Published : 16 Feb 2026, 05:09 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ, পরিবর্তনের অদম্য শক্তি জেন-জি ও উদার সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শের বিজয় হয়েছে। এ জয় বিএনপি যথার্থভাবেই জনগণকে উৎসর্গ করেছে। এছাড়া, এ জয় বিএনপি যতটা না অর্জন করেছে, জনগণ তারচেয়ে বেশি তা সম্ভব করেছে। আওয়ামী সরকারের পতনের পর স্পষ্ট হয়েছে জনগণই ইতিহাস সৃষ্টি করে, আর ইতিহাস নেতা তৈরি করে। ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছায় চলে না, জনআকাঙ্ক্ষার স্রোতে ভেসে এসে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। আমরা প্রায়ই ভুল করে ভাবি নেতা ইতিহাস গড়েন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাসই তার প্রয়োজনে নেতাকে খুঁজে নেয়। কোনো ব্যক্তির মধ্যে যদি নেতৃত্বের গুণ থাকে, তাহলে ইতিহাসের কাজটা সহজ হয় মাত্র।
শেখ হাসিনা ও তার চাটুকারদের ধারণা ছিল, দেশ পরিচালনায় তার কোনো বিকল্প নেই। তাই জোর করে, শত কসরৎ করে হলেও বছরের পর বছর তাকে চেয়ারে বসে থাকতেই হবে। কিন্তু শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা চব্বিশে তাকে ছুঁড়ে ফেলে প্রমাণ করল, তার চেয়েও অনেকগুণ ভালো বিকল্প তারা নিজেরাই। কিন্তু অনভিজ্ঞতা তাদেরকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছে। কেউ কেউ অর্থ ও ক্ষমতার লোভে পড়ে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন। অনেকে কতিপয় বিদেশির ভিউ বাণিজ্যের উসকানিতে পড়ে বৈষম্যবিরোধী মনোভাব ত্যাগ করে সুবিধাবাদের আশ্রয় নিয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় একটি বড় অংশ চলে গেলেন এমন এক রাজনৈতিক শক্তির কোলে যাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা লজ্জাজনক। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অনেক তরুণ-তরুণী হতাশ হয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে দূরে সরে গেছেন তাই। কয়েকজন ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে মব সৃষ্টি করলেন। আর এই মব দিয়ে যা করতে থাকলেন তা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই সময় শান্তিপ্রিয় জনগণ এমন একজন নেতাকে খুঁজছিল যিনি দেশকে মবের মুল্লুক হওয়া থেকে রক্ষা করবেন। তারা তা পেয়েও গেলেন।
২৫ ডিসেম্বর যিনি দেশে ফিরলেন, তিনি শুধু ব্যক্তি তারেক রহমান নন, তিনি জনগণের কাঙ্ক্ষিত ওই নেতা। চারদিকে সংঘর্ষ, সন্দেহ, বিশ্বাসঘাতকতা, উগ্রতা আর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো মবের মুল্লুকে সাধারণ মানুষ চাইছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সকাল-বিকাল বীরত্ব দেখাবেন না, গলার রগ ফুলিয়ে বক্তৃতাবাজি করবেন না; বরং থাকবে শৈল্পিক নেতৃত্বের ধীরতা। তিনি দেখাবেন শান্ত, সৌম্য, চিন্তাশীল মনোভাব, দূরদর্শিতা, কোমল অথচ দৃঢ় বুদ্ধিমত্তা, বিনয়, গণমানুষের প্রতি সম্মান ও সহজ-সরল আচরণ। দেশে ফিরে তারেক রহমান কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেননি, কাউকে বাদ দিতে চাননি; বরং সব ধর্ম, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মানুষকে নিয়ে একটা অস্থির দেশকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি কাউকে কিছু শেখাতে চাননি, বরং শিখতে চেয়েছেন। আর এই স্বরূপ থেকে এখন পর্যন্ত একবারের জন্যও বিচ্যুত হননি। তাই সেদিনই বাংলার মানুষের মনে তিনি অঘোষিত প্রধানমন্ত্রীর স্থান দখল করে নিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল ওই আকাঙ্ক্ষার আনুষ্ঠানিক রূপায়ণ।
আর এখানেই তারেক রহমানের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ও বিপদ। জনগণের ওই ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা ও আস্থা পূরণ করার চ্যালেঞ্জ। জনগণ তাকে মুকুটহীন প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে আগেই, তাই তার প্রতি দাবিও হবে বিশাল। মহৎ নেতা হয়ে ওঠার পরীক্ষা এখনো বাকি তার, যা শুরু হতে যাচ্ছে ক্ষমতায় বসার পরদিন থেকে। আর দিন যত যাবে, পরীক্ষা ততই কঠিন থেকে কঠিনতর হবে। চ্যালেঞ্জ আসবে দলের ভেতর ও বাহির উভয় দিক থেকেই।
নির্বাচনের ফল নিয়ে মানুষের মনে ছিল ভয়মিশ্রিত টানটান উত্তেজনা। অতীতের যে কোনো নির্বাচনের থেকে এবারের নির্বাচন ছিল দেশ কোন দিকে যাবে তা নির্ধারণের প্রশ্নকে ঘিরে। ব্যক্তি তারেক বা বিএনপির ক্ষমতায় আরোহণের চেয়েও যা ছিল বড় বিষয়। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার হিটলারি চেষ্টা কিছু উগ্র বিপথগামী ছাড়া সর্বস্তরের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের শিল্পচর্চার স্বাধীনতায় আঘাত করা হয়েছে। উদারনৈতিক চিন্তা ও চর্চাকে অপমান করা হয়েছে।
মানুষের সহজ-সরল ধর্মচর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফায়দা লোটার চেষ্টা চলেছে। জাতীয় সংগীত, বাউল গান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করে হানাহানির পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। আর এ সুযোগে জরুরি বিষয়গুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানচর্চার স্থান নয়, কূপমণ্ডূকতার কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা চলছিল। তাই এ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছে টাকার লোভে নয়, প্রাণের টানে। এবার ভোটারদের পয়সা দিয়ে কেনা যায়নি। প্রগতিবিরোধী অন্ধ ও উগ্র শক্তিকে বাংলাদেশের খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ অদম্য আবেগ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে।
কিন্তু এই ফলাফল নিয়ে আত্মতৃপ্তির সুযোগ খুব কম। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা উগ্র শক্তি এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন লাভ করেছে যা তাদেরকে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার জন্য আশান্বিত করছে। তাদের এ অর্জন হয়তো শেষ পর্যন্ত ভালোই হবে, যদি তা অন্যদের আত্ম-অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন উদার গণতান্ত্রিক শক্তিকে এখন থেকেই নিজেদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। সমস্যা হলো ক্ষমতায় আরোহণের পর হুঁশ হারিয়ে ফেলা। তখন শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে শত্রুকে দমন-পীড়ন করে ধ্বংস করার দম্ভ থাকে, যার ফল হিতে বিপরীত হয়। রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করে কেবল অর্থবিত্ত অর্জনের পেছনে ছুটলে আর ভালো কিছু করার সময়ই বা কোথায়!
ক্ষমতার মাদকতা সকল মাদকের চেয়ে সহস্র গুণ বেশি। অথচ ক্ষমতায় বসার পর সবচেয়ে বেশি দরকার হয় ক্ষমতাহীনের প্রতি বিনয় ও উদারতা। তখনই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন লোভহীনতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সততার অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক, যার অভাবে আওয়ামী লীগের এ দুর্দশা ও পতন। এ বিপদ বিজয়ী বিএনপির জন্যও রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসন লাভ করে এক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের পাতায় এই ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ সংখ্যাটি যতটা না শক্তির প্রতীক, তার চেয়ে বেশি এক অলক্ষুণে ‘রাজনৈতিক মরণফাঁদ’ হিসেবেই বারবার আবির্ভূত হয়েছে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতার এই অতি-কেন্দ্রীভূত রূপটি শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হিসেবেই প্রমাণিত হয়। সুতরাং, বর্তমানের এই বিশাল বিজয় যেমন আনন্দের, তেমনি তা একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা—কারণ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সবসময়ই নিষ্ঠুর হয়।
যারা এবার পরাজিত হয়েছে, তারা বিএনপির ঠিক এই দুর্বলতার ওপরই ভরসা করছে। তারা ভাবছে নিরঙ্কুশ বিজয়ীরা হয়তো ভুলে যাবে জনগণের কাছে তাদের অঙ্গীকারের কথা, কেবল শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে, ডুবে যাবে রাষ্ট্রক্ষমতার অনৈতিক ব্যবহারে। তারেক মহৎ নেতা হবেন তখনই, যখন পরাজিত শক্তির ওই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না, অর্থাৎ ক্ষমতা বিএনপি বা তার নেতাদের অন্ধ করবে না। ধর্ম-বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ভাষা, জাতি, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সর্বস্তরের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে আস্থা রেখেছে তারেক রহমান ও তার দলের ওপর—ওই আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ জিততে হবে। না পারলে শুধু তারেক বা বিএনপি হারবে না, হারবে আগামীর বাংলাদেশও।
নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই বিরোধীদের হাতের অস্ত্র অকেজো করতে হবে। দম্ভ দিয়ে নয়, শত্রুকে পেটানো দিয়ে নয়, ভয় দেখিয়ে নয়; বরং কোমলতা দিয়ে উগ্রতাকে, নৈতিকতা দিয়ে অনৈতিকতাকে, কাজ দিয়ে বাগাড়ম্বরকে, গণতান্ত্রিক আচরণ দিয়ে উগ্রতাকে এবং দেশপ্রেম দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের পরাজিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চর্চাকেও অস্ত্র-সন্ত্রাস দিয়ে নয়—জেন-জি-র যুক্তিবাদ ও গণমুখী উন্নয়ন দিয়েই পরাজিত করতে হবে। তবেই দেশ, জেন-জি ও উদারতার এ জয় সার্থক ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।