Published : 24 Apr 2026, 08:22 PM
কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে এক র্যাব সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটল। এরপর ঢাকায় র্যাবের এক কর্মকর্তা বলছিলেন, “র্যাবকে নপুংসক করে রাখা হয়েছে, যার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।”
র্যাবের যে ‘পুরুষত্ব’ কেড়ে নেওয়ার কথা বলছেন ওই অফিসার, সোজা বাংলায় বললে তার নাম হচ্ছে ‘মানুষ হত্যার লাইসেন্স’ বা ‘ক্রসফায়ার’। পুলিশ থেকে র্যাবে আসা কর্মকর্তাটি যে ধারণা দিলেন, তার মর্মার্থ হচ্ছে—র্যাবের সেই জৌলুস আর নেই; চারদিকে নানা বিতর্ক, অফিসাররা এখানে থাকতে চান না। আর এই জৌলুসের মধ্যমণি হচ্ছে ‘ক্রসফায়ার’। এই অধিকারটি না থাকায় বাহিনীটিকে এখন আর সন্ত্রাসীরা আগের মতো ভয় পায় না বলেও আক্ষেপ করেন কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্রসফায়ারকে ‘হত্যা’ উল্লেখ করে একটি রিপোর্ট করার পর র্যাবের একজন অতি প্রভাবশালী কর্মকর্তা টেবিল চাপড়ে বলেছিলেন, ক্রসফায়ার করার জন্যই র্যাব বানানো হয়েছে। এরপর ইউরোপ-আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ আর ইকুইপমেন্টও এসেছে। কাজেই পত্রিকায় লিখে এটা থামানো যাবে না।
ঘটনা সত্য। ইনভার্টেড কমার মধ্যে ক্রসফায়ার শব্দটিকে রেখে আমরা সংবাদমাধ্যম কর্মীরা যে ‘গুরুদায়িত্বটি’ পালন করেছিলাম, তাতে ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। দেশি-বিদেশি নানা গোষ্ঠীর আলোচনা-সমালোচনাও কানে তোলেনি আওয়ামী লীগ। বরং র্যাব থেকে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও গুলি করে মানুষ হত্যার প্রবণতা বাড়তেই থাকে।
এরপর এলো ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল ক্রসফায়ার। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ‘ক্রসফায়ার’ চায়নি, তাই তা বন্ধ হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে আগে যে ‘ক্রসফায়ার’গুলো হয়েছে, তখনকার সরকারগুলো কি ক্রসফায়ার চেয়েছে? খাতা-কলমে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই, কোনো নেতা-মন্ত্রীও বিষয়টি স্বীকার করে বক্তব্য-বিবৃতি দেননি। কিন্তু কার্যকারণ সম্পর্ক বলে দেয়, আলবাত চেয়েছে। বিগত সরকারগুলো চেয়েছে বলেই তো ঘটনাগুলো ঘটেছে।
ক্রসফায়ার টু গুম
গত প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের পরিচিত শব্দ ক্রসফায়ারের উৎস খুঁজতে গেলে ফিরতে হবে বিগত বিএনপি আমলে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের (২০০১-২০০৬) আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার শর্টকাট হিসেবে শুরু হয়েছিল ‘ক্রসফায়ার’। গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন–র্যাব।
সেই আমলে ক্রসফায়ার এবং র্যাবের সমালোচনায় মুখর ছিল তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করার কথাও বলেছিল। তবে টানা ক্ষমতার সাড়ে ১৫ বছর এই নৃশংস ধারা অব্যাহত রাখে তারা। র্যাবসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে ‘গুম’-এর মতো ভয়ানক এক কৌশলের প্রয়োগ শুরু করে আওয়ামী লীগ। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নেওয়ার পর লাশ পাওয়া যায় অনেকের। এই হতাহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি ছিলেন আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের বিষয়টি আলোচনায় আসে। একে একে বেরোতে থাকে গোপন বন্দিশালাগুলোর ভয়ঙ্কর তথ্য। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচার ও গুমবিরোধী আইন করার উদ্যোগ নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত গুমের আইনটিকে পাস করেনি বিএনপি। এ নিয়ে এখনো চলছে আলোচনা, বাড়ছে সন্দেহ। তবে জনপ্রিয় আলোচনাটি হচ্ছে—বিএনপি তার পূর্বসূরি আওয়ামী লীগ সরকারের মতো গুমের অস্ত্রটাও নিজের হাতে রাখতে চায়।
র্যাব এলো ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিনে নতুন একটি বাহিনী হিসেবে ‘র্যাব’ গঠন করা হয়। তিন মাস পেরোতে না পেরোতেই কাজ দেখাতে শুরু করে র্যাব। ওই বছরের ২৬ জুন র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের পর প্রাণ হারান কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তের কর্মী দেবাশীষ দাস (৩০)। ঘটনাটি নিয়ে র্যাবের ভাষ্য—শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানকে গ্রেপ্তার করতে গেলে তার সহযোগীদের সঙ্গে গুলি বিনিময় হয়, এ সময় ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন দেবাশীষ। তবে পরিবারের বরাত দিয়ে ২৭ জুনের ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদের সময় র্যাব সদস্যরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।
এক দিন পরেই অর্থাৎ ২৭ জুন পিচ্চি হান্নানের সহযোগী সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া ইকবাল হোসেন ওরফে নিটল বাবু নিহত হন। র্যাবের ভাষ্য—পিচ্চি হান্নানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টার সময় গুলিবিনিময়ে আহত হন বাবু। তবে ইকবালের পরিবারেরও দেবাশীষের পরিবারের মতো নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ ছিল।
এরপর পরপর আরও দুটি একই রকম ঘটনা। ১৫ জুলাই র্যাবের হাতে নিহত হয় টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী সুমন মজুমদার। এই হত্যার বিচার দাবি করে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া র্যাবকে মানুষ খুন করার লাইসেন্স দিয়েছেন।” (দৈনিক সংবাদ, ২৩ জুলাই ২০০৪)
এরপর ৭ আগস্টের পত্রিকায় প্রথমবারের মতো ছাপানো হলো ক্রসফায়ারের সংবাদ বা গল্প। ভিকটিম—পিচ্চি হান্নান।
সিরাজ শিকদার থেকে পিচ্চি হান্নান

বাংলাদেশে সরকারের মর্জিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গুলি করে হত্যার প্রথম আলোচিত ঘটনাটি সম্ভবত সিরাজ শিকদারকে নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি সিরাজ শিকদার পুলিশের গুলিতে মারা যান মাত্র ৩০ বছর বয়সে। ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদার। ওই দিন রাতেই সাভার এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। সিরাজ নিহত হওয়ার পরদিন সংবাদপত্রে সরকারি প্রেসনোটের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, পুলিশের ভ্যান থেকে পলায়নকালে গুলিতে নিহত হন সিরাজ।
১৯৭৫ সালের ৩ জানুয়ারির ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা হয়: “গতকাল (বৃহস্পতিবার) শেষ রাত্রিতে প্রাপ্ত পুলিসের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান হয় যে, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত একটি গুপ্ত চরমপন্থী দলের প্রধান সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ শিকদারকে পুলিস ১লা জানুয়ারী চট্টগ্রামে গ্রেফতার করেন। একই দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁহাকে ঢাকা পাঠানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক এক বিবৃতি দেন এবং তাঁহার পার্টি কর্মীদের কয়েকটি গোপন আস্তানা এবং তাহাদের বেআইনী অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার স্থানে পুলিশকে লইয়া যাইতে রাজী হন। সেইভাবে, ২রা জানুয়ারী রাত্রে একটি পুলিস ভ্যানে করিয়া তাঁহাকে ঐসব আস্তানার দিকে পুলিস দল কর্তৃক লইয়া যাইবার সময় তিনি সাভারের কাছে ভ্যান হইতে লাফাইয়া পড়িয়া পলায়ন করিতে চেষ্টা করেন। তাহার পলায়ন রোধ করার জন্য পুলিস দল গুলীবর্ষণ করিলে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলেই তাঁহার মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে সাভারে একটি মামলা দায়ের করা হইয়াছে।”
সিরাজকে নিয়ে নানা গল্প আছে। সেই গল্পই যেন ফের ফিরে আসে ২০০৪ সালের পিচ্চি হান্নানের ‘ক্রসফায়ারে’র প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে। সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫ আগস্ট গ্রেপ্তারের পর হান্নানকে নিয়ে সাভার এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়েছিল র্যাব-১। সেখানে ক্রসফায়ারে তিনি নিহত হন।
সেই ‘র্যাব’ আর ‘অস্ত্র উদ্ধার অভিযান’ বাংলাদেশের সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কাছে এক আতঙ্ক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ‘ক্রসফায়ারে’র তাৎক্ষণিক একটা প্রভাব ছিল। অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা দ্রুত কমছিল।
২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় ছিল। সেই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠার আড়াই বছরেই র্যাবের হাতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৭ (অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত)।
তখন দেশের অপরাধীদের মধ্যে র্যাব আতঙ্ক তৈরি করতে পেরেছিল—পুরানো ক্রাইম রিপোর্টারদের কাছ থেকে এমন কথা শোনা গেছে অনেকবার। তবে বাহিনীটি আতঙ্ক ছড়িয়েছিল রাজনৈতিক মহলেও। ২০০৫ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় র্যাব। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে এই অভিযান চালানো হয়েছে বলে বাহিনীটির কর্মকর্তারা জানান। (প্রথম আলো, ২৯ জানুয়ারি ২০০৫)
আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার তদন্তভার র্যাবের হাতে ন্যস্ত হওয়ার খবরে উদ্বেগ জানায় তাঁর পরিবার। ধানমণ্ডির বাসভবন মালঞ্চে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে শাহ এ এম এস কিবরিয়ার স্ত্রী আসমা কিবরিয়া বলেন, “র্যাবের হাতে কিবরিয়া হত্যা মামলার দায়িত্বভার ন্যস্ত হওয়ার খবরে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আমাদের আশঙ্কা—কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ কাউকে ক্রসফায়ারে ফেলে মামলার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর অপচেষ্টা হতে পারে।” (যুগান্তর, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৫)
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শর্টকাট হিসেবে ‘ক্রসফায়ার’-এর সেই সিলসিলা ধরে রাখে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকার।
ক্রসফায়ার কিংবা র্যাবের সাফাই
সেই সময়ে বিএনপির নেতা-মন্ত্রীরা ক্রসফায়ার আর র্যাবের পক্ষেই সাফাই গেয়েছিলেন। সেটা যে কী ভুল সুর ছিল, তা পরের ১৫ বছরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল বিএনপি। আর সেই সময়ে ক্রসফায়ারের সমালোচনা করে আসছিল তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। বিষয়টিকে ‘খুনের লাইসেন্স’ তুলে দেওয়া বলেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দল নেত্রী শেখ হাসিনা।
২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের ওয়াদা করেছিল আওয়ামী লীগ। যদিও ক্ষমতায় এসে ক্রসফায়ারের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা-গ্রেপ্তারের নতুন নতুন কৌশল যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
ওই যে বললাম বিএনপি টের পেয়েছিল হাড়ে হাড়ে। তবে ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত দলটির নেতারা ক্রসফায়ার ও র্যাবের সাফাই গেয়েই গেছেন।
র্যাব নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা কিংবা সমালোচনা, তখন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা র্যাব সদস্যদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, “ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১৮-২০টি করে মামলা রয়েছে; ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া আল্লাহরই বিচারে হচ্ছে। র্যাব ভালো কাজ করছে, সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। ক্রসফায়ারে নিরীহ কেউ মারা গেলে অ্যাক্সিডেন্ট বলতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।” (দৈনিক সংবাদ, ২৭ অক্টোবর ২০০৪)
র্যাব নিয়ে সমালোচনার মুখে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জাতীয় সংসদে বলেন, “সন্ত্রাস দমনে র্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও কিছু বেসরকারি সংগঠন। র্যাব কোনো নিরীহ মানুষ হত্যা করেনি। র্যাব প্রয়োজনে আরও কঠোর হবে। বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাস থাকবে না।” (দৈনিক যুগান্তর, ৩ ডিসেম্বর ২০০৪)
হত্যা মামলার আসামিরা ক্রসফায়ারে মারা গেলে মানবাধিকারের প্রশ্ন কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর। তিনি বলেন, “যখন একজন সন্ত্রাসী ৮-১০ জন নিরপরাধ লোককে মেরে ফেলেছে তখন মানবাধিকারের প্রশ্ন ওঠেনি। একজন সন্ত্রাসী, যারা ১০-১২টি খুন করেছে, তারা র্যাবের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গেলে মানবাধিকারের প্রশ্ন কতটুকু যুক্তিসঙ্গত তা দেখতে হবে।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০০৫)
ক্রসফায়ারে কেবল সন্ত্রাসীরা মারা যাচ্ছে—এমন যুক্তি দিয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ বলেন, “ক্রসফায়ারে যারা মারা গেছে তারা সমাজের পরিচিত সন্ত্রাসী। আজ পর্যন্ত কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্রসফায়ারে নিহত হয়নি।” (দৈনিক যুগান্তর, ৩ মে ২০০৫)
র্যাব তৈরি করে মুখ পুড়িয়ে আসা বিএনপি কি এখন নতুন করে বিপদ মাথায় নিতে চাইবে? বর্তমানে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গুমের আইন নিয়ে বিএনপির অবস্থান

গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ যখন সুনির্দিষ্টভাবেই উঠছিল, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিভিন্ন সভা-সেমিনার বা সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন—তারা কেউ গুম হয়নি, এরা পলাতক। গুমের বিচার করা তো দূরের কথা, বিষয়টিকে রীতিমতো হাস্যকর যুক্তিতে উড়িয়ে দেওয়ার ভয়াবহ এক প্রবণতা ছিল আওয়ামী সরকারের নেতা-মন্ত্রীদের।
বিএনপির নেতা-মন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীলরা অবশ্য গুমের ভয়াবহতাকে স্বীকার করে নিয়ে এই আইনটিকে বাতিল করার মোটা দাগে দুটো যুক্তি দিচ্ছেন।
গত ৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, গুমের বিচারের জন্য পৃথক অধ্যাদেশ ‘অপ্রয়োজনীয়’ ছিল এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনেই এ অপরাধের বিচারের ‘পর্যাপ্ত এখতিয়ার’ রয়েছে। পৃথক ‘গুম অধ্যাদেশ’ বাতিল করে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) বিল’ পাস হওয়ার প্রেক্ষিতে এক প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
১২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গুম কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও আইসিটি আইন বিষয়ে বলেন, “আমি নিজে গুমের শিকার। আমরা চাই না তাড়াহুড়ো করে কোনো ত্রুটিপূর্ণ আইন পাস হোক, যাতে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। কিছু অসঙ্গতি দূর করে সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই আইনগুলোকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা হবে যাতে ভুক্তভোগীদের জন্য সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।”
এখন বিএনপি তার উত্তরসূরি আওয়ামী লীগের মতো গুমকে বিরোধী মত দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। সেই বিষয়টিও খণ্ডন করে কথা বলছেন বিএনপি নেতারা।
বিএনপি গুম অধ্যাদেশ চায় না মানেই তারা গুম করবে—বিষয়টা এমন নয় বলে যুক্তি দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। ৯ এপ্রিল সময় টিভির এক টকশোতে তিনি বলেন, বিএনপির ৯১-৯৬ আমলে কিংবা ২০০১-২০০৬ আমলে তো গুমবিরোধী কোনো আইন ছিল না এবং তখন গুম হয়নি; মানুষ গুম শব্দটার সঙ্গে সেভাবে পরিচিতও ছিল না।
তবে মানুষের কাছে এখনো অস্পষ্ট—বিএনপি কেন গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর আইন করতে দিল না।