Published : 22 Jun 2025, 01:19 PM
রংপুর শহরের রাধাকৃষ্ণপুর এলাকার এক প্রান্তিক মুদি দোকানদার ছমেছ উদ্দিন মারা যান ২০২৪ সালের ২ অগাস্ট। ঘটনার দিন কোনো বড় বিক্ষোভ ছিল না বলে জানা যায়, পুলিশ এলেও সরাসরি কোনো সংঘর্ষের খবর মেলে না। মৃত্যুর খবর এল পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে—তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। এতদিন কেউ এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু হঠাৎ ২০২৫ সালের জুন মাসে এক নতুন মাত্রা পায় এই ঘটনা। প্রশাসনের নথিতে ছমেছ উদ্দিনকে ‘জুলাই আন্দোলনের শহীদ’ ঘোষণা করা হয়। দায়ের হয় একটি হত্যা মামলা, যার আসামির তালিকায় আছেন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আরও ৫২ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, এমনকি বিএনপির একজন নেতাও। মামলার ৫৪ নম্বর আসামি করা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হক, যাকে গ্রেপ্তারের কারণে বিষয়টি আলোচনা এসেছে। নইলে অগাস্ট পরবর্তীকালে এই রকম মামলা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই মামলা একদিকে যেমন জনমনে চাঞ্চল্য তৈরি করে, তেমনি বহু প্রশ্নও তোলে—হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়া এক ব্যক্তি কীভাবে ‘হত্যার শিকার’ হয়ে যান? আর মৃত্যুর ১০ মাস পর তদন্ত ছাড়াই একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়ে গ্রেপ্তার হন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক? এই প্রতিবেদনে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার পাশাপাশি তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে, কীভাবে একটি মৃত্যুকে কল্পকাহিনিতে রূপান্তর করে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ফায়দা তোলা হয়।
ঘটনার দিন প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বলছে, ২ অগাস্ট সকালে পুলিশ জামায়াত নেতা হাজী নাছির উদ্দিনকে ধরতে আসে। ওই সময় দোকানে বসা ছমেছ উদ্দিন ভয় পেয়ে দৌড় দেন, কিছুদূর গিয়ে পড়ে যান এবং জ্ঞান হারান। পরে তাকে একটি বেসকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে নিশ্চিত করেন। তার স্ত্রী আমেনা বেগম এবং ছেলে আশিকুর রহমানও একথা স্বীকার করেন। জানাজার ইমাম, স্থানীয় দোকানদার রফিক, প্রতিবেশী নারী মমতাজ বেগমসহ অনেকেই বলেন, ছমেছ উদ্দিনের শরীরে কোনো আঘাত ছিল না, কাউকে মারতে দেখেননি। অথচ ১০ মাস পর মামলার এজাহারে লেখা হয়, ‘ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় ছমেছ উদ্দিনকে রক্তাক্ত করা হয়, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান, পরে হাসপাতালে মৃত্যু।‘

তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়, এই মামলা করেন নিহতের স্ত্রী, যিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেন, ‘আমি কাউকে আসামি করিনি। পুলিশ ডেকে নিয়ে কাগজে সই করিয়েছে।‘ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর পর কেউ ভীত হয়ে মামলা করেনি, পরে কাগজ সংগ্রহ করতে সময় লেগেছে—এই যুক্তি দেখিয়ে দেরিতে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই আইনি অসঙ্গতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের আইনে কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রথমেই যা করার কথা, তা হলো ময়নাতদন্ত। ছমেছ উদ্দিনের মরদেহে কোনো ময়নাতদন্ত হয়নি। পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও কোনো জিডি হয়নি, মৃত্যু রেকর্ড হয়নি। এমনকি হাসপাতালের সনদেও লেখা নেই যে মৃত্যুটি ‘হত্যা’ ছিল। অথচ হাজিরহাট থানার ওসি নিজেই মামলাটি রেকর্ড করেছেন এবং একইসঙ্গে নিজেই তদন্ত কর্মকর্তা হয়েছেন—যা পুলিশের আচরণবিধি এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী অনৈতিক ও অবৈধ।
আরও বিস্ময়কর হলো, মামলার আসামি করা হয়েছে এমন সব ব্যক্তিকে যাদের কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না। একদিকে রয়েছে রয়েছে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতারা এবং অন্যদিকে স্থানীয় একজন বিএনপি নেতাও। বোঝা যায়, এই মামলা কেবল ছমেছ উদ্দিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের হয়নি বরং এটি একটি প্রতীকী মামলা, যার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে এবং হয়তো কিছু ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যও চরিতার্থ হচ্ছে।
এই মামলার সঙ্গে সঙ্গে ছমেছ উদ্দিনের পরিবার যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। জানা যায়, তাকে শহীদ ঘোষণা করার পর তার পরিবার পেয়েছে পাঁচ লাখ টাকা জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে এবং প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরও দশ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট। তার ছেলের চাকরির জন্য স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আবেদন করা হয়েছে। তার নামে রাস্তা এবং শহীদ ফলক করার সুপারিশও প্রশাসন থেকে এসেছে। এইসব সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া কতোটা স্বচ্ছ, কারা এগুলো অনুমোদন দেয় এবং কে কীভাবে প্রভাব খাটায়—সেটি পরিষ্কার নয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, স্থানীয় জনগণের বিবরণ বলছে, মামলায় এমন অনেকের নাম রয়েছে যারা সেদিন ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কেউ ঢাকায় ছিলেন, কেউ পরিবারসহ গ্রামের বাড়িতে। তবুও মামলা রেকর্ড হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষ, এমনকি বিএনপি নেতা এবং জামায়াত-শিবির সমর্থিত পরিবারের সদস্যদের নামও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে এটা বোঝা যাচ্ছে, শহীদ বানানোর পাশাপাশি এই মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মাহমুদুল হকের গ্রেপ্তার এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে কারাগারে পাঠানো মানে কেবল ব্যক্তি দমন নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থা, বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং মুক্তচিন্তার ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাত। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে যখন শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামে, তখন প্রশাসনের কোনো সদিচ্ছা দেখা যায় না। বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নীরব থাকে, যা রাষ্ট্রীয় চাপ ও ভয় দেখানোর সংস্কৃতিকে উসকে দেয়।
এই ঘটনায় বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আদালতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই ৩০২ ধারায় মামলা গ্রহণ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং জামিন নামঞ্জুর করায় এক ধরনের পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত কোনো হত্যার ঘটনায় যদি সরাসরি প্রমাণ না থাকে, তাহলে আদালত নিজেই মামলাটি খারিজ করতে পারেন। কিন্তু এখানে তা হয়নি। এতে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এভাবে একটি সাধারণ মানুষের মৃত্যুকে রাষ্ট্রীয় শহীদ বানিয়ে পুরো অঞ্চলজুড়ে ‘মৃত্যু ব্যবস্থাপনার’ একটা কৌশল তৈরি হয়েছে। এটি কেবল ছমেছ উদ্দিনের মৃত্যু নয়, বরং একধরনের নতুন ‘নাটক’, যেখানে মৃতদেহ ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক লাভ ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সত্য, ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষ।
এই ঘটনার গভীরে গেলে দেখা যাবে, এটা আর বিচ্ছিন্ন কোনো মামলা নয়—এটি একটি প্রবণতা। আগেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বা সরকারের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে কিছু মৃত্যুকে ‘শহীদ’ বানিয়ে সেটিকে পুঁজি করেছে। কিন্তু এখানে সেটা আরও গভীর ও বিপজ্জনক, কারণ এক্ষেত্রে পরিবার, প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী সবাই বলছে—এটি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল। শুধু প্রশাসন বলছে—এটি হত্যা।
একটি রাষ্ট্র যখন সত্যকে মিথ্যায় ঢেকে দেয়, ময়নাতদন্তকে উপেক্ষা করে, পরিবারের ইচ্ছাকে পালটে দেয়, আদালতের নিরপেক্ষতাকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক মামলা সাজায়—তখন সেটা কেবল দুর্নীতিই নয়, বরং একটি বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। এই প্রবণতা চ্যালেঞ্জ না করলে রাষ্ট্র তার সত্যিকারের শহীদদেরও অপমান করে। কারণ শহীদ মানে আত্মত্যাগ, কিন্তু এখানে বহুকাল ধরে শহীদ মানে কেবলই দান-অনুদানে পরিণত করা হয়েছে। শহীদ মানে গৌরব, কিন্তু এখানে শহীদ মানে রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত প্রয়োজন এবং তা কোনো পুলিশ নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশনের মাধ্যমে হওয়া উচিত। ছমেছ উদ্দিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ময়নাতদন্ত না হওয়ার পেছনের কারণ, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, মামলার বাদীর বক্তব্য এবং মামলায় যেসব ব্যক্তি আসামি হয়েছেন—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে শহীদ তালিকা কাদের পরামর্শে, কী প্রক্রিয়ায়, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে—সেটিও যাচাই করতে হবে।
এই প্রতিবেদন শুধু ছমেছ উদ্দিন নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং একটি রাজনৈতিক কাঠামো মিলে কীভাবে একটি মৃত্যু থেকে ফায়দা তোলে—সেটি প্রকাশ পেয়েছে। হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুকে শহীদী মর্যাদা দিয়ে কল্পকাহিনি বানানো যতদিন চলবে, ততদিন দেশের বিচার, গণতন্ত্র এবং ন্যায়বোধ নিঃশেষ হতে থাকবে।