Published : 24 Aug 2025, 02:19 AM
সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই কয়েকটি পত্রিকায় প্রদায়ক হিসেবে লেখালেখি শুরু করি। তবে সেসব পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো যোগাযোগ ছিল না। বিভাগীয় সম্পাদক পরিকল্পনা দিতেন এবং লেখা গ্রহণ করতেন। যদিও আমার ইচ্ছে প্রদায়কের বাইরে আরেকটু বাড়তি কিছু করা সাংবাদিক হিসেবে, কিন্তু সেই সুযোগ মেলেনি কোথাও।
একসময় খবর পেলাম ‘দৈনিক মাতৃভূমি’নামে একটি পত্রিকা বের হয়েছে। সেখানে কাজের সুযোগ আছে। পরিচিত একজনের মাধ্যমে দেখা করলাম নির্বাহী সম্পাদক বিভুরঞ্জন সরকারের সঙ্গে। কী নিয়ে কাজ করতে চাই বা লিখতে চাই জানতে চাইলেন। আমার আগ্রহের কথা জেনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে এবং লেখাপড়া পাতায় লিখতে বললেন। পাশাপাশি অন্য কোনো পাতা বা বিভাগে লিখতে চাইলে সেটাও জানাতে বললেন।
আমি আস্তে-ধীরে কাজ শুরু করি এবং কাজ করতে করতে একসময় মাতৃভূমির সাপ্তাহিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার দায়িত্ব আমাকে দিলেন বিভুদা। পাশাপাশি, প্রতিদিনের সম্পাদকীয় বিভাগে একটি ছোট সেকশন থাকত কম্পিউটার ও ইন্টারনেট নিয়ে, সেটিও দেখার দায়িত্ব দিলেন। মাঝেমধ্যে অন্যান্য বিভাগে টুকটাক লিখেছি আগ্রহের কারণে, শিক্ষা নিয়েও লিখেছি দুয়েকটি কলাম।
এমনিতে সম্পাদক, তার ওপর বিভুদা রাশভারী মানুষ। কথা কম বলেন। ফলে, তার সঙ্গে আমার বাড়তি কোনো কথা হতো না। শুধু সপ্তাহে একদিন পুরো পাতা মেকাপ করার পর দেখাতে যেতাম, দেখে তিনি দুয়েকটা বানান ঠিক করে দিতেন কিংবা কিছু পরামর্শ দিতেন। এর বাইরে মাঝেমধ্যে টুকটাক দুয়েকটা দায়িত্ব দিতেন, সেগুলো করতাম। মোটাদাগে এসব কাজের বাইরে বিভুদার সঙ্গে আমার কথা হতো খুবই কম। শুধু এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, যে দুটো বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছিলেন আমাকে, সেগুলো নিয়ে তিনি অন্তত অখুশি নন। তিনি যেসব বিষয় ঠিক করে দিতেন, সেগুলো লক্ষ্য রাখতাম, যাতে পরের বার এই ভুলগুলো না হয়। একবার পরপর দু’সপ্তাহ কোনোধরনের সমস্যা না দেখে বলেছিলেন, আপনার পাতা ভালো হচ্ছে। কথাটি আমাকে শক্তি দিয়েছিল অনেক।
‘দৈনিক মাতৃভূমি’র পর সাপ্তাহিক ‘মৃদুভাষণ’ শুরু করলেন। জুটে গেলাম সেখানেও। বিভুদার সঙ্গে কথা বলা বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে আগে কিছুটা অস্বস্তি কাজ করলেও ততদিনে সেটা কেটে গেছে। মূলত পরিচিত মাতৃভূমির অনেকেই মৃদুভাষণে যোগ দেন। ফলে সেখানে কাজ করা আমার জন্য সহজতর হয়। অনেকের সঙ্গে একজন জুনিয়র সহকর্মী হিসেবে বিভুদার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়। বিশেষ করে মৃদুভাষণের সমস্ত মেকাপের কাজ শেষ হতো সম্ভবত শনিবার রাতে। পরদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় সদ্যপ্রকাশিত সাপ্তাহিকটি নিয়ে সবাই মিলে বেশ আড্ডা হতো।
এই আড্ডায় বিভুদাকে আমি নতুন করে চেনার সুযোগ পাই। তিনি এমনিতে কম কথা বললেও পরিচিতজনদের সঙ্গে আড্ডায় বেশ জমিয়ে কথা বলেন। আমি সেই আড্ডায় থাকি মানে, বিভুদা ও অন্যরা কথা বলেন, আমি শুনি, সময় কাটাই। আমি ছাড়া অন্যরা সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড়, পদে বড়। ফলে, চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে কথা বলার চাইতে আড্ডায় মূলত তাদের কথাই শুনতাম আমি।
বিভুদা বাইরে থেকে গম্ভীর মানুষ, কিন্তু আড্ডায় যারপরনাই সাবলীল ও প্রাণবন্ত। কোনো ঘটনার বর্ণনা দিলে মনে হয় চোখের সামনে ঘটনাটি ঘটছে। একবার তিনি নেপালে যাওয়ার পর তার ক্রেডিট কার্ড কাজ করছিল না। সেই অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার কাহিনি যখন বলছিলেন, মনে হচ্ছিল ঘটনাটি আমি দেখতে পাচ্ছি। এভাবেই বিভুদার সঙ্গে এক সহজ সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে।
লেখালেখির বিষয়ে নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন তিনি আমাকে। আমি একবার সাহস করে মৃদুভাষণে প্রকাশিত সম্ভবত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলামের একটি প্রতিক্রিয়া লিখে বিভুদাকে দেখাই। রাজনীতি নিয়ে লেখা আমার বিষয় নয়, ফলে ধারণা করেছিলাম তিনি হয়তো প্রকাশ করবেন না। কিন্তু, বিভুদা কিছু শব্দ ও বানান ঠিক করে দিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, লেখা ও লেখার স্টাইল ঠিক আছে কি না, না থাকলে তিনি কিছু ঠিক করবেন কিনা? অনেক ছোট হলেও বিভুদা আমাকে আপনি করে বলতেন। সম্ভবত সবাইকেই। আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “আপনার লেখা, আপনার স্টাইল। আপনার স্টাইলে আমি হাত দিতে যাব কেন?”
আমি আগে কখনও ভাবিনি একজন ব্যক্তি হিসেবে আমার আলাদা কোনো স্টাইল থাকতে পারে। “আপনার স্টাইলে আমি হাত দিতে যাব কেন?”–সম্পাদক হিসেবে বিভুদার এই উক্তি মুহূর্তেই আমাকে নিজের কাছে লেখক বানিয়ে দিল; কারণ সেদিন অকস্মাৎ জেনেছিলাম, আমার লেখার একটি স্টাইল আছে।
মৃদুভাষণ-পর্ব শেষ হয় আমাদের। বিভুদার সঙ্গে আমার যোগাযোগ কমে আসে। কালেভদ্রে দেখা হয়। সেই যোগাযোগ হঠাৎ করেই বাড়ে তিনি ‘আজকের পত্রিকা’য় যোগ দেওয়ার পর। আমি ততদিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি। তিনি আমার কাছে মাসে দুটো লেখা চান পত্রিকাটির উপসম্পাদকীয় বিভাগে প্রকাশের জন্য।
আমি সবিনয়ে অপারগতা জানাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘদিন আমি দেশের কয়েকটি বড় প্রিন্ট ও অনলাইন মাধ্যমে নিয়মিত লিখেছি। তখন প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করেছি পত্রিকাগুলোর পক্ষ থেকে কতটা অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়। পত্রিকাগুলো লেখা চায়, কিন্তু লেখা পাঠানোর পর সৌজন্যবশত প্রাপ্তিস্বীকার করে না, লেখা কবে প্রকাশিত হবে বা আদৌ প্রকাশিত হবে কি না সেটাও জানায় না এবং প্রকাশ হলেও জানায় না। যারা সম্পাদনার দায়িত্বে থাকেন, তাদের কাজই লেখকের লেখার খামতিগুলো পূরণ করা বা বানান-বাক্যকে উপযোগী করে তোলা। আমার লেখার ক্ষেত্র শিক্ষা। শিক্ষা ছাড়া আমি অন্য কোনো বিষয় নিয়ে লিখি না। যেখানে যেখানে লেখা দিয়েছি, সবাইকে অনুরোধ করেছি শিক্ষা-বিষয়ে আমার লেখা থেকে কোনো শব্দ বদলাতে হলে আমাকে যেন আগেই জানানো হয়। একটি পত্রিকায় সম্পাদনার নামে যখন আমার লেখার ‘শিক্ষাক্রম’ শব্দটিকে ‘পাঠ্যক্রম’ বানিয়ে ফেলা হয়, তখন সেখানে লেখা বন্ধ করে দিই। আরেকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যখন দেখি, সেখানকার অনেক লেখককে নিয়মিত সম্মানি দেওয়া হয়, আমাকে দেওয়া হয় না, তখন সেখানে লেখা পাঠানো বন্ধ করে দিই। ওখানকার বিভাগীয় সম্পাদক আমাকে বলেছিলেন, আপনি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, লেখালেখির অর্থ তো আপনার দরকার নেই! আমি বলেছিলাম, ঠিক। লেখালেখির অর্থ আমার জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়; কিন্তু আপনি যদি অন্যদের সম্মানি দেন, যাদের অনেকেরই হয়তো এসব লেখালেখি থেকে অর্থপ্রাপ্তি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমাকে বঞ্চিত করবেন কোন কারণে? যদি আপনার প্রতিষ্ঠান আমাকে সম্মানি না-ই দিতে চায়, তাহলে অন্তত সেটা আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলে দেন। আমি কোনো সম্মানি ছাড়াই নিয়মিত লিখব। তিনি আমাকে কিছু জানাননি।
বিভুদার সঙ্গে এই ঘটনাগুলো শেয়ার করে বলি, আমি কোনো পত্রিকা বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব কারণে লিখতে আগ্রহী নই। লেখক হিসেবে ক্ষুদ্র হতে পারি, কিন্তু অসম্মানিত হতে রাজি নই। তিনি আমাকে বললেন, আপনি আমার জন্য লিখুন, আমাদের জন্য লিখুন। বাকিটা আমি দেখব।
গত কয়েক বছরে আমার তাই যে-কয়েকটি লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাকিগুলো মূলত বিভুদার মাধ্যমেই হয়েছে। তিনি কথা রেখেছেন। লেখা পাঠানোর পর প্রাপ্তিস্বীকার যেমন করেছেন, কবে প্রকাশিত হবে জানিয়েছেন। সামান্য কিছু সম্পাদনা করেছেন, কিন্তু শিক্ষাবিষয়ক কোনো শব্দে হাত দেননি। যতটুকু সম্পাদনা করেছেন, তাতে বরং আমার লেখা পরিশীলিত হয়েছে। আমি ‘আজকের পত্রিকা’য় সর্বশেষ লিখেছিলাম গতবছর। দেশের বাইরে থাকায় জানতে চেয়েছিলেন বিল কীভাবে পাঠাবেন। আমার দেওয়া অ্যাকাউন্টে তিনি বিল পাঠিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, অন্যদের বিল না দিলে আমাকে দেওয়ার দরকার নেই। তিনি বলেছিলেন, অন্যদের দিচ্ছি, আপনাকেও পাঠাচ্ছি।
‘আজকের পত্রিকা’র বিশেষ সংখ্যাগুলোতেও তিনি আমাকে নিয়মিত লিখতে বলতেন। সর্বশেষ লিখেছি ২০২৪ সালের ঈদ সংখ্যায়। ২০২১ সালে বিশেষ সংখ্যায় তিনি আমাকে শিক্ষা নিয়ে লিখতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে কিছু লিখতে পারি কিনা। আমি বলেছিলাম, শিক্ষার অগ্রগতি নিয়ে আমার কিছু লেখার নেই, দাদা। কারণ আমি তেমন কোনো অগ্রগতি দেখতে পাই না। আমাদের শিক্ষার বরং অবনতি হচ্ছে। তিনি বললেন, তাহলে সেটাই না হয় লিখুন। পরামর্শ দিতে পারেন— কী করলে শিক্ষার অগ্রগতি হবে।
ওই বিশেষ সংখ্যায় আমি পরে দেখি, প্রায় সবাই নানা সেক্টরে অগ্রগতি নিয়ে লিখেছেন। আমি লিখেছিলাম কী কী অগ্রগতি দরকার সেই বিষয়ে। যা লিখেছিলাম, বিভুদা তা-ই প্রকাশ করেছেন। মূলত লেখার বিভিন্ন বিষয়ে কখনও একমত হয়েছি, কখনও দ্বিমত করেছি, কিন্তু দিনশেষে বিভুদা আমার লেখাকে সম্মান জানিয়েছেন। ফলে, প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় শেষ ক’টি লেখা মূলত বিভুদাকে দিয়েছি আমি।
রাজনৈতিক নানা বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিভুদার মতের সঙ্গে আমার অমিল হয়েছে। শিক্ষা নিয়েও বিভুদার অনেক মতের বিপক্ষে ছিলাম আমি, সেগুলো বলেওছি তাকে। তিনি বলতেন, “তাহলে সেইটাই লিখেন।”
পত্রিকায় আমার লেখালেখির ক্ষেত্রে শুরুটায়, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে শিক্ষার্থী হিসেবে, বিভুদার যে ভূমিকা ছিল, পরবর্তীতে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক হিসেবে, বিভুদার ভূমিকা একই রকম ছিল। তিনি কখনও আমার লেখার বক্তব্য ও টোনে হাত দেননি, বরং ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও আমার বক্তব্যগুলো লিখতে উৎসাহিত করেছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে লেখা-প্রকাশের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন যে অসম্মানের-বলয়ে ছিলাম, সেখান থেকে আমাকে বের করেছেন। বিভুদা না থাকায় হয়তো আগের অবস্থানেই ফিরে যাবো আমি।
ভারাক্রান্ত মনে বিভুদার শেষ লেখাটি পড়েছি। সাংবাদিক হতে চেয়েও ওই মোহ থেকে শেষ পর্যন্ত সরে এসেছি নানাজনের পরামর্শে ও বাস্তবতা দেখে। বিভুদা আমার সাংবাদিকতা জীবনের প্রথম ও সরাসরি সম্পাদক। বিভুদাকে কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আমার জানা নেই; কিন্তু লেখালেখিতে তিনি আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, তার জন্য আমি যে তার কাছে কৃতজ্ঞ, সেটা আমি তাকে কীভাবে জানাই?