Published : 24 Dec 2025, 09:01 PM
রাষ্ট্র লিখিত ইতিহাস অনেক সময় হয়ে ওঠে নিছক এক রাজনৈতিক নির্মাণ, একটি ‘নির্বাচিত স্মৃতি’র ভাঁড়ার। এই স্মৃতিতে কেউ আলো পায় জাতীয় বীর হিসেবে, আবার কেউ হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও এই দৃষ্টান্তের বাইরে নয়। এখানে মূলধারার বর্ণনা যেন একচেটিয়াভাবে আবর্তিত হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ঘিরে, যেন সমস্ত মুক্তির সংগ্রামে তারা একাই লড়েছে। অথচ গণভাষ্যে বিস্তৃত আলেখ্যের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। এই মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করেছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, হাজং, ওরাওঁ, মণিপুরী, রাখাইনসহ নানা আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালে, যখন এই ভূখণ্ডের অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে, তারা তখন শুধু প্রান্তিক দর্শক হয়ে থাকেনি, অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন সম্মুখযোদ্ধা, পথপ্রদর্শক, সংগঠক ও জীবন দানের মতো সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। আর যুদ্ধশেষে বিজয়ের মহান বয়ান থেকে তাদের অবদান ধীরে ধীরে মলিন করে, সরিয়ে রাখা হয়েছে রাষ্ট্রীয় স্মৃতির প্রান্তসীমায়। কেন এই বিস্মৃতি? এটি কি নিছক একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি একটি সুগঠিত রাজনৈতিক কৌশলের ফল—এই নিবন্ধ সেই জটিল প্রশ্নের অনুসন্ধানে, জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের অন্তর্নিহিত ভয়ে এবং নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের প্রতি এর অস্বস্তির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
জাতিরাষ্ট্রের নির্মাণ ও ‘একক পরিচয়’-এর আকাঙ্ক্ষা
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি সুসংহত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে স্থিতিশীলতা ও ঐক্যের প্রয়োজনে রাষ্ট্র ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে তার কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বেছে নেয়। এই ধারণা বিশাল সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে একটি সুসংবদ্ধ পরিচয়ে আবদ্ধ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জনসমর্থনের ভিত্তি দান করে এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। কিন্তু এই ‘একক পরিচয়’-এর রাজনীতি অনিবার্যভাবে অন্তর্ভুক্তির বদলে বর্জনের দিকে ধাবিত হয়। কেননা, একটি বহুজাতিক ও বহুসংস্কৃতির সমাজে ‘বাঙালি’কে জাতির প্রতিশব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অর্থই হলো অন্য সকল জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়কে অস্পষ্ট, প্রান্তিক কিংবা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা।
এই একজাতিক বর্ণনা শুধু আদর্শগত নয়, ছিল গভীরভাবে রাজনৈতিক। এটি রাষ্ট্রকে একটি সহজ, সরলরৈখিক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘মূলধারা’ তৈরি করতে দিয়েছে। পাহাড়, সমতল ও সীমান্তের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জটিল ও বহুমুখী গল্পগুলো এই সরল বয়ানে অন্তর্ভুক্ত হলে, ‘জাতি’ ধারণাটি নিজেই জটিল ও বহুস্তরীয় হয়ে পড়ত। রাষ্ট্র সেই জটিলতা চায়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও স্মারক নির্মাণ প্রক্রিয়ায় একটি সচেতন ‘ছাঁকনি’ ব্যবহার করা হয়েছিল; যা শুধু সেই সব কাহিনি ও ব্যক্তিকে স্থান দিয়েছে, যারা রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত ‘বাঙালি জাতিরাষ্ট্র’ কথনকে শক্তিশালী করে।
অদৃশ্য রণাঙ্গন: যেখানে আদিবাসী যোদ্ধারা ছিলেন অপরিহার্য
মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত বর্ণনাকে যদি আমরা প্রান্তিকের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ার চেষ্টা করি, তাহলে আমাদের সামনে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, জটিল ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ যুদ্ধের মানচিত্র উদ্ঘাটিত হয়। এই মহাসংগ্রাম শুধু সরল গতিপথের সমতলী খোলা মাঠে, নদীর তীরে কিংবা শহুরে অলিগলির ব্যারিকেডে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর বিস্তৃতি ও গভীরতা ছড়িয়ে ছিল দেশের সেই সব বৈচিত্র্যময় প্রান্তিক ভূখণ্ডে, যেখানে সংখ্যাগুরুর রাজনৈতিক কথনের আলো ঠিক করে পৌঁছায়নি—পার্বত্য অরণ্যের নিবিড় গহনে, সীমান্তের টিলা ও পাহাড়ি চূড়ায়, বিস্তীর্ণ চা-বাগানের অন্তরালে এবং নদী-উপকূলের দুর্গম প্রান্তে।
এই বিচিত্র ভূপ্রকৃতির রণাঙ্গনগুলো একই সঙ্গে যুদ্ধের বিচিত্র স্থানকে নির্দেশ করে, তেমনি উদ্ঘাটন করে যুদ্ধ পরিচালনার এক স্বতন্ত্র গতিবিদ্যাকেও। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সেখানে যুদ্ধের কৌশলকে রূপ দিয়েছে। যে পাহাড়ি পথ একজন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধার কাছে অচেনা ও বিপৎসংকুল ছিল, সেটি স্থানীয় চাকমা বা মারমা তরুণের কাছে ছিল শৈশবের সুপরিচিত পথ। যে সীমান্তের গোপন পথে শরণার্থী পরিবহন একটি প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ ছিল, তা স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের জন্য ছিল নিত্যদিনের চলাচলের রাস্তা। অর্থাৎ, এই অদৃশ্য রণাঙ্গনগুলোতে যুদ্ধের সাফল্য নির্ভর করেছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা ও আত্মত্যাগের ওপর; যা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত কোনো রণকৌশলের চেয়ে অনেক বেশি জৈব ও প্রায়োগিক ছিল।
প্রচলিত ইতিহাসের জার্নালে এই রণাঙ্গন ও তাদের যোদ্ধাদের উপস্থিতি অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। তাদের অবদানকে প্রায়শই খণ্ডিতভাবে ‘সহযোগিতা’ বা ‘সহায়তা’ আখ্যা দিয়ে একটি পার্শ্বভূমিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রকৃত বাস্তবে, বহু ক্ষেত্রে এসব জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল নির্ধারক ও কেন্দ্রীয়। তারা শুধু গাইড বা রসদবাহক হিসেবে নন; তারা ছিলেন স্থানীয় কৌশলের রূপকার, গোপন নেটওয়ার্কের রক্ষক এবং সরাসরি সম্মুখসমরের সৈনিক। তাদের ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ-শেরপুরের সীমান্ত বা উত্তরবঙ্গের সমতলে মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম এতটা ফলপ্রসূ হতো কি না, সে প্রশ্নই থেকে যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম: কৌশলগত অভিযানের হৃদয়
চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। এখানকার যুদ্ধ পরিচালনা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা ছাড়া অকল্পনীয় ছিল। স্বয়ং তৎকালীন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি এইচ টি ইমাম ২৩ অক্টোবর, ১৯৭১ সালে একটি গোপন চিঠিতে লিখেছিলেন, চট্টগ্রাম সেক্টরে কোনো বড় সামরিক অগ্রগতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয় (মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী; আইয়ুব হোসেন ও চারু হক, ২০০৮)। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, ম্রো প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোকেরা শুধু গাইড বা রসদ সরবরাহকারীই ছিলেন না; অনেকে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। তাদের ভূ-প্রাকৃতিক জ্ঞান, গুপ্তপথ ও নিরাপদ লুকিয়ে থাকার স্থানসম্পর্কিত অভিজ্ঞতা গেরিলা অপারেশনগুলোকে কার্যকর ও সফল করতে অবিকল্প ভূমিকা রেখেছে। অপারেশন কুকিছড়ি, তবলছড়ির মতো সফল অভিযানের পেছনে তাদের সাহস ও দক্ষতা ছিল নির্ধারক। অথচ, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নে তাদের এই ভূমিকা ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।
গারো পাহাড় ও সীমান্ত: মানবিক সেতু ও রুট নির্মাতা
ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা অঞ্চলের গারো সম্প্রদায় যুদ্ধ শুরুর পরপরই ব্যাপক হারে শরণার্থীতে পরিণত হয়। কিন্তু তারা শুধু পীড়িতই থাকেনি; ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার গারো যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিবাহিনীতে সরাসরি যোগ দেন। আর যারা ক্যাম্পে ছিলেন, তারা সীমান্ত পারাপার, রুট তৈরি, শরণার্থী স্থানান্তর ও খাদ্য সরবরাহের একটি অত্যন্ত কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। মেঘালয়ের তুরা অঞ্চলের গারো নেতারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়ে শরণার্থীদের ভয়াবহ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন এবং মুক্তিযুদ্ধে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানান ((মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী; আইয়ুব হোসেন ও চারু হক, ২০০৮)। তাদের এই মানবিক ও কৌশলগত ভূমিকা ছাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর চলাচল ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনা অচল হয়ে পড়ত।
উত্তরবঙ্গের সমতল: সাঁওতাল, ওরাওঁ, হাজংদের প্রতিরোধ
রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় সাঁওতাল, ওরাওঁ, হাজং, মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অক্সিজেনের কাজ করেছিলেন। তারা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন, গোপন তথ্য পৌঁছে দিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলায় অংশ নিয়েছেন। তাদের গ্রামগুলো প্রায়শই মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশেরই যুদ্ধের প্রমাণপত্র সংরক্ষণের সুযোগ ছিল না। ফলে, যুদ্ধোত্তর সরকারি তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ায় তারা মূলত বাদ পড়ে যান। তাদের অবদান রাষ্ট্রীয় নথিতে শূন্যতায় পরিণত হয়।
সিলেটের মণিপুরী ও উপকূলের রাখাইন: বিশেষায়িত ভূমিকা
সিলেট অঞ্চলের মণিপুরী তরুণরা সীমান্ত এলাকায় গেরিলা দলে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও স্থানীয় জ্ঞান গোপন বার্তাবাহক ও রুট স্থাপনের কাজে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। অন্যদিকে, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন সম্প্রদায়, তাদের নৌ-চালনা ও উপকূলীয় অঞ্চলের গভীর জ্ঞানের কারণে, নৌ-সেক্টরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা সমুদ্র ও নদীপথে গোপন যোগাযোগ ও সরবরাহ রক্ষা করেছিলেন।
ভুলে যাওয়ার যন্ত্র: প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা ও যাচাইয়ের অপমান
যুদ্ধের ময়দানে তাদের প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য, কিন্তু যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও স্বীকৃতি যন্ত্র তাদের প্রতি চরম বৈরী আচরণ করে। এই বিস্মৃতি ঘটানো হয়েছে বেশ কয়েকটি সুপরিকল্পিত উপায়ে:
১. নথি নির্মূল বা অগ্রাহ্যকরণ: মুক্তিযুদ্ধের সরকারি নথিপত্র প্রস্তুত ও সংরক্ষণে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবে খর্ব করা হয়েছে। এইচ টি ইমামের চিঠির মতো দলিল থাকা সত্ত্বেও, সেই সত্যকে কখনোই জাতীয় ন্যারেটিভের কেন্দ্রে আনা হয়নি। তাদের অনেকের অপারেশনের বিবরণ, ইউনিট নম্বর বা কমান্ডিং অফিসারের সাক্ষ্য সংরক্ষিত হয়নি।
২. ‘কাগুজে প্রমাণ’-এর অমানবিক শর্ত: মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি ও ভাতার জন্য যে যাচাই প্রক্রিয়া চালু হয়, তা সম্পূর্ণরূপে লিখিত দলিল-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি মূলত একটি নাগরিক, শিক্ষিত ও নথি সংরক্ষণের সংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজের জন্য উপযোগী। কিন্তু পাহাড়ি, আদিবাসী ও দরিদ্র গ্রামীণ সমাজে ইতিহাস টিকে থাকে মৌখিক স্মৃতি, গান ও গল্পে। যারা জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে ব্যস্ত ছিলেন, তাদের পক্ষে যুদ্ধের সময় সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা বা সংরক্ষণ করা অসম্ভব ছিল। ফলে, ‘প্রমাণ না থাকা’র অজুহাতে তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
৩. যাচাই প্রক্রিয়ায় অপমান ও অবিশ্বাস: যারা আবেদন করতেন, তাদেরকে প্রায়শই অবিশ্বাস ও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হতো। তাদের বাংলা ভাষায় দুর্বলতা, ভিন্ন চেহারা বা সংস্কৃতির কারণে তাদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। নীলবাবু সিংহের মতো অনেক যোদ্ধা এই অপমান ও জটিলতা এড়াতে আবেদন করতেই রাজি হননি। আ ক্য মং-এর করুণ গল্প: তিনি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে দেখেন, তার জমি দখল হয়ে গেছে। তিনি যখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজের অধিকার দাবি করেন, তখন রাষ্ট্র তাকে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি, বরং তিনি ভূমিহীন ও পরিচয়হীন হয়ে পড়েন (মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী; আইয়ুব হোসেন ও চারু হক, ২০০৮)।
৪. যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের ছায়া: পার্বত্য চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দশকগুলোতে ভূমি বন্দোবস্ত, সামরিক উপস্থিতি ও জুম্ম আন্দোলনের সঙ্গে রাষ্ট্রের তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। রাষ্ট্রের পক্ষে সেই অঞ্চলের মানুষের মুক্তিযুদ্ধের অবদান স্বীকার করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, তা পরবর্তী সময়ের ‘রাজনৈতিক বিরোধীদের’ মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারে বলে ভয় করা হয়। ফলে, তাদের অতীত বীরত্বকে সক্রিয়ভাবে ভুলিয়ে দেওয়া বা ‘সহযোগিতা’ পর্যন্ত খর্ব করে দেখা হয়।
মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত: অদৃশ্যত্বের বোঝা
রাষ্ট্রীয় এই অস্বীকৃতি ও বিস্মৃতির শিকার ব্যক্তিদের ওপর গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাব পড়েছে। এটি শুধু আর্থিক সুবিধা বঞ্চনার কথা নয়, এটি মর্যাদা ও পরিচয়ের সংকট।
অন্তরীণ অদৃশ্যত্ব: দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃতি না পেয়ে, অবহেলার শিকার হয়ে অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবার নিজেরাই তাদের ইতিহাস ও বীরত্ব গোপন করতে শুরু করেছেন। নিজের সন্তান বা নাতি-নাতনিকেও তারা তাদের অবদানের কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন। এই ‘নীরবতা’ একটি প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়, ফলে সম্প্রদায়ের ভেতরেই তাদের নিজস্ব ইতিহাস ঝাপসা হয়ে যায়।
সামষ্টিক মর্যাদাহানি: যখন একটি সম্প্রদায় দেখে যে রাষ্ট্র তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগকেও স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক, তখন সেই সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি অনুভূতি জাগ্রত হয়: ‘আমরা দেশ রক্ষা করলাম, কিন্তু দেশ কি আমাদের রক্ষা করল?’ এই বিভাজন ও অবিশ্বাস জাতীয় ঐক্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
ইতিহাসের শূন্যতা ও বিকৃতি: ইতিহাসে শূন্যতা প্রকৃতিবিরোধী; সেখানে অন্য কিছু দ্বারা পূরণ হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের গল্প যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে বলা হয় না, তখন সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে ভুল তথ্য, কুৎসা বা সাধারণীকরণ। এটা পরোক্ষভাবে একধরনের ইতিহাস বিকৃতি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অসম্পূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট জাতীয় ইতিহাস শেখায়।
ইতিহাসের ফাঁক পূরণ: নৈতিক দায় ও ভবিষ্যতের পথ
এই দীর্ঘ অন্যায় ও বিস্মৃতির ইতিহাস থেকে বের হয়ে আসার জন্য একটি সক্রিয়, সচেতন ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণ জরুরি। এটি শুধু অতীতের জন্য নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
১. সত্যের স্বীকৃতি: বহুজাতিক মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা: রাষ্ট্রীয়ভাবে এই সত্যকে উচ্চারণ করতে হবে: মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির সঙ্গে সঙ্গে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, হাজং, মণিপুরী, রাখাইনসহ সকল জাতিসত্তার যৌথ সংগ্রাম। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ভাষণে, সরকারি বিবৃতিতে এবং জাতীয় নথিতে এই বহুত্ববাদী বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। এটা কোনো দান নয়; এটা ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার।
২. গবেষণা, নথিভুক্তিকরণ ও মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ:
একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে পাহাড়ি, সমতল ও সীমান্ত অঞ্চলে গিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নিতে হবে।
মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহকে একটি বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
স্থানীয় গবেষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সম্প্রদায় নেতাদের সহায়তায় উপত্যকা বা গ্রামভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংকলন করতে হবে।
প্রাপ্ত সকল তথ্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের তালিকা সংশোধনে ব্যবহার করে নৃতাত্ত্বিক মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংযোজন ও স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩. শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পুনর্লিখন:
পাঠ্যপুস্তকের মুক্তিযুদ্ধ অধ্যায়গুলোর পুনর্লিখন করতে হবে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর অবদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শুধু একটি অনুচ্ছেদ নয়, তাদের ভূমিকা বিভিন্ন সেক্টর ও অঞ্চলের প্রসঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।
শিশু-কিশোর সাহিত্য, গ্রাফিক নভেল, ডকুমেন্টারি ও চলচ্চিত্রে তাদের গল্প তুলে আনতে হবে।
জাতীয় জাদুঘরে একটি স্থায়ী গ্যালারি বা বিভাগ উৎসর্গ করতে হবে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
৪. প্রতীকী স্বীকৃতি ও স্মারক নির্মাণ:
পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ-শেরপুর অঞ্চল, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে স্মৃতিস্তম্ভ, স্মারক ফলক বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ ও সম্মান জানাতে হবে।
ডাকটিকিট প্রকাশ বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের মাধ্যমে তাদের অবদান স্মরণ করতে হবে।
৫. রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে রাজনৈতিক। রাষ্ট্রকে তার গভীর-অবচেতন জাতিগত ভয় ও অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে হবে। এটি স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় তার বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই নিহিত। ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের প্রতি সাংবিধানিক বা আইনি স্বীকৃতি একটি জটিল ও দীর্ঘ আলোচনার বিষয় হলেও, মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য একটি নৈতিক দায়িত্ব।
ইতিহাসের পূর্ণতা সন্ধানের প্রয়াস
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়; এটি ছিল একটি বৈচিত্র্যময় জনপদের সকল নাগরিকের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সকল ধর্ম, বর্ণ ও জাতিসত্তার মানুষ তাদের রক্ত দিয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পর রাষ্ট্র যে ‘জাতি’ গঠনের পথে হেঁটেছে, তাতে এই বহুত্বকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা হয়নি। ফলস্বরূপ, একদল সাহসী মানুষ ও তাদের পরিবার ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন।
তাদের এই ‘অদৃশ্যত্ব’ রাষ্ট্রের শক্তি নয়, তার দুর্বলতার পরিচয়। একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সকল অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, এমনকি তা যদি তার প্রতিষ্ঠিত কাহিনিকে কিছুটা জটিলও করে তোলে। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের মহান স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনা কেবল অতীতের একটি ভুল শুধরানো নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার একটি মৌলিক কাজ। এটি একটি ন্যায়পরায়ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রকৃত অর্থে সর্বসহযোগে দেশ গঠনের প্রথম ধাপ। যখন পাহাড়ের চাকমা যোদ্ধা, সমতলের সাঁওতাল গেরিলা এবং সীমান্তের গারো সাহায্যকারীর গল্প জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে, তখনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার সত্যিকার বহুত্ববাদী ও মানবিক রূপটি পাবে। ইতিহাসের ফাঁক পূরণের এই কাজ শুধু সরকারের একার নয়; এটির দায়িত্ব বর্তায় গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ওপর। কারণ, রাষ্ট্র যদি তার স্মৃতি সংকুচিত করে, তবে সমাজকেই সেই স্মৃতিকে বহন করে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের সকলের দায়িত্ব হলো, এই অগ্রন্থিত সাহসের ইতিহাসকে গ্রন্থিত করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে—বাংলাদেশের মুক্তির লড়াই ছিল সবার এবং এর গৌরবও সবার সমান অধিকার।