Published : 19 May 2026, 10:11 AM
এক সময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অথচ সবচেয়ে ভরসার নাম। কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, পুলিশ ব্যর্থ হলে, শেষ ভরসা হিসেবে ডাকা হতো র্যাবকে। কালো ইউনিফর্ম, হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র, চোখে কালো সানগ্লাস, মাথায় কালো ক্যাপ—কালো গাড়ি থেকে রাগী মুখে তাদের নামতে দেখলেই চারপাশে এক ধরনের নীরব আতঙ্ক নেমে আসত। নামকরা সন্ত্রাসীরাও র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে গা-ঢাকা দিত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাবমূর্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, মুক্তিপণ আদায় এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ধীরে ধীরে এমন এক ধারণা তৈরি হয় যে, র্যাব মানেই ক্রসফায়ার, র্যাব মানেই গুম-খুনের আতঙ্ক। অনেকের চোখে বাহিনীটি রাষ্ট্রের এক ধরনের ‘জল্লাদ বাহিনী’তে পরিণত হয়।
ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর দীর্ঘদিন র্যাব অনেকটা আড়ালেই ছিল।
তবে সম্প্রতি র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার নতুন আইনের আওতায় একটি নতুন ‘এলিট ফোর্স’ গঠনের চিন্তা করছে। সেটি র্যাব নামেই থাকবে, নাকি সম্পূর্ণ নতুন নামে আসবে—সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
মন্ত্রী আরও বলেছেন, কয়েকজন কর্মকর্তার দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তবে অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে র্যাব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলেই যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নতুন নামে বা নতুন কাঠামোয় বাহিনী গঠন করা গেলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলেও তিনি আশাবাদী।
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার জঙ্গিবাদ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে র্যাব গঠন করেছিল। কিন্তু পরে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও সেই ধারাবাহিকতা থামেনি। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার র্যাব বিলুপ্তির দাবি তুললেও সরকার তাতে গুরুত্ব দেয়নি। ২০২১ সালের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর র্যাবের ‘ক্রসফায়ার’ অনেকটাই কমে আসে। এরপর ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী নতুন নামও ঘোষণা করেন—‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ বা এসআইএফ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয়, যেন র্যাবের সবচেয়ে বড় সমস্যা মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং এর নাম! নাম বদলে ফেললেই যেন সব বিতর্ক ধুয়ে-মুছে যাবে। মাথাব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়, তেমনি একটি বাহিনীর নাম বদলানোও প্রকৃত সংস্কার হতে পারে না।
তবে এখানে পুরো মাথা কাটা হচ্ছে না। বরং এক মাথা খুলে আরেক মাথা বসানোর আয়োজন চলছে। এ প্রসঙ্গে পৌরাণিক কাহিনির গণেশের কথা মনে পড়ে। শিব ও পার্বতীর পুত্র ছিলেন গণেশ। কথিত আছে, দেবী পার্বতী নিজের হাতে হলুদের গুঁড়া দিয়ে এক শিশুর মূর্তি তৈরি করেন এবং দৈবশক্তিতে তাতে প্রাণ সঞ্চার করেন। সেই শিশুই ছিল গণেশ। একদিন পার্বতী স্নান করতে যাওয়ার আগে গণেশকে বলেছিলেন, তিনি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত যেন কাউকে ঘরে ঢুকতে না দেওয়া হয়। ঠিক সেই সময় শিব সেখানে আসেন। কিন্তু গণেশ তাকে চিনতেন না। তাই তিনি শিবকে ঘরে ঢুকতে বাধা দেন। এতে শিব প্রচণ্ড রেগে গিয়ে গণেশের মাথা কেটে ফেলেন। পরে পার্বতীর কান্না ও অনুরোধে শিব অনুতপ্ত হন। তখন সিদ্ধান্ত হয়, জঙ্গলে যে প্রাণীকে সবার আগে দেখা যাবে, তার মাথা এনে গণেশের দেহে বসানো হবে। পরে একটি হাতির মাথা এনে গণেশের দেহে বসানো হয়। সেই থেকেই গণেশ হাতির মাথাওয়ালা দেবতা হিসেবে পরিচিত।
পৌরাণিক গল্পে এসব অলৌকিক ঘটনা মানিয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব জীবন তো আর পৌরাণিক কাহিনি নয়। এখানে শুধু মাথা বদলালেই চরিত্র বদলায় না। পোশাক বা নাম বদলালেও বাহিনী বদলাবে না—এই কঠিন সত্যটি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো বুঝতে পারেনি। তাই তারা এখনো বিশ্বাস করে, পুলিশের পোশাক পাল্টালে পুলিশ বদলে যাবে, র্যাব শব্দটার জায়গায় এসআইএফ বসালেই আমেরিকা খুশিতে গদগদ হয়ে বলবে, ‘আমরাতো এমনটা জিনিসই চেয়েছিলাম!’
বাংলাদেশ এখন এক অদ্ভূদ শাসননীতি চালু করা হয়েছে। এখানে সমস্যার সমাধান হয় না, সমস্যার নাম বদলায়। রোগ সারানো হয় না, প্রেসক্রিপশনের ফন্ট পাল্টানো হয়। যেন পুরো রাষ্ট্রটা একটা বিউটি পার্লার—ভেতরে যাই থাকুক, বাইরে একটু মেকআপ হলেই সব ঠিক! এই যে বাহ্যিক রূপচর্চা দিয়ে ভেতরের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা, এটি আসলে আমাদের শাসনব্যবস্থার এক মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনো একটি বিভাগ বা বাহিনী যখন জনমনে চরম বিতর্কের জন্ম দেয়, যখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকে, তখন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে সংস্কারের কোনো খসড়া তৈরি হয় না। বরং সেখানে লোগো ডিজাইনার আর নাম প্রদানকারীদের মেলা বসে। তারা রাত জেগে এমন সব গালভরা ইংরেজি নাম খোঁজেন, যা শুনলে মনে হবে দেশ এক রাতেই ইউরোপ হয়ে গেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, ক্ষমতার অপব্যবহার আর সাধারণ মানুষের আর্তনাদ ঠিক আগের মতোই অপরিবর্তিত থেকে যায়।
তাই এখন শোনা যাচ্ছে, র্যাব থাকবে, তবে হয়তো অন্য নামে। মানে, বাঘের নাম বদলালে সে নিরামিষভোজীতে পরিণত হবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যারা বলছেন কয়েকজন কর্মকর্তার দোষে পুরো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা ঠিক নয়, তারাই আবার পুরো প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে ফেলতে চাইছেন। অর্থাৎ দোষ করেছে কয়েকজন, কিন্তু সাজা পাচ্ছে নামটা! বাহিনী থাকবে, সদস্যরা থাকবে, কাঠামো থাকবে, ক্ষমতা থাকবে, সংস্কৃতি থাকবে—শুধু নামটা আরেকটু ইংরেজি হবে।
যদি সত্যিই অপরাধ কেবল কয়েকজন ব্যক্তির হয়ে থাকে, তবে সেই ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই ছিল যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা পেত, জনমনে আস্থা ফিরত। কিন্তু তা না করে পুরো প্রতিষ্ঠানের নামটাই বদলে ফেলার এই যে তোড়জোড়, তা প্রমাণ করে যে গলদটা আসলে ব্যক্তিতে নয়, গলদটা গভীরে।
জাতিসংঘ বলেছে সংস্কার করুন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে জবাবদিহি নিশ্চিত করুন। আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু আমরা কী করছি? আমরা বসে নাম খুঁজছি। আজ র্যাবের নাম বদলাবে। কাল পুলিশের পোশাক বদলাবে। পরশু হয়তো থানার রং বদলাবে। কিন্তু নাগরিকের ভয় কাটবে তো? মাঝরাতে দরজায় ধাক্কার শব্দ শুনলে বুকে কাঁপুনি শুরু হবে না তো?
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমাদের রাষ্ট্র ক্রমশ এক বিশাল নাট্যমঞ্চে পরিণত হয়েছে। এখানে বাস্তবের চেয়ে প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ, কাজের চেয়ে ঘোষণার দাম বেশি, আর জবাবদিহির চেয়ে চমক বেশি জরুরি। এই নাট্যমঞ্চের অভিনেতারা প্রতিদিন নতুন নতুন স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হন। মানুষ যখন চালের বাজারে গিয়ে হিমশিম খায়, যখন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পায় না, অথবা যখন সামান্য একটু অধিকারের কথা বলতে গিয়ে মামলার মুখোমুখি হয়, তখন এই নাটকের চটকদার সংলাপগুলো কেবলই এক একটি নিষ্ঠুর তামাশা বলে মনে হয়।
এ কথা সবাই জানে যে, নাম বদলালেই নখ বদলায় না। মানুষ যখন বনের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, তখন সে বাঘের নেমপ্লেট দেখে সতর্ক হয় না, সতর্ক হয় বাঘের নখ আর দাঁত দেখে। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র যতক্ষণ না এই সহজ সত্যটি স্বীকার করবে, যতক্ষণ না তারা সাইনবোর্ড সংস্কৃতির বাইরে এসে সত্যিকারের কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারে হাত দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের রূপান্তর কেবলই একটি ব্যয়বহুল এবং ব্যর্থ তামাশা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।
পুনশ্চ: র্যাবের নাম বদলের তোড়জোড় দেখে কেন যে মনে পড়ছে একটা পুরোনো গল্প? দেখুন তো গল্পটা অপ্রাসঙ্গিক লাগছে কিনা?
এক মাতাল গেছে পুরোহিতের কাছে নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য! পুরোহিত মাতালকে এক বড় গামলায় তিনবার চুবিয়ে বললেন, আজ থেকে তুমি পরিপূর্ণ শুদ্ধ! তোমার নাম শাশ্বত! আর মদ খাবে না! মাতাল বাড়িতে ফিরে ফ্রিজ থেকে একটি চিল্ড বিয়ার বের করল! তাকে তিনবার জলে চোবাল। এরপর বলল, তুমি আর বিয়ার নও! আজ থেকে তুমি গ্রিন টি! অতঃপর ওই শুদ্ধ মাতাল, ততোধিক শুদ্ধ গ্রিন টি পান করতে লাগল।
আরও পড়ুন-
‘ক্রসফায়ার’ থেকে ‘গুম’: বিচারবহির্ভূত হত্যার ধারা কি চলতেই থাকবে?