২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সার্বিয়া ও ব্রাজিলে নির্বাচনি বিজয় এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্ন

ব্যালটে স্বৈরাচারকে হঠানো সহজ হলেও আন্দোলনের ঐক্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন। সার্বিয়া ও ব্রাজিলের বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা।

সার্বিয়া ও ব্রাজিলে নির্বাচনি বিজয় এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্ন

বেলগ্রেডের রাজপথে ভুচিচ-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জয়োল্লাস (বাঁয়ে) এবং সাও পাওলোতে পতাকা হাতে লুলার নির্বাচনি বিজয় উদযাপন (ডানে)। ছবি: রয়টার্স

লুবনা ফেরদৌসী লুবনা ফেরদৌসী

Published : 28 Oct 2026, 10:32 AM

Updated : 28 Oct 2026, 10:32 AM

স্বৈরশাসকের পতন একটি ঘটনা। স্বৈরশাসনের পুনরুৎপাদন ঠেকানো দীর্ঘ রাজনৈতিক কাজ। সার্বিয়া ও ব্রাজিলের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে পাশাপাশি রেখে দেখার প্রয়োজন এখানেই। দেশ দুটির ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা। সার্বিয়ায় হয়েছে সংসদ নির্বাচন, ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা। ফলে তাদেরকে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ভুল হবে। তবে উভয়ের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, নির্বাচনি জয়, কার্যকর শাসনক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর পৃথক অর্জন।

সার্বিয়ার ইতিহাস দিয়েই শুরু করা যাক। ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে নির্বাচনি বিজয় রক্ষায় বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও নাগরিকেরা একত্র হয়েছিলেন। ভোটের ফল অস্বীকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের মুখে তিনি পরাজয় মেনে নেন। পরে বিজয়ী জোটের মধ্যে সংস্কারের গতি ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। শাসককে সরানোর ঐক্য রাষ্ট্র পরিচালনার স্থায়ী ঐকমত্য হয়ে ওঠেনি।

এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো, একটি জোট কাকে প্রত্যাখ্যান করছে, তার উত্তর থেকে সে কী ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে, তা নির্ধারিত হয় না। বিরোধিতার ঐক্যকে নীতিগত কর্মসূচি ও জবাবদিহির ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হয়।

এবার শিক্ষার্থীদের সমর্থিত প্রার্থীরা আলেকসান্দার ভুচিচের রাজনৈতিক জোটকে হারিয়েছেন। রয়টার্সের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় দুই বছরের আন্দোলনের পেছনে ছিল নভি সাদের রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জনের মৃত্যু এবং দুর্নীতি ও জবাবদিহির দাবি। তবে নতুন সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে, তার নেতৃত্ব ও কর্মসূচি কী হবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তখনও সামনে ছিল।

একটি অবকাঠামোগত বিপর্যয় থেকে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আন্দোলন গড়ে ওঠার তাৎপর্য আছে। মানুষ শুধু দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা চাননি; সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সেই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা সরকার পরিচালনার সীমাহীন অধিকার তৈরি করে না।

ভোটাররা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন বলেই বিজয়ীদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জনস্বার্থসম্মত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রয়োজন স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, স্বাধীন তদন্ত, কার্যকর সংসদ এবং ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার নিরাপদ সুযোগ। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান এমন হতে হয়, যেখানে নেতার সততার ওপর বিশ্বাস হারালেও নাগরিকের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে।

ব্রাজিলের ইতিহাস অন্য ধরনের সতর্কতা দেয়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সালের সামরিক শাসনের অবসান হয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও ধাপে ধাপে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সামরিক শাসনের অবসানের পরও রাজনীতিতে সামরিক কর্তৃত্বের প্রশ্ন রয়ে যায়। নির্বাচিত সরকারের অস্তিত্ব আর বেসামরিক গণতান্ত্রিক কর্তৃত্বের সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়।

লুলার নিজের উত্থান শ্রমিক আন্দোলন থেকে। সত্তরের দশকের শ্রমিকনেতা পরবর্তী সময়ে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং ২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আজ যাকে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রতিনিধি বলা হয়, তার রাজনৈতিক শক্তির শিকড়ও সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনে।

ফলে পুরোনো দল মানেই পরিবর্তনের অযোগ্য এবং নতুন আন্দোলন মানেই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা, উভয় ধারণাই দুর্বল। বিচার করতে হবে সংগঠন কী দাবি বহন করছে, কার স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করছে এবং নিজের নেতৃত্বকে কতটা জবাবদিহির মধ্যে রাখছে।

২০২২ সালে লুলার বিজয়ের পর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি বলসোনারোর সমর্থকদের কংগ্রেস, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা দেখিয়েছিল, নির্বাচনে পরাজিত হয়েও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি ফল অকার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে। ভোট গণনার সঙ্গে ভোটের কর্তৃত্ব রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও প্রয়োজন।

এবার লুলা ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন। ব্রাজিলের সেনেটের প্রকাশিত বিবরণেও তার পুনর্নির্বাচনের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তবে কংগ্রেসে ডানপন্থিদের শক্ত অবস্থান তার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকবে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রেসিডেন্টের ম্যান্ডেট তাই আইন পাস কিংবা সংস্কার বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নয়।

সার্বিয়ার সামনে আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকে জবাবদিহিমূলক সরকারে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা। ব্রাজিলের সামনে রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে থেকেও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরীক্ষা। প্রথম ক্ষেত্রে বিপদ হলো, ত্যাগের ইতিহাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকার অনুমতিপত্র বানানো। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিপদ, প্রতিপক্ষের ভয় দেখিয়ে নিজের ব্যর্থতার জন্য অনির্দিষ্টকাল ছাড় চাওয়া।

‘আমরা এত ত্যাগ করেছি, আমাদের প্রশ্ন করছেন কেন’ এবং ‘আমরা না থাকলে আরও খারাপ শক্তি আসবে’—দুটো যুক্তিই নাগরিকের স্বাধীন বিচারকে দলীয় আনুগত্যের অধীন করতে পারে। জনগণ তখন নীতিনির্ধারণের অংশীদারের বদলে সরকারের রাজনৈতিক ঢাল হয়ে ওঠেন।

অর্থনৈতিক প্রশ্নে বিজয়ী ঐক্যের সীমা আরও স্পষ্ট হয়। বড় ব্যবসায়ী ও কম মজুরির শ্রমিক একই সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু কর, মজুরি, শ্রম অধিকার ও সরকারি ব্যয়ের প্রশ্নে তাদের দাবি এক হবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্য থাকলেও সম্পদ ও সুযোগের ন্যায্য বণ্টনে ঐকমত্য নাও থাকতে পারে।

দুর্নীতি কমানো জরুরি। কিন্তু বৈধ নিয়মের মধ্য দিয়েও সুবিধা অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। তাই সরকারের মূল্যায়নে অর্থ আত্মসাৎ বন্ধ হয়েছে কি না দেখার পাশাপাশি মজুরি, সামাজিক সেবা, করের বোঝা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বণ্টনও দেখতে হবে। ‘জনগণের সরকার’ বললেই জনগণের ভেতরের শ্রেণিবিভাজন দূর হয় না।

ভূরাজনীতিতেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। ব্রাজিলের সামরিক শাসনের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল, পরে বিভিন্ন প্রশ্নে দূরত্ব তৈরি হয়। বাইরের শক্তির সঙ্গে বিরোধ কোনো সরকারের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চরিত্রের নিশ্চয়তা দেয় না। আন্তর্জাতিক স্বায়ত্তশাসন এবং নাগরিক স্বাধীনতা পৃথক প্রশ্ন; দুটিরই মূল্যায়ন দরকার।

তাই নির্বাচনের ফলকে শুধু ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস, মস্কো কিংবা বেইজিংয়ের লাভক্ষতির অঙ্কে পড়লে চলবে না। সার্বিয়ার ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক অবস্থান এবং ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক ভূমিকার বাস্তবতা এক নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখতে হবে, বাইরের সম্পর্কের দরকষাকষিতে দেশের মানুষের স্বার্থ কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ কতটা আছে।

বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনা জরুরি। অতীতের নিপীড়নের বিচার এবং বর্তমান ক্ষমতার জবাবদিহি একই গণতান্ত্রিক দাবির অংশ। আগের শাসকের অপরাধ পরবর্তী শাসকের জন্য অগ্রিম দায়মুক্তি হতে পারে না।

কোনো দলের অপরাধের বিচার করতে হলে ব্যক্তির নির্দিষ্ট দায় প্রমাণ করতে হবে। দলীয় পরিচয় কাউকে অপরাধ থেকে রক্ষা করতে পারে না; সেই পরিচয় কাউকে হত্যা, নির্যাতন কিংবা অধিকার হরণের বৈধ লক্ষ্যও বানাতে পারে না। বিচারব্যবস্থার কাজ অপরাধ নির্ধারণ করা। রাজনৈতিক বিজয় শাস্তি ঘোষণার এখতিয়ার দেয় না।

‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটির ব্যবহারেও বিশ্লেষণমূলক সতর্কতা প্রয়োজন। সব কর্তৃত্ববাদী শাসনের ইতিহাস ও চরিত্র এক নয়। শব্দটি যদি শুধু অপছন্দের প্রতিপক্ষের পরিচয় হয়ে যায়, তাহলে নিজেদের শিবিরে বিরোধী দমন, নেতাপূজা, সংখ্যালঘুবিদ্বেষ ও সহিংসতার অনুমোদন আড়াল করা সহজ হয়। কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা বিশ্বাসযোগ্য হয় তখনই, যখন নিজের পক্ষের হাতেও অন্যায় ক্ষমতা তুলে দিতে আপত্তি থাকে।

তাই ছবির মানুষের ভিড়ের পাশাপাশি সামনের আলিঙ্গনটিও আমার কাছে রাজনৈতিক। আমাদের দেশেও বিজয় সমাবেশ হোক। কিন্তু তার পরদিন পোশাকের জন্য একজন নারী আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র যেন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তার পোশাকের বিচার করতে না বসে। দুজন মানুষের ভালোবাসা যেন জনতার অনুমোদনের বিষয় না হয়। সংখ্যালঘু নাগরিককে যেন আনুগত্যের পরীক্ষা দিতে না হয়। ক্ষমতাচ্যুত দলের কর্মী বা সমর্থকের ওপর হামলাকে যেন রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ বলা না হয়।

আর আজ বিজয় মিছিলে হাঁটা মানুষটি কাল সেই বিজয়ীদের বিরুদ্ধে মিছিল করলে যেন তার জন্যও একই রাস্তা, একই অধিকার এবং একই আইনি সুরক্ষা থাকে। যে বিজয় নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করতে পারে, তার গণতান্ত্রিক দাবি বিশ্বাস করার কারণ থাকে।

ড. লুবনা ফেরদৌসী: যুক্তরাজ্য প্রবাসী শিক্ষক, গবেষক ও সমাজবিশ্লেষক। ই-মেইল: lferdowsi@yahoo.com