Published : 11 Jun 2025, 09:29 AM
জামিনে ছাড়া পেয়েছেন গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের কর্মসূচিতে এক নারীকে লাথি মারা বহিষ্কৃত সেই জামায়াতকর্মী। খবরটা এরই মধ্যে পুরোনো হয়ে গেছে এবং এতদিনে নারীকে লাথি মারা সেই বীর হয়তো নিজ দলে পুনর্বাসিত হয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। লাথি মারার সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ায়, তাকে আটক করে সরকার প্রশংসনীয় কাজ করেছিল বলে দাবি করতেই পারে। তবে খুনখারাবির আসামি তো আর নন, তাই জামিনও পেয়েছেন দ্রুত। জামিনের ঘটনা উদযাপনের সময় তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়ার ঘটনায় যাদের দেখা গেছে; দুর্জনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এই ‘লাথি মারনেওয়ালা’র রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। যদি সত্যি তারা তাই হয়ে থাকেন, তবে পুনর্বাসনের গল্পটিও মিথ্যে নয় বলে ধরে নেওয়া যায়।
এই ঘটনা নিশ্চয়ই অচেনা লাগছে না। এমন তো আরও ঘটেছে। এইতো অল্প কিছুদিন আগে ইভটিজিং করতে গিয়ে ভাইরাল হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কমর্চারীকেও একই ভাবে মব তৈরি করে ছাড়িয়ে এনে ফুলের মালা আর পাগড়ি দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল। মুন্সীগঞ্জের সেই ‘মুন্সীটি’, যে লোকটি লঞ্চে মেয়েদের পিটিয়েছিলেন জামিনের পর তাকেও ফুলের মালা দিয়ে বরণ করতে দেখলাম। মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে দুজন মেয়েকে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ পেয়ে এই মুন্সী সাহেব ইচ্ছামতন প্রহার করেন এবং কারণ হিসেবে বলেন, তিনি তাদের বড় ভাই হিসেবে জনসমক্ষে শাসন করেছেন। সেখানেও আমরা দেখেছি মব করতালির মাধ্যমে এই ঘটনা উদযাপন করেছে। জামিনে ছাড়া পাওয়ার যথারীতি ফুলের মালা দিয়ে তাকেও বরণ করে নেয়া হয়েছে। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে কত বড় কুশিক্ষার ইঙ্গিত হয়ে রইল সমাজের প্রতি তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।
একই রকমের ঘটনার ভিন্নরূপে বারবার ফিরে আসা আসলে কিসের নির্দেশ করে? শুধু আটক করে দুদিন পরে ছেড়ে দিলেই এর নিপাত সম্ভব নয়। অন্যদিকে ঘরে মা-বোন রেখে এসে একজন ইভটিজার ও মলেস্টারকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো কি নির্দেশ করে? সেই মবের অংশ প্রত্যেকটি মানুষ একই রকম পরিস্থিতিতে থাকলে তারাও একই কাজ করতেন আর সেই জন্যেই আসামিকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে। নারীর গায়ে লাথি দেওয়া, পিটিয়ে জখম করা, পোশাক নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা যেন সহিংসতা নয়, শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের উপায়। বিচার তো দূরের কথা, সামাজিক প্রতিবাদও ক্ষীণ কণ্ঠ, বরং ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার মতো সরব সম্মতি প্রকট।
সাইবার সহিংসতা ও নারী
এ তো গেল মাঠপর্যায়ের চিত্র। অনলাইনের অবস্থা আরও ভয়াবহ। নিষিদ্ধ সংগঠনের নেত্রীদের শায়েস্তা করার উপায় হিসেবে শ্লীলতাহানির হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে যে কোনো ভিন্নমত পোষণকারী নারীকে বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ মিমস, কমেন্টে মারধরের হুমকি ও জঘন্য ট্যাগ দেওয়া তো খুবই সাধারণ বিষয়। শুনতে আশঙ্কাজনক হলেও আমাদের তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশ এখনও ফেইসবুকমুখী। তারা রাজনীতি, অর্থনীতি আর সেইসঙ্গে মানবিক শিক্ষাও নেয় এই ফেইসবুক থেকে। তাই এসব ফেইসবুক অ্যাক্টিভিটির দিকে নজর রাখার কারণ আছে বৈকি। যখনই কেউ দেখছে, এসব কমেন্টের নেগেটিভিটি সম্পর্কে কেউ আওয়াজ তুলছে না বরং হাসাহাসি করে ভুলে যাচ্ছে, ব্যাপারটা এই ফেইসবুকমুখী তরুণদের ব্রেইনে নরমালাইজড হতে শুরু করে এবং তারই ফলাফল মাঠপর্যায়ে নারীর প্রতি প্রবঞ্চনা।
গায়ের রং যখন মব জাস্টিসের নির্ধারক
তবে হ্যাঁ, ‘সুন্দর-অসুন্দর’ ভেদে অবশ্য এই প্রবঞ্চনার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে থাকে। যেমন, কালো চামড়ার ‘ময়লা’ চেহারার অথবা সাদা চামড়ার ‘পরিষ্কার’ চেহারার কেউ মবের আক্রোশের শিকার হলে তাদের প্রতি আচরণে ভিন্নতা দেখা যায়। এই যেমন ময়লা চেহারার শাহবাগীকে দেখে বমি পেলেও পরিষ্কার চেহারার শাহবাগীকে আবার বিয়ে করে চড়-থাপ্পড় দিয়ে ‘ফিক্স’ করার বাসনা ঠিকই জাগে। সেই মেয়েটি বিয়ে করে ‘ফিক্স’ হতে চাইছে কি না, সেই কনসেন্ট নেওয়া অবশ্য সেকেন্ডারি বিষয়! আবার কয়েকদিন আগে দেখুন না, দুজন আর্টিস্ট, মমতাজ ও নুসরাত ফারিয়া গ্রেফতার হলেও আদালত প্রাঙ্গণে ডিম কিন্তু ছোঁড়া হয়েছিল শুধু মমতাজের ওপরেই। ডিম নুসরাত ফারিয়াকেও মারতে বলছি না। শুধু জানাচ্ছি মব আবেগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেলে যে আচরণ করে, সেটাই হলো সমাজের অধিকাংশ মানুষের নরমালাইজড চিন্তাভাবনা। ইংরেজরা ২০০ বছর শাসন করে ১৯৪৭ সালে চলে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু তাদের চোখে দুনিয়া দেখার অভ্যাস আমাদের রক্তে গেঁথে রেখে গেছে।
মব সাইকোলজির নেপথ্য কথা
এখন কথা হতে পারে, পকেটমার ধরা পরলে তাকে গণপিটুনি দিলে সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়, তাহলে শুধু মেয়েদের নিয়েই কেন প্রতিবাদ হচ্ছে। মব গঠনের ঘটনা নারীপুরুষভেদে সবার সঙ্গে হলেও এটা নিয়ে এখন কথা বলার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। মবে অংশগ্রহণ করা এবং এবং দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা দুটোই সমাজের ও তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল তত্থ্য দেয়। কেন, কিভাবে এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার উপায় নিয়ে কিছু ধারণা দেয়া যেতে পারে এখানে।
সাইকোলজিস্ট গুস্তাব লেবনের মতে, মবের মাঝে মানুষের ব্যক্তিগত চেতনা লোপ পায় বা Deindividuation ঘটে। এসময় প্রতিক্রিয়া কন্ট্রোল করার কোনো নির্ভরযোগ্য স্টাডি নেই। এসময়ে যে কেউ মবের নেতা হয়ে ভুল দিকে নেতৃত্ব দিতে পারে। আর যেহেতু ভিড়ের মাঝে কারো ব্যক্তি দায়বদ্ধতা থাকে না, সবাই তাদের ভেতরের সকল নৃশংসতা ঝেড়ে ফেলতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। মব হিংস্রতায় পরিণত হওয়ার আরেক ব্যখ্যা দিয়েছেন, গায়ুক ওয়াং। তিনি সাইকোলজি টুডে-র এক প্রতিবেদনে বলেছেন, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত অপারগতার ক্ষোভের প্রজেকশন ভিড়ের মধ্যে প্রকাশ পায়। একটি উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষার অপর্যাপ্ততার সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্বকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না মব তৈরির রসদ হিসেবে। কথাতেই তো আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।
এখন এগুলো থেকে উত্তরণের উপায় কি? আইনি ব্যবস্থা তো আছে এদেরকে থামাতে তবে সেটা আমার মতে যথেষ্ট নয়। এভাবে সাময়িক পরিবর্তন এলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা। আপনি যদি আপনার সঠিক নৈতিক বিশ্বাসকে বিপদের সময়ে ধরে রাখতে পারেন, তাহলেই আপনি একজন সার্থক মানুষ। নাহলে আমার আপনার আর একটা পশুর মধ্যে তফাৎ কি বলুন?
ডিগ্রি অর্জন নাকি সুশিক্ষা?
একটি সুন্দর সহানুভূতিশীল ও চিন্তাশীল সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষার কোনো তুলনা নেই। এখন এই শিক্ষা কি গাদা গাদা ডিগ্রি অর্জনকে বোঝায়? আমাদের দেশে কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তো অভাব নেই বরঞ্চ তুলনামূলক বেশিই আছে। তবুও অনলাইনে আর অফলাইনে এত ঘন ঘন মব গঠনের পেছনে কারণ কি? সুশিক্ষার অভাব। এমন শিক্ষার কি দরকার যা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা শেখানো তো দূর, দুবেলা ভাতের উপায় খুঁজে দিতে পারে না? এ ব্যাপারে আমাদের সরকারের উচিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিলে প্রতিবছর শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা এমনিতেই কমে যাবে। এগুলো যদিও পুরাতন আলাপ। কিন্তু আমার মতে, গোড়ার পরিচর্যা না করে মাথায় তেল-পানি দিয়ে আসলে কোনো লাভ নেই। আমার দেশে বাচ্চা জন্মানোর পরেই তাকে শেখানো হয় তাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা আমলা হতে হবে। তাই সংস্কারের শুরুটা করতে হবে এখান থেকে।
এবারের প্রস্তাবিত ২০২৫- ২৬ সালের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতসহ শিক্ষাখাতেও কিন্তু প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নেই। ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশীয় দেশ নেপাল, পাকিস্তান, ভারত, চীন, জাপানের মোট জিডিপি থেকে রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট খাতে সন্তোষজনক বরাদ্দ থাকলেও বাংলাদেশের এই খাতে তেমন কোনো বরাদ্দ নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনা না হয় নাই দিলাম! এই দেখুন না, পশ্চিমা দেশ, সুইডেনের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কিন্তু বিশ্বখ্যাত। সেখানে ৫ বছরের কমবয়সী বাচ্চাদেরকে আগেই অ্যাকাডেমিক চাপ না দিয়ে, Förskola বা ফোর-শু-লা পদ্ধতিতে পড়ানো হয়। সেখানে বাচ্চাদের আগে ভাষাগত, মানসিক, শারীরিক ও ব্যক্তিত্বের বিকাশে জোর দেয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশ এমনকি দক্ষিণ এশীয় বিভিন্ন দেশও এখন গৎবাঁধা পড়াশুনা আর ডিগ্রি অর্জনের থেকে আগে একজন আত্মনির্ভরশীল মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়।
সমাধানের শুরু গোঁড়া থেকে
একটা বাচ্চা যখন নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তার ভেতরের স্বার্থপরতা, অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করা ও দ্বিচারিতা ধীরে ধীরে লোপ পায়। তার অন্যায়কে অন্যায় বলার ও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মেরুদণ্ড ও দূরদর্শিতা বৃদ্ধি পায় যেটা বড় বয়সে এসে মানবিক, সামাজিক ও প্রফেশনাল জীবনে কাজে লাগাতে পারে। তখন মানুষ স্রোতে গা ভাসানোর আগে দুবার ভেবে দেখবে, ঠিক-ভুল বিচার করার সময় নেবে। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব না হলেও কিছু কিছু দিক সংস্কার করানোই যায়। যেমন, ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের ‘স্কাউট মাইন্ডসেট’-এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ও সেটার চর্চায় গুরুত্ব দেওয়া, ভুড়ি ভুড়ি ডিগ্রির চাইতে স্কিল অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বইয়ের জ্ঞান শুধু তত্ত্বে না রেখে নিজেরা চর্চা করা কারণ আলবার্ট বান্ডুরাসহ অনেক সোশাল লার্নিং স্কলারদের মতে (১৯৭৭), শিশুরা শেখে পর্যবেক্ষণ, অনুকরণ ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে।
জানি না নতুন গঠিত এই মবোক্রেসির শেষ কোথায়! অনেকে বলেন দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে বিভিন্ন জায়গায় মব তৈরিকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলে মবের পুনরুত্থান হচ্ছে বারংবার। তবে যে মানুষগুলো অল্পেতেই অন্ধের মতো মব অনুসরণ করে শুধু নারী নয়, সকলের জনজীবন হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতায় ফেলছে, তাদের মনেরও সংস্কার প্রয়োজন রয়েছে।
যদি আমরা চাই, নারীর প্রতি সহিংসতা, মব সাইকোলজি এবং ভিন্নমত দমন করার সংস্কৃতি বন্ধ হোক–তাহলে আমাদের গোড়ার দিকেই ফিরে যেতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে এই অন্ধত্বের কারণও সমূলে বিনাশ করতে হবে। সময় এসেছে, শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ নয়, চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করার।