Published : 08 Apr 2026, 10:51 AM
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ হরমুজ প্রণালিকে বহুপক্ষীয় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়েছে বা লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে চলাচল স্থগিত রেখেছে। ফলে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র সরবরাহ বিশৃঙ্খলা হিসেবে চিহ্নিত করছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে তিন ধরনের দৃশ্যকল্প সামনে আসে: আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপ, যৌথ সামরিক অপারেশন এবং পর্যায়ক্রমিক সমঝোতা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কয়েকটি কূটনৈতিক পথের মধ্যে অন্যতম হলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতা। যুদ্ধরত এ দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রথম দৃশ্যকল্প: আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপ
প্রথম দৃশ্যকল্পটি একতরফা আঞ্চলিক সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। প্রধানত উপসাগরীয় দেশগুলো এবং জর্ডানের সমন্বিত উদ্যোগে, সরাসরি মার্কিন সম্পৃক্ততা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার জন্য সামরিক অভিযান পরিচালিত হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, কূটনৈতিক পথের অচলায়তন এবং রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে এমন পরিস্থিতি জন্ম নিতে পারে।
তবে এই দৃশ্যকল্প সামরিক অসম সক্ষমতার কারণে সীমিত হয়ে পড়ে। গত দুই দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণ করেছে, তবু ইরানের ধাপে ধাপে বিন্যস্ত অসম হুমকি মোকাবিলায় তাদের সমন্বিত নৌশক্তি, মাইন প্রতিরোধ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় ঘাটতি রয়ে গেছে। তাদের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের স্থিতিশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ, বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইরানের ক্রমাগত পাল্টা হামলার ঝুঁকি থাকায়। এতে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সামরিক সক্ষমতার ওপর ভর করে দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে।
একতরফা আঞ্চলিক পদক্ষেপ উত্তেজনা বৃদ্ধির ধারাও তীব্র করতে পারে। ইরানের অগ্রাসী প্রতিরক্ষা নীতি নির্দেশ করে যে হরমুজ প্রণালির ওপর যে কোনো সামরিক চাপের জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল অবকাঠামো এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় সমরূপ চাপ প্রয়োগ করা হবে।
এই সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিভিন্ন পক্ষগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করছে এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগে কূটনৈতিক পরিসর রক্ষার চেষ্টা করছে। আগাম কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা ছাড়া যদি এই দৃশ্যকল্প বাস্তবায়িত হয়, তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পথ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অবশিষ্ট কূটনৈতিক পথ নিঃশেষ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় দৃশ্যকল্প: মার্কিন ও আঞ্চলিক সম্মিলিত সামরিক পদক্ষেপ
দ্বিতীয় দৃশ্যকল্পটি মার্কিন সমন্বিত দমনমূলক সামরিক প্রচারণার সঙ্গে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর জোটের ইঙ্গিত বহন করে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পুনরায় নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ মার্কিন উদ্যোগ দেখা যেতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের সামরিক ঘাঁটি, রাজনৈতিক সমর্থন এবং আনুষঙ্গিক সামরিক ঐশ্বর্য ব্যবহার করতে মার্কিনিদের অনুমতি দিতে পারে। এছাড়া পরবর্তীতে এই জোটে অন্যান্য দেশও যুক্ত হতে পারে।
এই ধরনের দৃশ্যকল্প দমনমূলক কূটনীতির প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছাড়াই সীমিত শক্তি ব্যবহার করে পরিস্থিতি পরিবর্তন করা হয়। দমনমূলক কূটনীতির ওপর গবেষণা করে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজেন্ডার জর্জ সফলতার তিনটি শর্ত চিহ্নিত করেন: বিশ্বাসযোগ্য সক্ষমতা, প্রতিপক্ষের অপ্রয়োজনীয় খরচ বৃদ্ধি এবং মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে সরে আসার পথ।
মার্কিন ১৫ দফা সমঝোতার প্রস্তাবের জবাবে তেহরানের পাল্টা প্রস্তাব শর্তহীন প্রতিরোধের পরিবর্তে দরকষাকষি মনোভাবের পরিচয় দেয়। এটি দেখায় যে, দমনমূলক কূটনীতির দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত নয়। তবে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ আছে। তাই চলমান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনাভিত্তিক সমাধানের ক্ষেত্রে ইসরায়েল প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে। তাদের আশঙ্কা হলো এই যোগাযোগ ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। ফলস্বরূপ জোটের অভ্যন্তরে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পারস্পরিক আস্থাহীনতা দেখা যেতে পারে।
এই দৃশ্যকল্পে পাকিস্তান পক্ষগুলোর চরম বৈরিতার মধ্যেও যোগাযোগ বজায় রাখতে চাইবে। তার ভূমিকা সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী থেকে কূটনৈতিক নিরপেক্ষতায় রূপ নেবে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার অনন্য সক্ষমতা ইসলামাবাদ রাখে। এমনকি এই ধরনের সামরিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি অত্যাবশ্যকীয় ব্যাকচ্যানেলও তৈরি করবে।
পরিশেষে, একটি মিশ্র কৌশলের উদ্ভব হতে পারে, যেখানে ধারাবাহিক সামরিক চাপের পাশাপাশি পাকিস্তানের মাধ্যমে পরিচালিত পরোক্ষ আলোচনার একটি পৃথক ধারা থাকবে। এর লক্ষ্য হবে ইরানের সম্মান রক্ষা করে হরমুজ প্রণালি থেকে সরে আসা নিশ্চিত করা। বিনিময়ে ইরানের জন্য যাচাইযোগ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ রাখা।
তৃতীয় দৃশ্যকল্প: হরমুজ প্রণালি সুদীর্ঘ কালের জন্য বন্ধ
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য নিকট-ভবিষ্যতের দৃশ্যকল্পটি হলো, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে এবং মাকির্নীদের সঙ্গে দরকষাকষির মঞ্চে হাতিয়ার হিসেবে প্রণালিটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার হুমকি প্রদান করবে। এটি আমেরিকান পণ্ডিত টমাস শেলিং-এর ভাষায় ‘জবরদস্তিমূলক দরকষাকষি’-র ধ্রুপদী উদাহরণ, যেখানে সর্বাত্মক সংঘাতে না জড়িয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য যৌথ ঝুঁকির দক্ষ প্রয়োগ করা হয়।
ইরান বিগত ২৬ মার্চ চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের জাহাজগুলোকে প্রণালিটিতে চলাচলের অনুমতি দিয়ে উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা এই দৃশ্যকল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তেহরান রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগুলোকে আলাদা করে প্রণালিটিতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ধরে রাখে। একদিকে এটি মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে পুরস্কৃত করে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে খোলার সিদ্ধান্ত কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল।
সংকটকালীন দরকষাকষির তাত্ত্বিকরা একে ‘সীমিত তৎপরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষণস্থায়ী ছাড় এবং মৌলিক সুবিধা হারানো ছাড়া প্রতিপক্ষের মনোবল যাচাই করা যায়। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও প্রণালিটির সার্বভৌমত্বের দাবিসহ ইরানের পাল্টা প্রস্তাব একটি চরম অবস্থান তুলে ধরে, যেখান থেকে সেই অবস্থান বজায় রেখেই ছাড় দেয়া সম্ভব।
এই দৃশ্যকল্পে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামাবাদে যে আলোচনা চলছে, তা ঠিক সেই ধরনের সম্মানজনক, উচ্চ পর্যায়ের কিন্তু সম্পৃক্ততার পরোক্ষ কূটনৈতিক পথ, যা ব্যাপক দমনমূলক পরিস্থিতিতে দরকষাকষির জন্য প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই সমাধান হতে পারে ধাপে ধাপে সমঝোতা। এ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ যুক্ত থাকবে। যতটুকু অগ্রগতি হবে, ততটুকুই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি বহুপাক্ষিক নৌ-চলাচল কাঠামো গড়ে তোলা হলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হবে।
এই দৃশ্যকল্পে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, কার্যকর এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থিতিশীল সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এখানে আলোচিত তিনটি দৃশ্যকল্প পরস্পরের বিকল্প কোনো পথ নয়। বরং একই সংকটের মধ্যে এগুলো একযাগে সক্রিয় পরস্পরবিরোধী চাপের প্রতিফলন। তাই নিকট ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পক্ষগুলোর সামরিক সক্ষমতার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া, দমনমূলক বার্তা এবং কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগের ওপর।
তিনটির মধ্যে তৃতীয় দৃশ্যকল্পটি সবচেয়ে সম্ভাব্য। এতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধকে দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে এবং পরোক্ষ আলোচনাও চালু রাখবে। তবে তা সম্ভব হবে যদি পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী চ্যানেল সচল থাকে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটে এমন কোনো ভাঙন সৃষ্টি হওয়া চলবে না, যা সামরিক উত্তেজনাকে দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা আলোচনার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে।
প্রথম ও দ্বিতীয় দৃশ্যকল্প কেবল কূটনীতির চূড়ান্ত ব্যর্থতার ওপর নির্ভরশীল। উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত লাভের তুলনায় উত্তেজনা বৃদ্ধি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
এই সংকটকে শুধু যুদ্ধ বা শান্তির বাইনারিতে সীমাবদ্ধ করে দেখা যাবে না। এটি মূলত একটি কাঠামোবদ্ধ দরকষাকষির পরিস্থিতি। যেখানে সমঝোতার শর্ত, পারস্পরিক দুর্বলতা, মধ্যস্থতার সুযোগ এবং উভয় পক্ষের মর্যাদা রক্ষার উপায় হাজির আছে; তবে সেই ভিত্তি অত্যন্ত নাজুক।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা সচল রাখা, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উত্তেজনা-বিরোধী অবস্থান এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের দরকষাকষির ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ভিত্তি। যা আংশিক হলেও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে পারে।
লেখাটি আলজাজিরা থেকে অনূদিত। এর লেখক ড. নাফজা সাব্বাহ আল-কুয়ারি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক। তার গবেষণার মূল বিষয় হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কূটনীতি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্রমবিকাশমান গতিপ্রকৃতি।