Published : 30 May 2026, 04:37 PM
মার্কিন যুদ্ধযন্ত্র এবার কিউবার দিকে ঘুরেছে। গত সপ্তাহে কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোজাসাপ্টা বললেন, কিউবার কমিউনিস্ট শাসন গুঁড়িয়ে দেওয়া তার দীর্ঘদিনের বাসনা। যদিও তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ওয়াশিংটন এখনো কিউবার সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে তিনি বলতে ভুলেননি—এমন সমঝোতার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
দুই মাস আগে আমি কাছ থেকে দেখেছি, দশকের পর দশক ধরে মার্কিন অবরোধে কিউবার অর্থনীতি কতটা বিপর্যস্ত। আর জানুয়ারি থেকে ডনাল্ড ট্রাম্পের তেল অবরোধে দেশটি ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন।
আমেরিকা এখন কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে দুইজন মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র, চারটি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯৬ সালে দুটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করার অভিযোগ আনছে। এ ঘটনা ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করায়। সেসময় আমেরিকার সামরিক বাহিনী এ পদ্ধতিতে মাদুরোকে অপহরণের আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করেছিল।
এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য ছড়াচ্ছে যে কিউবার হাতে তিন শতাধিক সামরিক ড্রোন রয়েছে। সেগুলো দ্বারা দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ান্তানামো বে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা কিউবাকে ‘উদীয়মান হুমকি’ হিসেবে দাবি করেছেন। কিন্তু কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়া কিউবা হঠাৎ করে নিজ উপকূল থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে আমেরিকার ওপর হামলা করবে—এ ধারণা আকাশ কুসুম কল্পনা। এরকম পদক্ষেপের মার্কিন প্রতিশোধ কিউবা ভালোভাবেই জানে। তাই পুরো বিষয়টি ইরাক আক্রমণের আগে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস’ গল্পের মতো পুরোনো এক অছিলা মাত্র।
ট্রাম্পও নিজ উদ্দেশ্য আর গোপন রাখছেন না। গত মার্চে তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, কিউবা দখলের সম্মান আমি পাব।” এরকম ভাষা ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর অভিজ্ঞতা মনে করায়। তারা আফ্রিকাকে ফালি ফালি করে কর্তন করে নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ট্রাম্প আরও ব্যক্ত করেন, “আমি মনে করি, দেশটির সঙ্গে যা খুশি তা-ই আমি করতে পারি।” গত কয়েকদিন আগে মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে পুরোনো রণতরী ‘ইউএসএস নিমিৎজ’ ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি সামুদ্রিক মহড়ার উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎসের মতে, ইরানের কাছে আমেরিকা অপমানিত হয়েছে। এতে অনেকে ভাববে, ইরান যুদ্ধের ইতি টানতে ট্রাম্প হয়তো মরিয়া। কিন্তু ইতিহাস বলে, ব্যর্থতা সবসময় পতনোন্মুখ শক্তিকে সংযত করে না; কখনো কখনো আরও বিপজ্জনক করে তোলে। ফলে ট্রাম্প ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা আশ্বস্ত হয়েছে—প্রায় সাত দশক ধরে ওয়াশিংটনের কঠোর চাপ মোকাবিলা করে টিকে থাকা ক্যারিবীয় দ্বীপ কিউবাকে দখল করতে পারলে সব পরাজয়ের গ্লানি মুছে যাবে। আর আমেরিকা ফিরে পাবে সামরিক আধিপত্যের হারানো গৌরব।
কিন্তু বাস্তবে কিউবা সংকটের অর্থ কী? মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধের চাপে আজ কিউবার সাধারণ মানুষ নাভিশ্বাস জীবন যাপন করছে। আমি যেসব কিউবানদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংগ্রামে ক্লান্ত।
নিখুঁতভাবে সাজানো ১৯৫৭ সালের একটি লাল ফোর্ড গাড়ির এক ট্যাক্সিচালক আমাকে বললেন, আগে প্রতি লিটার পেট্রোল ক্রয়ে ১.২০ ডলার খরচ হতো। এখন তা বেড়ে ৮ ডলার। অথচ কিউবায় গড় মাসিক আয় মাত্র ১৬ ডলার। চিকিৎসাকর্মীরা হাসপাতাল যাতায়াতের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অধিকন্তু, হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকট। ফলে মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ কিউবার মারাত্মক ক্ষতি করছে।
এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে, অনেক কিউবানের কাছে সেটি স্পষ্ট। হাভানার কেনাকাটার প্রধান সড়কে এক ব্যক্তি আমাকে সরাসরি বলেই বসলেন, এর জন্য দায়ী ডনাল্ড ট্রাম্প। আবার কেউ কেউ কেবল এ দুঃস্বপ্নের অবসান চান, দোষ যারই হোক। এক ট্যাক্সিচালক আমার সঙ্গে খোলামনে মতামত ব্যক্ত করলেন, “কিউবানরা আশা নিয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু কিছু একটা তো করতে হবে, কারণ মানুষ এ পরিস্থিতি আর সহ্য করতে পারছে না।” তিনি নিজেও নিশ্চিত নন, মূল দোষ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার, নাকি অন্য কিছুর। অবশেষে তিনি নিজ দেশের শাসকদের নীতিকেই দায়ী করেন।
কিউবান সাংবাদিক ড্যানিয়েল মন্টেরো বলেন, “সরকারের জনপ্রিয়তা এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছে, মানুষ সরকার থেকে ততই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সে অর্থে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সফল।”
ওয়াশিংটনের হিসাবটিও বেশ সরল—অর্থনৈতিক অবরোধ ও সংকটে কিউবার মানুষ এতটাই ক্লান্ত, হতাশ ও অধৈর্য হবে যে, চলমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে এমন যেকোনো শক্তিকে তারা সমর্থন করবে।
কিউবার সামরিক শক্তি ইরানের সমপর্যায়ের নয়। ভৌগোলিক দিক থেকেও দেশটি ততটা শক্ত অবস্থানে নেই। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের একটি দ্বীপ ওয়াশিংটন যদি সত্যিই আক্রমণ বা দখল করতে চায়, তা করা সম্ভব। তবে কিউবার জনসাধারণও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। গত জানুয়ারিতে আমেরিকার কারাকাস আক্রমণ ঠেকাতে ৩২ জন কিউবান সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। যদি ভেনেজুয়েলার জন্য কিউবান সেনারা জীবন দিতে পারে, তবে নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা কতদূর যাবে, তা সহজে অনুমেয়।
কিছু কিউবান নাগরিকের কথায় প্রতিরোধ স্পৃহার সে বার্তা পরিষ্কার হয়। এক চিত্রশিল্পী আমাকে বললেন, “কিউবানরা সবসময় নিজেদের রক্ষা করেছে—দা-কুড়াল-বটি দিয়েই হোক কিংবা লাঠি দিয়ে।” তিনি তুলে ধরেন ষোড়শ শতকের আদিবাসী নেতা হাতুইয়ের কথা। যিনি স্প্যানিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন। ওই শিল্পীর ভাষায়, “আমার মনে হয় না কোনো আমেরিকান এখানে এসে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারবে। ইতিহাস দেখিয়েছে, তারা তা পারেনি।”
হয়তো ট্রাম্প তার কিউবা অভিযান বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। কিন্তু তার ফল কিউবার জন্য কী হবে? ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের আগে দ্বীপটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের এক অনানুষ্ঠানিক উপনিবেশ ছিল। রেলপথ, চিনিশিল্প, খনি ও বিভিন্ন পরিষেবা ছিল মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
ট্রাম্প কী ধরনের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেন, সে বিষয়ে খুব বেশি সন্দেহ থাকার কথা না। একবার তিনি সামাজিক মাধ্যমে গাজার ওপর এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভিডিও পোস্ট দেন। ভিডিওতে গাজার ধ্বংসস্তূপের জায়গায় দেখা যায় ট্রাম্প মডেলের বিলাসী উন্নয়ন—প্রমোদতরী ও আকাশচুম্বি ভবন আর ধনীদের জন্য নির্মিত এক ঝলমলে নগরী। ওই ভিডিওর কথা কি এত সহজে ভোলা যায়?
ট্রাম্প সম্ভবত কিউবাকে নিজের ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য এক লাভজনক খাত ভাবেন। ফলে দেশটির অর্থনীতি মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা হবে। বিশেষ করে কিউবার বিখ্যাত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা ইতোমধ্যে নানা সংকটে দুর্বল। কিউবায় কোনো বিরোধী দল বা শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র অবধারিতভাবে কিউবার ক্ষমতায় একজন হাতের পুতুল বসাবে। আর নিজ দেশ দখল হওয়ায় ক্ষুব্ধ কিউবানরা হয়তো মার্কিন গোলাবর্ষণে ইরাকি ও আফগান বেসামরিক নাগরিকদের মতো নির্মম সহিংসতার শিকার হবে।
পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের যে গুণটি ছিল না, ডনাল্ড ট্রাম্পের এমন এক মহান গুণ রয়েছে। অন্য জাতিকে মুক্ত করার বেহুদা ভং তিনি ধরেন না। মানবমুক্তির কোনো মহা বয়ানে তার একবিন্দু আগ্রহ নেই। ফলে কিউবার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ মার্কিন অপমানের প্রতিশোধস্পৃহা ও ব্যবসায়িক লোভ দিয়ে পরিচালিত হবে। যে যুদ্ধের লাভের গুড় খাবে মার্কিন অভিজাতরা, কিন্তু মূল্য চুকাবে কিউবার নিরীহ জনগণ।
এ লেখাটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত; এর লেখক ওয়েন জোনস একজন সুপরিচিত ব্রিটিশ সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি মূলত যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কলামনিস্ট হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার রচিত বইগুলোর মধ্যে ‘Chavs: The Demonisation of the Working Class’ এবং ‘The Establishment: And How They Get Away With It’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।