Published : 02 Oct 2025, 01:41 PM
সীমান্ত শুধু কাঁটাতারের বেড়া নয়; এটি প্রতিবেশী দেশের প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থার প্রতীকও বটে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সেই আস্থার রীতি ভেঙে দিয়েছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও মানবিকতার ন্যূনতম মানদণ্ড উপেক্ষা করে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে বাংলাদেশ সীমান্তের এপারে। এটি এক রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের শত্রু শত্রু খেলা নয়, বরং শত্রুতার আড়ালে দুর্বল মানুষের জীবনকে নির্মমভাবে ব্যবহার করার এক কৌশল। ইতিহাসের পুরোনো বিভাজনের দাগগুলো নতুন করে রক্তাক্ত হচ্ছে ভারতের এই ‘পুশ-ইন’ নীতির কারণে।
‘পুশ-ইন’ বলতে বোঝায়—যে প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন চুক্তি বা আইনি যাচাই ছাড়া জোর করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষ ঠেলে পাঠানো হয়। নানা দেশে অভিবাসন ও সীমান্ত রাজনীতির জটিলতায় এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মেক্সিকো সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই এমনটা করে থাকে বলে খবর পাওয়া যায়। ভারত করছে বাংলাদেশ সীমান্তে, যাচাই-বাছাই ছাড়া রীতিমতন ভারতীয় নাগরিককেও ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে, বাংলা ভাষাভাষি এবং মুসলিম হওয়ার কারণে।
দক্ষিণ এশিয়ার অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত, যা প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত সীমান্ত হিসেবে পরিচিত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিতর্ক ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গতবছর অগাস্টে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এই কার্যক্রম বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করেছে। এতে বহু মানুষ—প্রধানত বাংলাভাষি মুসলিম বলে—যথাযথ প্রক্রিয়া বা কূটনৈতিক সমন্বয় ছাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে।
৫ অগাস্টে বিগত সকারের পতন এবং ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সঙ্গে পুশ-ইন বেড়ে যাওয়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে। সেই থেকে প্রায় ১,৫০০ মানুষকে ভারত সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য করেছে বলে জানা যায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক সংকেতও বহন করছে। ঢাকার কূটনৈতিক মহলে এ নীতি ইচ্ছাকৃত চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সাম্রাজ্যবাদী চর্চাকে ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি’ হিসেবে উপস্থাপনের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে। এতে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অবজ্ঞার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি বোঝার জন্য কেবল কূটনৈতিক হিসাব নয়; নিরাপত্তার নামে মানুষের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ কেমন হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা জরুরি।
কোপেনহেগেন স্কুলের সিকিউরিটাইজেশন থিওরি অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতারা অনেক সময় সাধারণ সমস্যা—যেমন অভিবাসন বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বড় হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং সেই যুক্তিতে নিয়মিত নীতির বাইরে কঠোর পদক্ষেপ নেন। বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ আলোচনায় এ ধারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় রাজনৈতিক বক্তব্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের উপস্থিতিকে প্রায়ই জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে সীমান্তে আইন ও মানবাধিকারের সীমারেখা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব একে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে সমর্থন করেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে ‘চোরাচালান রোধে’ পুশব্যাক নীতি কার্যকরী হতে পারে, যা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করছে। একই সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকদের প্রায়ই ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে সন্দেহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকেও বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভাষাগত পরিচয়কে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। এভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ—বিশেষত নির্বাচনি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে—সীমান্ত নীতি ও নিরাপত্তা বয়ানকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
পেহেলগামে সশস্ত্র হামলার পর আটক অভিযান জোরদার হয় এবং এই প্রেক্ষাপটে বিতাড়নের যৌক্তিকতা আরও জোরালোভাবে সামনে আনা হয়। অভিবাসনকে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে নয়াদিল্লি কার্যত মানবিক ও আইনি আপত্তিকে উপেক্ষা করছে। এর ফলে ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রম এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যা অনেক মানবাধিকার সংস্থার মতে বিচারবহির্ভূত গণবন্দি বা গণনির্বাসনের সমতুল্য, তবে ভারত এটিকে জনসংখ্যা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

এই বিষয়টি নিরাপত্তার নামে সামনে আনা সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ট্রানজিট সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাক্কা। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে এ পদক্ষেপকে ‘শত্রুতাপূর্ণ নীতি’-তে সামগ্রিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ কৌশলকেও নয়াদিল্লির চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপির বক্তব্যে, ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রম তাদের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা ও নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় বলে উপস্থাপিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই কৌশলকে প্রায়ই ‘জনসংখ্যা অনুযায়ী বিভাজন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা জাতীয়তাবাদী ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করার অভিযোগও এসেছে। সম্প্রতি দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকেও বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে সীমান্ত-সংক্রান্ত নীতি ও ভাষাগত বিষয়গুলো আসন্ন রাজ্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি কিছু ক্ষেত্রে দারিদ্র্য সীমিত জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে এবং এর মাধ্যমে সীমান্ত সংক্রান্ত রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকার পক্ষের বক্তব্য মূলত ভারতের আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘনকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ বারবার কূটনৈতিক চ্যানেল ও পতাকা মিটিং-এর মাধ্যমে এই কার্যক্রমের প্রতিবাদ জানিয়েছে। সরকারের যুক্তি, এই ‘একতরফা পুশ-ইন’ প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতার চেতনা ক্ষুণ্ণ করছে এবং বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের ‘সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্বেগের ডাম্পিং গ্রাউন্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) দ্বারা সংগৃহীত বিস্তারিত দলিল ও সাক্ষ্য সত্ত্বেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই কর্মকাণ্ড অস্বীকার করছে, যা কূটনৈতিক উদারতার প্রতি প্রশ্ন তোলে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার পরীক্ষা, যার জন্য একজোট ও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জরুরি।
এই নিরাপত্তার নামে চালানো রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে ভুক্তভোগী হলো অসহায় মানুষেরা, যাদের সীমান্ত পার করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকের অবস্থাই অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ, যা তাদের সুরক্ষা পাওয়াকে আরও জটিল করে তোলে। তারা সাধারণভাবে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃত নয়, আবার আনুষ্ঠানিক শরণার্থী হিসেবে যে সুরক্ষা পাওয়া উচিত তা পান না। এখানে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—তারা কি সত্যিই অভিবাসী নাকি শরণার্থী?
চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বেশিরভাগ ভুক্তভোগী আসলে ভারতীয় নাগরিক। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা গেছে, আটক ও বিতাড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলিম, যারা বৈধ পরিচয়পত্র—যেমন আধার কার্ড বা ভোটার আইডি—ধারণ করতেন; এই পরিচয়পত্র প্রায়ই বিতাড়নের আগে জব্দ করা হয়েছে। একজন আটক ব্যক্তির অভিযোগ, তিনি তার ভারতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলেন, কিন্তু বলা হয়েছিল ‘ভেরিফিকেশন প্রয়োজন’, যার ফলে তাকে আটক করা হয় এবং তার জিনিসপত্র জব্দ করে বাধ্যতামূলকভাবে সীমান্তে প্রেরণ করা হয়। এই মানুষগুলো তাদের নিজের দেশে স্থানচ্যুত হচ্ছে এবং ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ জনসংখ্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে—যাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে জাতিগত ও ভাষাগত ভিত্তিতে।
এর পাশাপাশি, এই ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রমে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে দুর্বল শরণার্থীরাও। ভারতের সঙ্গে ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর রিফিউজিজ (ইউএনএইচসিআর)-এর কাছে নিবন্ধিত অন্তত পাঁচ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। জানা গেছে, এই ব্যক্তিরা—যারা ইউএনএইচসিআরের সংরক্ষণের অধীনে ছিলেন—চোখে কাপড় বাঁধা অবস্থায় গুজরাটের মতো রাজ্য থেকে বিমানযোগে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং সীমান্তের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল; তাদের মধ্যে কিছু অসুস্থ ও আহত ছিলেন।
এই পরিসংখ্যানের বাইরে আরও হৃদয়বিদারক এক উদাহরণ হলো ৬৫ বছরের সকিনা বেগমের কাহিনি। ভারতের আসামের এই বৃদ্ধা পুলিশি গ্রেপ্তারের পর নিখোঁজ হন, আর কয়েক মাস পর হঠাৎ তাকে পাওয়া যায় ঢাকার মিরপুরের এক বস্তিতে। অচেনা ভাষা, অচেনা পরিবেশে তিনি অসহায়ভাবে কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিবার খুঁজছিলেন। পরে বিবিসির অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে তাকে বাংলাদেশে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ চার মাস পর বিবিসির উদ্যোগে ভিডিও কলে নিজের সন্তানদের দেখতে পেয়ে সকিনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন, কিন্তু এখনও তিনি পরিবারের কাছে ফিরতে পারেননি।
চমকপ্রদ বিষয় হলো—যার উচ্চারণ, ভাষা ও গ্রাম-ঠিকানায় স্পষ্ট বোঝা যায় তিনি আসামের মানুষ, তাকেই আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল বিদেশি ঘোষণা করেছে এবং সেই রায় বহাল রেখেছে গৌহাটি হাইকোর্টও। এরপর তাকে হঠাৎ করে নিখোঁজ দেখানো হয়, আর কয়েক মাস পর দেখা যায় তিনি বাংলাদেশে আশ্রয়হীন অবস্থায় পড়ে আছেন। এটি কি নিছক কাকতাল, নাকি ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে আদালত ও প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে?
নিজের নাগরিকদের পাশাপাশি নিবন্ধিত শরণার্থীদের বিতাড়ন করে ভারত সচেতনভাবে তার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার উপেক্ষা করছে, যার মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংবিধান (আইসিসিপিআর) এর চেতনা।
এতে ভুক্তভোগীদের অসহায় অবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা বলেছেন তাদের ওপর অমানবিক আচরণ করা হয়েছে—যেমন খাবার বা পানির ব্যবস্থা ছাড়া আটক রাখা, শারীরিক নির্যাতন এবং মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়া। এক হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যে একজন নারী এবং তার তিন কন্যা, যারা সাঁতার কাটতে পারত না, অভিযোগ করেছেন যে তাদের খালি প্লাস্টিকের বোতলের সঙ্গে বাঁধা হয়েছিল যাতে তারা ভাসতে পারে, এরপর অন্ধকার রাতে ফেনী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই পরিবারের, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি প্রদর্শিত এই আচরণ নির্দেশ করে যে প্রক্রিয়াটি আইনগত নয়, বরং রাজনৈতিক কুপ্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত।
ভারতের একতরফা ‘পুশ-ইন’ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং এই কর্মকাণ্ড অস্বীকার করা মূলত সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক প্রটোকলের মৌলিক ব্যর্থতাকে প্রকাশ করছে। এই কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে ভারতের নিরাপত্তা নীতি ‘সহযোগিতামূলক ও নরম নীতি’ থেকে বাধ্যতামূলক প্রভাব প্রয়োগের দিকে সরে এসেছে। ঢাকায় ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, যখন ঢাকাকে ‘অপ্রীতিকর শাসনব্যবস্থার অধীনে’ কাজ করছে বলে মনে করা হয়, তখন এই ধরনের পুশ-ইন কার্যক্রম প্রায়ই এক ধরনের প্রচলিত কার্যপ্রণালী হিসেবে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি বড়। নতুন সরকার যদিও নয়াদিল্লিকে অবহিত করেছে এবং লিখিত প্রতিবাদ করেছে, তবে লিখিত প্রতিবাদের পাশাপাশি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। ঢাকাকে অবশ্যই বিজিবির নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে যারা দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রবেশের অনুমতি পায়নি তারা সীমান্তে প্রবেশ না করতে পারে এবং প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত নথিভুক্ত করে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। ভারতের প্রত্যাশিত উদারতার অভাবে বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের—যার মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মগুলো—এই নিন্দনীয় কার্যকলাপের প্রতিকার ও জবাবদিহি দাবি করা গুরুত্বপূর্ণ।
‘পুশ-ইন’ সংকট মূলত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক খেলায় দুর্বল মানুষদের ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের সম্ভাব্য লঙ্ঘন করে ভারত যে নিজেকে বৈশ্বিক নেতা বা ‘বিশ্বগুরু’ দাবিতে উপস্থাপন করছে, তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য এ পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে।
বিস্ময়কর হলো, যদি ভারত শুধুমাত্র সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্বেগ দিয়ে প্ররোচিত একটি রাজনৈতিক এজেন্ডাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এটি ১৯৪৭ সালের বিভাজনের প্রেক্ষাপটকে পুনঃউদ্বোধন করতে পারে—যেখানে মুসলিমদের জন্য আলাদা মাতৃভূমির প্রয়োজন হয়েছিল সংগঠিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে। নিজের দারিদ্র্য সীমিত নাগরিকদের প্রভাবিত করা এবং প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানের অমানবিক উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যদি ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তবে তাদের এই বিঘ্নসৃষ্টিকারী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। বন্ধুত্ব ভয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; এটি অবশ্যই পারস্পরিক সম্মান এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত। এই নীতি চালিয়ে যাওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে এবং ইতোমধ্যেই উদ্বেগপূর্ণ অঞ্চলে আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
'পুশ ইন' ঠেকাতে কী করবে বাংলাদেশ?