ে আমাদের সম্মোহিত করেছেন তিনি। শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের সীমানা পেরিয়ে লালনের গানকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন। কণ্ঠের মাধ্যমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য উচ্চতায়। তার কণ্ঠে লালনের গান যেন শুধু সংগীত নয়, এক অনন্য জীবনদর্শন।
ফরিদা পারভীন লালনের গানের স্বরলিপি তৈরির উদ্যোগও নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য—লালনের গানকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা, মৌখিক ঐতিহ্যকে হারাতে না দেওয়া। কেননা ফিউশনের নামে গানের বিকৃতির এক ধরণের প্রচলন বর্তমানে রয়েছে। যা ফিউশনের নামে রীতমতন একধরণের কনফিউশনের জন্ম দেয়। গানকে অন্তর থেকে অনুভব ও শেখানোর জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন অচিন পাখি সংগীত একাডেমি। সেখানে সঙ্গীতের শাস্ত্র, লয়-তাল থেকে শুরু করে লালনদর্শনচর্চা পর্যন্ত সবই অন্তর্ভুক্ত আছে। কেননা লালনের গান শিখতে হলে শুধু কণ্ঠ নয়, মনকেও সুরে মিলাতে হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাউল ও ফকিররা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। মাজার ভাঙা, আখড়ায় হামলা শুধু সাংস্কৃতিক ন্যায্যতার লঙ্ঘন নয়, বরং মানুষের অন্তরে এক শূন্যতা তৈরি করছে। এসব ঘটনা বাংলার সংস্কৃতি ও লোকজ সঙ্গীতের জন্য ভয়াবহ সংকেত। বহুদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাউলদের ওপর সহিংস ঘটনা ঘটছে। কোথাও তাদের মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও তাদের চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বাসস্থান ও বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
২০১১ সালে রাজবাড়ীর পাংশায় একটি চরম নিন্দনীয় ঘটনা ঘটেছিল। সাধুসঙ্গ চলাকালীন ২৮ জন ষাটোর্ধ্ব বাউলকে আঘাত করা হয়েছিল, চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের তওবা করানো হয়েছিল। গুজব ছড়ানো হয়েছিল—তারা ইসলামবিরোধী চর্চা করছে। অথচ সকল ধর্মের মানুষদের মতো বাউল সম্প্রদায়েরও রয়েছে নিজেদের বিশ্বাস ও পথ অনুসরণের পূর্ণ অধিকার। সাধুসঙ্গ বাউলদের সবচেয়ে পবিত্র মিলনস্থল; এটি গান ও জ্ঞান বিতরণের উৎসব। কোনো ধর্মের নীতি এই ধরনের হামলার অনুমতি দেয় না।
রাজবাড়ীর ওই ঘটনার বিচার হয়নি। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ঘটেছিল আপস-মীমাংসা। রাষ্ট্রের উদাসীনতা ও বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণে শুধু রাজবাড়ী নয়, ক্রমাগতভাবে সারাদেশের বিভিন্ন স্থানেই চলছে বাউলদের ওপর হামলা।
২০২২ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার লাউবাড়িয়া গ্রামে ৯০ বছর বয়সী সাধু থেকে শুরু করে সাধিকাদেরও হামলার শিকার হতে হয়েছে। অনুনয়-বিনয় করেও তারা রক্ষা পাননি। ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় বাউল গানের আসরে হামলা চালিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। লালন শাহকে স্মরণ করে মনিরামপুরের পাড়দিয়া গ্রামের উত্তরপাড়ায় এসএম ফজলুর রহমান, যিনি ফকির মন্টু শাহ নামে পরিচিত, তার বাড়িতে টানা ১২ বছর ধরে সাধুসংঘ বাউল গানের আয়োজন হয়ে আসছিল। সেই আসরটি ছিল তার ১৩তম আয়োজন। যে অনুষ্ঠানটি এতদিন নির্বিঘ্নে হয়ে আসছিল, হঠাৎ এমন পরিবর্তন কেন এলো যে, হামলা চালিয়ে তা বন্ধ করে দিতে হলো?
উল্লেখিত তিনটি ঘটনা সামন্য উদাহরণমাত্র। এমন ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে। আমাদের দেশে যে ‘মব কালচার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত বিচার’ প্রথার বিস্তার লাভ করছে, এসব হামলা তারই বহিঃপ্রকাশ। একদল মানুষ নিজেদের মতামত জোর করে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবারই স্থানীয় পুলিশ হামলা ঠেকানোর কোনো চেষ্টা না করে উল্টো সঙ্গীতের আসর দ্রুত বন্ধ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনির এই নীরব প্রশ্রয়ের কারণেই এমন হামলা ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন জায়গায়। অথচ সংবিধান আমাদের নিশ্চয়তা দেয় যে, প্রত্যেক নাগরিকের সমবেত হওয়া, নিজেদের মতাদর্শিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে। সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার উন্নয়ন করবে যাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। বাউল সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অবশ্যম্ভাবী দায়িত্ব। বাউলরা কারও ওপর ক্ষোভ পোষণ করেন না, তবুও নির্বিরোধ বাউলদের ওপর ক্রমিক হামলার উদাহরণ দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে।
একসময় কাজী নজরুল ইসলামকেও বলা হয়েছিল ‘বেদাতি ও ‘ইসলামবিরোধী’। তার ‘খোদার প্রেমের শারাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই’ পড়ে গানটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু সমালোচকরা গানটির মূল দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে বোঝেনি। অথচ আজ সেই নজরুলই ইসলামী সংগীতের অন্যতম প্রধান সাধক হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশে ধর্মীয় আবহে সংগীতচর্চা নতুন কিছু নয়। ইসলামে স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণমূলক গান, ভক্তিমূলক গান বহু আগে থেকেই প্রচলিত। তবুও একসময় কিছু মানুষ ধর্মীয় পুলিশ সেজে নজরুলকে নিয়ে কুৎসা রটাতেন। আজ তাদেরই উত্তরসূরিরা ‘মব’ তৈরি করে আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছেন। এদের কেউ বুঝে করছে, কেউ আবার অন্ধভাবে অন্যদের সঙ্গে মিলছে। এরা কখনো বহিরাগত লাঠিয়াল, কখনো স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্র, আবার কখনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মী।
বাউলদের উপর এসব নির্বিচার হামলায় প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত ছিলেন ফরিদা পারভীন। তিনি নিজে বাউল ছিলেন না, কিন্তু লালনের গান ও জীবনদর্শন অনুসরণের কারণে বাউলদের সঙ্গে ছিলো তার আত্মিক সম্পর্ক। তিনি লালনের গানকে অন্তর থেকে ধারণ করেছেন, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, সঠিকভাবে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই সময়ে যখন, ফিউশনের নামে লালনের বাণীর বিকৃতি ঘটছে, বাউলদের আসরে হামলা হচ্ছে, আখড়া গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তার বিপরীতে ফরিদা পারভীনের মত লোকদের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিলো। প্রয়োজন ছিলো কণ্ঠ উচিয়ে লালনের মানবধর্মের বাণী তুলে ধরার। সেই প্রয়োজনের চরম মুহুর্তেই অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন তিনি।