Published : 23 Aug 2025, 02:01 AM
বিভুরঞ্জন সরকার, আমাদের বিভুদা, আমার চেয়ে বয়সে চার ক্লাস বড় ছিলেন। আমার মেজো ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন। তবে, তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানুষ হওয়ায় তার সান্নিধ্য আমিই বরং বেশি পেয়েছি।
বিভুদা ছিলেন ১৯৭০ সালের মাধ্যমিক ব্যাচের শিক্ষার্থী। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, একজন বলিষ্ঠ ছাত্রনেতা ছিলেন আমাদের এলাকায়। বোদা, পঞ্চগড় এবং ঠাকুরগাঁওয়ে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং নাট্যকলায়। শিল্পের যতগুলো দিক আছে, সবদিকেই তার নামডাক ছিল। এগুলো দেখে চমকপ্রদ হয়ে আমরা তার পাশে পাশে থাকতাম। তিনিও ছোটদেরকে দারুণভাবে ভালোবাসতেন। আমাদের খেলাঘর করা শিখিয়েছিলেন তিনি। তিনি বাচিক শিল্পী ছিলেন না, তবে কবিতা আবৃত্তিতেও তিনি আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন। মূলত দেয়াল পত্রিকা দিয়ে তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় শুরু হয়। দেয়ালিকা কী জিনিস তিনি প্রথম আমাদের শিখিয়েছিলেন।
বোদা হাইস্কুলটি ছিল তখন প্রায় শতবর্ষী পুরনো। সে সময়ের বোদা হাইস্কুলে তাদের মতো ভালো ছাত্র-ছাত্রী অনেকেই ছিলেন। কিন্তু, আমার কাছে মনে হয়েছে এর চেয়ে ভালো ব্যাচ বোদা হাইস্কুলে আর হয়নি। তার ব্যাচের অন্তত সাত-আটজন পরে ডাক্তার হয়েছেন। কিন্তু, তিনি ছিলেন এই স্কুলের ইতিহাসে আর্টস থেকে প্রথম বিভাগ পাওয়া প্রথম শিক্ষার্থী। এর আগে কেউ ছিলেন না, সেই পাকিস্তান আমলে। এই ব্যাচটাই ছিল পাকিস্তান আমলের শেষ মাধ্যমিক ব্যাচ।
সে সময় তার অন্যান্য বন্ধুরা সবাই বিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও, তিনি কিন্তু কেন যেন বিজ্ঞান ছেড়ে চলে এসেছিলেন মানবিক বিভাগে। তিনি নিজেই অবশ্য বহুবার বলেছেন, অংকটা একটু কম বুঝতেন। তাছাড়া, শিল্প, সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোলে তিনি অনেক পটু ও খুবই পারদর্শী ছিলেন। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য মিলে তার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে তিনিই আসলে সেরা ছিলেন। তার কথাবার্তা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বয়ান—সবকিছুই আমাদের খুবই আকৃষ্ট করত। আমরা বয়সে তার অনেক ছোট। তিনি যখন দশম শ্রেণিতে, আমরা তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। তারপরও আমরা তার সঙ্গে মিশতাম। তিনিও অবারিত আমাদের সঙ্গে মিশতেন, কথাবার্তা বলতেন।
ছাত্র ইউনিয়ন আমরা সে সময় করেছি তার মাধ্যমেই। আমাদের তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কী, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি কী এবং ছাত্র ইউনিয়নের আদর্শ কী, এসব বিষয়ে বোঝাতেন। সে সময় সোভিয়ত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কী সম্পর্ক, সেসব বিষয়েও আমাদের বোঝাতেন। ছাত্র ইউনিয়নের যে বইগুলো ছিল, ‘যে গল্পের শেষ নেই’, ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ এবং আরও অনেক বই তিনি আমাদের পড়তে দিতেন। তখন তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ছিল না। তিনি পড়াতেন, তার কাছে বইয়ের নাম শুনে আমরা বই কিনতাম। প্রগতি প্রকাশনীর বই তিনি আমাদেরকে প্রথম এনে দিয়েছেন। ‘জয়ধ্বনি’ তিনি আমাদের পড়িয়েছেন। এসব মিলিয়েই তিনি আমাদের কাছে সে বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন একজন আইকন।
এছাড়া, শুধু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নয়, তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ড, লাইব্রেরি গঠন, ছাত্রদের বই পড়ানো, শিশুদের নিয়ে খেলাধুলা, এসবের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে কমরেড ফরহাদের স্ত্রী রীনা ফরহাদ বোদায় একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিভুদা সেই উদ্যোগের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। সেখানে অনেক বড় ডাক্তার তিনি সে সময় ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের গ্রামীণ এলাকা বোদাতে। বহু মানুষ সেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা পেয়েছেন। পরে আস্তে আস্তে সেটার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, ৫-৭ বছর চলার পরে।
বিভুদা আমাদের যে বিষয়টি খোলা চোখে, খোলা মনে আমাদের বুঝিয়েছেন, সেটি হলো মানুষকে বই পড়তে হবে। বই পড়ার মধ্য দিয়ে যে মানুষ বড় হতে পারে, মানুষ পৃথিবীকে জানতে পারে, বই যে বন্ধু হিসেবে থাকতে পারে, এটা কিন্তু বিভুদাই প্রথম আমাদের শিখিয়েছিলেন। বিভুদা আমাদের কাছে সামাজিকভাবে অত্যন্ত জরুরি একজন মানুষ ছিলেন। শিল্প-সংস্কৃতির দিক দিয়ে বোদা-পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও এলাকাটা যে অনেক সুস্থ ছিল, এটা বিভুদাদের মতো মানুষদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।
তার সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল; ছিল অত্যন্ত সংস্পর্শ। বোদার অনেক পরিবারের সঙ্গে বিভুদার সম্পর্ক ছিল। তার ফেইসবুকে বোদার অনেক পরিবার নিয়ে তিনি লিখেছেন। এলাকা সম্পর্কে লিখেছেন। বন্ধুদের সম্পর্কে লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছেন।
তিনি বড় ভাই ছিলেন আমাদের। শ্রদ্ধাস্পদ ছিলেন। আসলে বিভুদা আমাদের সঙ্গের সাথী ছিলেন। পান্থজনের সখার মতো ছিলেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সখা ছিলেন। তিনি যে এত বড় ছিলেন বয়সে আমাদের, সেটা আমরা মনে করিনি। তিনিও সেটা মনে করতেন না।
সব জায়গায় তিনি ছিলেন। বোদা-পঞ্চগড় এলাকায় আমাদের কাছে একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদেরকে বই পড়া থেকে শুরু করে, আমাদের খেলাধুলা, আচার-আচরণ সবকিছু তার কাছ থেকে আমাদের শেখা। সাংবাদিকতা যেটা ছিল, সেই নবম-দশম শ্রেণি থেকে তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। তাকে দেখে অনেকেই সাংবাদিকতায় এসেছেন, এমনকি আমাদের অনেক শিক্ষকও। এর পর তো তিনি উচ্চশিক্ষার্থে ঢাকায় চলে গেলেন, আরও বড় হলেন, আরও পরিচিত বাড়ল। জাতীয় মুখ হয়ে উঠলেন। হয়ে উঠলেন সাংবাদিকতার একজন প্রথম শ্রেণির মানুষ।
কমরেড ফরহাদ একবার এমপি হয়েছিলেন। সেসময় বিভুদা রাজনীতিতে যেভাবে জড়িয়েছিলেন সেটা ছিল অভূতপূর্ব। কারণ, কমরেড ফরহাদ যখন দাঁড়িয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশে আমাদের সময়ের সমস্ত ভালো ভালো ছাত্র, যেমন সেলিম ভাই (মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম) থেকে শুরু করে আকরাম ভাই (কাজী আকরাম হোসেন) এবং আরও অনেকেই বোদাতে গিয়েছিলেন। বোদা হয়ে উঠছিল এমন একটি জায়গা, এই এলাকায় ভালো ছাত্র, ভালো পলিটিক্স, ভালো নন্দনশিল্প কাকে বলে, নির্বাচন কাকে বলে, সেটা তারা দেখিয়েছিলেন। বিভুদার মাধ্যমে সেটা হতো এবং সেটা আমরা দেখেছি। আমাদের যে নন্দনশিল্প, পোস্টার লেখা থেকে শুরু করে দেয়াল লিখন—আমাদের শিখিয়েছেন আকরাম ভাই। বিভুদা এই সমস্ত কাজের মধ্যে আমাদেরকে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, কল্পনা করা যায় না। বোদা যেহেতু কমরেড ফরহাদের এলাকা, আন্দোলন হতো জোরদার, সেই আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। লাঙল যার জমি তার—এক সময় কমিউনিস্ট পার্টির একটা স্লোগান ছিল। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির যে পরিমাণ লোক ছিল, ১০টা ইউনিয়নের মধ্যে ৬-৭ জনই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান। বিভুদা এসব নির্বাচনে দারুণ সংগঠকের ভূমিকা পালন করতেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের বিস্তৃতি ঢাকায় যেটা হয়েছে আর বোদা বা ঠাকুরগাঁওতে যেটা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পার্থক্য তো অবশ্যই আছে। বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়েছে, সে সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন ঠাকুরগাঁওতে। সে সময় আমরা ঠাকুরগাঁওতে একটা বাসা ভাড়া করেছিলাম, সেখানে তিনি ছিলেন। সে সময়েও আমাদের যেগুলো জানার ছিল, পড়ার ছিল সেগুলো তিনি আমাদের বলতেন, আমরা পড়তাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
একটা মানুষের জীবনের লক্ষ্য থাকে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া, যেটাকে বলে এস্টাবলিশ হওয়া। জীবনে এস্টাবলিশ হওয়ার ব্যাপার যেটা ছিল, সেটা তিনি রাজনীতি করতে গিয়ে ত্যাগ করেছেন। তিনি এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে ছিলেন না কখনও। একটা প্রতিষ্ঠিত জীবন যাপন করতে হবে—সেটা কোনো সময় তিনি চাননি। আজকে তার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া ‘খোলা চিঠি’তে দেখলাম এস্টাবলিস্টমেন্টের পেছনে না ছোটায় জীবনে স্থিতিশীলতাটুকু তিনি পাননি। তবে, আমার কাছে মনে হয়েছে, আমাদের সমকাল তাকে সেটা দেয়নি।
তার যে মূল্যায়ন হওয়া উচিত ছিল, সমকাল তাকে দিতে পারেনি। সেটাতে তার একটা স্বাভাবিক ক্ষোভ ছিল। তবে এ কথা ঠিক তিনি ইস্টাবলিসমেন্টের বিপক্ষে ছিলেন সবসময়। অল্পতেই তুষ্ট হতেন তিনি। তার কাছে কোনদিনই শুনিনি যে, বড় বড় বিল্ডিং হবে, বড় বড় বাড়ি-গাড়ি হবে। তার মতো মানুষ সেই আমলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার পরও স্টাবলিসমেন্ট পাননি, এটাও কম বিস্ময়কর নয়।
তিনি এত বড় একজন সাংবাদিক ছিলেন, কলামনিস্ট হিসেবে ছিলেন দেশেরই অন্যতম সেরা। ২০-২২টি বই আছে। কিন্তু, ওই কথাটাই আবার বলব যে, আমি মনে করি, সমকাল তাকে সম্মান করতে পারেনি, সমকাল তাকে মূল্য দিতে পারেনি। ফলে, বিরাট একটা ক্ষোভ, একটা কষ্ট রেখে তিনি চলে গেলেন পৃথিবীর বুক থেকে। স্বস্তির খবর একটাই যে, তার মেয়ে ও ছেলে বড় হয়েছে, যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন, এটা বোঝা গেছে তার শেষ লেখা থেকে। কিন্তু, তিনি এই বয়সে এভাবে চলে যাবেন, ভাবাই যায় না!
তার মৃত্যু আমাদের কাছে খুব শোকাবহ, খুবই দুঃখের এবং কষ্টের। তার এই মৃত্যু আমাদের কাছে সত্যিকারের বেদনাদায়ক। বিভুদার এভাবে চলে যাওয়াটা আমাদের এলাকায় মেনে নিতে পারছে না। তাকে আমরা ভুলতে পারি না। ভুলা যায় না। তার মৃত্যুতে বোদাবাসী-পঞ্চগড়বাসী শোকাহত। এটা আমরা বহন করতে পারছি না, আমরা ভুলতে পারছি না। কিন্তু সবকিছু মিলেই তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকল।