দুইবার ক্যান্সার জয় করে তৃতীয়বার লড়ছি

ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা গত দশকের তুলনায় তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যাচ্ছে। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, খাদ্যাভ্যাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ কিছু মৌলিক সমস্যার ফলে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মো. সালেহ মাহমুদ তুষার
Published : 5 Feb 2024, 12:02 PM
Updated : 5 Feb 2024, 12:02 PM

আমি একে একে তিনবার আক্রান্ত হয়েছি ক্যান্সারে। প্রথম এবং দ্বিতীয়বার সম্পূর্ণ ক্যান্সার মুক্ত হয়েছিলাম। বর্তমানে তৃতীয়বারের মতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত হয়তো চিকিৎসক ঘোষণা করবেন, ‘আপনি এখন ক্যান্সার মুক্ত।’ প্রথম ও দ্বিতীয়বার ক্যান্সার থেকে মুক্তি লাভ ও তৃতীয়বারের লড়াইয়ের গল্প বলব।

আমার নাম মো. সালেহ উদ্দিন মাহমুদ। আমি ডা. তুষার নামেই অধিক পরিচিত। আমি কাজ করছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এছাড়াও আমি স্পোর্টস স্পেশালিস্ট চিকিৎসক হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং ফুটবল ফেডারশনের সঙ্গে কাজ করি। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের কাউন্সিলিং ও মোটিভেশনেও সম্পৃক্ত।

২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো এপেন্ডিমোমা (স্পাইনাল কর্ড কিংবা মন্তিষ্কের সেলে বৃদ্ধি) ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছিল আমার। তখন আমি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। বয়স ২০-২১ হবে। হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করলে পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার ধরা পড়ে। একদম প্রাথমিক স্টেজে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়াতে সুস্থ হতে পেরেছিলাম সহজে। প্রাথমিক স্টেজে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল, আমার সমস্যার কথা নিজে বুঝতে পেরেছিলাম। কেন এমন হচ্ছিল, তা জানার চেষ্টা করলাম। পরীক্ষা করার মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। এরপর আমি ভেঙে পড়িনি।

আমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো বিষয়টা ছিল, সঠিক ডায়াগনোসিস পেয়েছি। আমাদের অধিকাংশ মানুষ যা সঠিকভাবে পাচ্ছে না। রোগটা কেন হচ্ছে? আপনার কী কী সমস্যা হচ্ছে, এটা জানা জরুরি। তাহলে আপনি সঠিকভাবে এগোতে পারবেন। আরেকটি বিষয় হলো— সবসময় পজিটিভ ছিলাম। আমার অপারেশন হওয়া এবং পরের বিষয়গুলো ছিল সম্পূর্ণ একটা নিয়মের মধ্যে। কখনো ভেঙে পড়িনি। পজিটিভ থাকার চেষ্টা করেছি।

আড়াই থেকে তিন বছর সঠিক একটা নিয়মের মধ্যে থাকার পর ডাক্তার আমাকে সম্পূর্ণ ক্যান্সার মুক্ত বলে ঘোষণা করেন। ছাত্র থাকাকালে একেবারে প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হওয়ায় এটা আমার জন্য অতটা কঠিন কিছু ছিল না। তখন আমি ক্যান্সারের বিষয়ে অতটা ভাবিনি। শুধু নিজের জন্য বাঁচতে হবে, এটুকু মনে করেছিলাম।

এরপর আবার ২০১৩ সালে ক্যান্সার শনাক্ত হয় আমার শরীরে। এবার এপেন্ডিমোমা নয়, নতুন এক ক্যান্সার টেরাটোমায় (টিস্যুতে হাড়, চুল ও অন্যান্য অযাচিত বৃদ্ধি) আক্রান্ত হই। দ্বিতীয়বার ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর আমার সঙ্গে ঘটে হৃদয়বিদরক ঘটনা। একই সময়ে আমার বাবাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। আর কিছুদিন পর তার মৃত্যু হয়।

আমি তখন মেডিকেলে পড়া শেষ করে পরিবারের বিষয় বুঝতে শিখছি। হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে আমারও সামলাতে একটু ঝামেলা হচ্ছিল। কিন্তু কখনো মনোবল হারাইনি। নিজের চিকিৎসা ও পরিচর্যার নিয়মগুলো আমি সবসময় মেনে চলতাম। ফলে দ্বিতীয়বারও আল্লাহর রহমতে মুক্তি লাভ করি।

দ্বিতীয়বার ক্যান্সার থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর নিজেকে একটা রুটিনের মধ্যে আবদ্ধ করি। নিয়মিত বিভিন্ন পরীক্ষাসহ ট্রিটমেন্ট করাতাম। কিন্তু আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরেকটি নতুন পরীক্ষা। ২০১৭ সালে আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হয়। পরিবার এবং অনাগত শিশুর দায়িত্ব নিয়ে যখন ভাবছি, ঠিক তখনই জানতে পারি আবারও আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত। শরীরে শনাক্ত হয়েছে সারকোমা (এটি হাড় বা শরীরের নরম টিস্যুতে হয়) ক্যান্সার, যার চিকিৎসা এখনও চলছে।

আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রশংসা জ্ঞাপন করি কারণ আমার জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয় হচ্ছে প্রতিবারই প্রাথমিক অবস্থাতে ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। আর সঠিক ডায়াগনোসিস পেয়েছি। সবসময় নিজের বিষয়ে পজিটিভ থাকার চেষ্টা করেছি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের পাশাপাশি নিজের জন্য নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি।

আমাদের দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা গত দশকের তুলনায় তিন থেকে চারগুণ বেড়ে যাচ্ছে। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, খাদ্যাভ্যাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ কিছু মৌলিক সমস্যার ফলে আমাদের দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে ক্যান্সারের কাছে হেরে যাচ্ছেন।

ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া পর আক্রান্ত ব্যক্তি তার স্বল্প আয়ু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা শুরু করেন। অথচ শনাক্ত হওয়ার পর তার উচিত চিকিৎসকের পরামর্শে নিজেকে চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত করা। তবেই তিনি মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন।

শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়বার ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি চার দিনের মধ্যে অপারেশন করতে সক্ষম হয়েছি। ফলে দ্রুত সুস্থ হতে পেরেছি। সঠিক চিকিৎসা আর পজিটিভ মানসিকতাই ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দেয় বলে আমি মনে করি। 

লেখক: চিকিৎসক

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)