Published : 13 Jul 2025, 05:57 PM
প্রতিটি হত্যাই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। শাস্তিযোগ্য। জুলাই অভ্যুত্থানে আন্দোলন দমনের নামে জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় কেনা বুলেট সেই জনগণের বুকে চালানো যেমন অপরাধ, তেমনি পায়ের রগ কেটে এবং গুলি করে হত্যাও সেরকম অপরাধ। একইভাবে প্রকাশ্যে কাউকে পাথর মেরে হত্যা করাও নৃশংসতার নির্লজ্জ উদাহরণ। কিন্তু পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে একজন ব্যবসায়ীকে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীলরা যেভাবে ও যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, খুলনায় পায়ের রগ কেটে ও গুলি করে যুবদল নেতাকে হত্যা কিংবা কুমিল্লায় মা ও দুই সন্তানকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে তারা ততটা সরব নন। অপরাধ নির্মূলে রাষ্ট্রের এই ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ কীভাবে দেশের ক্ষতি করে, সেটি ব্যাখ্যা করার জন্যই এই লেখা।
সংবাদমাধ্যম বলছে, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গত গত ৯ জুলাই রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের মূল ফটকে জনসমক্ষে মো. সোহাগ নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তাকে দোকান থেকে ধরে নিয়ে কুপিয়ে, পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। একপর্যায়ে পাথর দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে এবং উলঙ্গ করে নির্মমভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এই নৃশংস ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। । দলমত নির্বিশেষে সবাই এরকম বর্বরতার প্রতিবাদ এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
এই ঘটনার দুদিন পরে ১১ জুলাই খুলনার দৌলতপুরে মাহবুবুর রহমান মোল্লা নামে যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করা হয়। তিনি বাসার সামনে নিজের গাড়ি পরিষ্কার করছিলেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে তিনজন এসে মাহবুবকে গুলি এবং দুই পায়ের রগ কেটে হত্যা করে চলে যায়। কিন্তু কারা রগ কেটে হত্যা করে সেই সব পুরোনো বিষয় নিয়ে কিছু আলোচনা সামনে এলেও এই নৃশংস হত্যার ঘটনাটি নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তার কারণ কি এই যে, এই ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ ছিল না? অথচ ঢাকার মিটফোর্ডের নৃশংস ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে গেল ঘটনার দুদিন পরে। এর মধ্য দিয়ে খুলনার ঘটনাটি কি আড়াল করা হলো নাকি আড়াল হয়ে গেল?
প্রস্তর যুগে স্বাগতম
মিটফোর্ডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন: ‘প্রস্তর যুগে স্বাগতম। কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিবেন না, ধন্যবাদ।’ স্বভাবতই তার এই পোস্ট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা শুরু হয়। কেননা যে ঘটনাকে তিনি প্রস্তর যুগ বলছেন, সেই ধরনের ঘটনা গত ৫ অগাস্ট থেকে ঘটছে এবং অসংখ্য মব ভায়োলেন্সের ঘটনায় অভিযোগের তীর আসিফের সতীর্থ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দিকেই গেছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (যাদের একটি অংশ এনসিপি গঠন করেছে), জামায়াত-শিবির, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধেই মূলত মব সন্ত্রাস ও তৌহিদী জনতা নাম দিয়ে নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে।
মিটফোর্ডের এই ঘটনাকে আসিফ মাহমুদ প্রস্তর যুগ বললেও খুলনায় পায়ের রগ কেটে ও গুলি করে যুবদল নেতাকে হত্যার বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। এর সপ্তাহখানেক আগে গত ৩ জুলাই আসিফের এলাকা কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কড়ইবাড়ী গ্রামে ‘মব’ সৃষ্টি করে এক মা ও তার দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা নিয়েও আসিফ ফেইসবুকে কোনো পোস্ট দেননি। তার মানে এখানে তিনি ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করলেন! রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে প্রতিটি অপরাধকেই তার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা এবং প্রতিটি অপরাধের বিষয়ে তার অভিন্ন অবস্থানই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সেটি না করে আসিফ মাহমুদ একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্য দিয়ে মূলত একটি দলের প্রতি তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব্পূর্ণ পদে থাকার কারণে, তাও আবার একটি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা তার কাছ থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকাই মানুষ প্রত্যাশা করে।
কুমিল্লা, খুলনা ও ঢাকার মিটফোর্ডে যখন এই সব ঘটনা ঘটল, একই সময়ে গত শুক্রবার খুৎবা পছন্দ হয়নি বলে চাঁদপুরের একটি মসজিদের ইমামকে কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। আসিফ মাহমুদ বা সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা এই নৃশংসতা নিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বলে মনে হয় না।
মিটফোর্ডের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন কেন?
মিটফোর্ডের নৃশংসতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ব্যবসায়ী সোহাগ চাঁদা না দেওয়ার কারণে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১২ জুলাই ছাত্রদল আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রশ্ন রেখেছেন, ‘প্রকৃত হত্যাকারীকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? কেন কিছু কিছু দল পুরান ঢাকার ঘটনাটিকে ভ্রান্তভাবে উপস্থাপন করছে? যে ছেলেটি মারা গেছে তার সঙ্গে হয়তো যুবদলের সম্পর্ক আছে। কিন্তু যে হত্যা করেছে, অন্য জায়গা থেকে আমরা খবর পেয়েছি...অন্য জায়গা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে তাকে।’
এই ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থতা এবং মামলার এজাহার (এফআইআর) থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নাম বাদ দেওয়াকে ‘আশ্চর্যজনক’ বলে অভিহিত করেছে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল। সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করেছে, এই ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত, যাদের ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরায় স্পষ্ট দেখা গেছে, মামলায় তাদের প্রধান অভিযুক্ত করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাত করেছে, এখনো তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর কারণ বোধগম্য নয়।
মানুষের মনে এই প্রশ্নও আছে যে, ঘটনা ঘটেছে বুধবার সন্ধ্যায়। অথচ এটি প্রকাশ্যে এলো ৪৮ ঘণ্টা পরে। অনেক ছোটখাট সংবাদও যেখানে দ্রুত গণমাধ্যমে আসে এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যায়, এই ঘটনাটি কী করে প্রায় দুদিন আড়ালে থাকল? কারা কীভাবে এটা করলেন? এই প্রশ্নগুলো কেন উঠবে বা কোনো একটি দলকে এই ধরনের প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেওয়া হবে কেন?
আসিফ মাহমুদ কি এটা মনে করেন বা অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণা এমন যে, গত ১১ মাসে দেশে আরও যেসব হত্যা ও মব সৃষ্টি করে নানাবিধ সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো হয়েছে, তার সবগুলো ঘটনার সঙ্গে বিএনপি জড়িত? এটা ঠিক যে, গত ৫ অগাস্টের পর থেকে সারা দেশেই বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুনোখুনির অসংখ্য অভিযোগ এসেছে। কিন্তু সরকার কি এটা অস্বীকার করতে পারবে যে, সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কিছু দল এবং সংগঠন আরও অনেক বড় অপরাধ করেনি বা করছে না? তাদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী?
গত ১১ মাসে সরকার কি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বা করতে চেয়েছে? মানুষের মনে নিরাপত্তার বোধ জন্ম দিতে পেরেছে? মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে পেরেছে? পারেনি। বরং সরকারের অনেকে মব উসকে দিয়েছেন। কেন খুলনার দৌলতপুরে যুবদল নেতাকে পায়ের রগ কেটে ও গুলি করে হত্যার দুদিন পরেও কেন কাউকে গ্রেপ্তার করা গেল না?
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে। খুব ভালো কথা। প্রশ্ন হলো, খুলনার ঘটনাটির বিচার হবে কোন আদালতে? নাকি এই ঘটনার বিচার হবে না বা এই হত্যাগুলো জায়েজ? গত ১১ মাসে আরও যেসব নৃশংসতা হয়েছে, আরও যেসব খুন হয়েছে, যেসব মব সন্ত্রাস হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী?
৯ মাসে ১৩১ খুন ও মবের বৈধতা
গত ২৫ জুন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, মব তৈরি করে মানুষের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে গত ৯ মাসে দেশে অন্তত ১৩১ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দেড় শতাধিক। মূলত মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্বৃত্তরা নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।
আসিফ মাহমুদ নিজে এই সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা। এইসব হত্যার দায় কি তার সরকার এড়াতে পারে? বাংলাদেশে গত ১১ মাস ধরে যা ঘটছে, তা পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক বা ন্যূনতম গণতন্ত্র ও সহনশীলতার চর্চা আছে এমন কোনো দেশে; যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ কিছু দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে কি এই ধরনের ঘটনা কল্পনাও করা যায়?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেউ কেউ এইসব মব সন্ত্রাসকে বৈধতা দিচ্ছেন। তারা এইসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ‘প্রেশার’ বা ‘জনরোষ’ বলে একে মহান করে তুলছেন। সুতরাং, যে দেশের সরকার নিজেই মবের মতো নৃশংসতাকে বৈধতা দেয়, সেই দেশে লোকেরা পাথর মেরে মানুষ হত্যা করবে, রগ কেটে ও গুলি করে মানুষ খুন করবে, খুতবা পছন্দ হয়নি বলে মসজিদে ঢুকে ইমামকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করবে—তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বরং এরকম একটি চরম নৈরাজ্যের মধ্যে কোনো কোনো ঘটনাকে ‘প্রস্তর যুগ’ বলা এবং অন্য ঘটনাগুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাটাই সন্দেহের।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যখন মবকে বলেন প্রেশার, সুনির্দিষ্ট দুয়েকটি ঘটনাকে প্রস্তর যুগ আখ্যা দিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট দলকে আক্রমণ করেন; যখন তারা একটি ঘটনার দ্রুত বিচার করতে চান এবং বাকি ঘটনাগুলোর ব্যাপারে চুপ থাকেন অথবা কৌশলী বক্তব্য দেন—তখন বুঝতে হবে সরকার নিজেই একটি পক্ষ নিয়ে নিয়েছে এবং তারাও কোনো একটি নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাদের পছন্দের দল ও দলসমূহের ক্ষমতায় আসার পথ মসৃণ করতে চাচ্ছে।
অপরাধকে মহিমান্বিত করার মধ্য দিয়ে কিছু হত্যা ও সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়া এবং তার বিপরীতে ‘নিজেদের লোক’ অপরাধ করলে অপরাধগুলোর ব্যাপারে সচেতনভাবে চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করার মধ্য দিয়ে একটি অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি দূরে থাক, জুন মাসেও নির্বাচন হবে না। বরং তফসিল ঘোষণার পরেও এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকবে যা সুষ্ঠু নির্বাচনকে অসম্ভব করে তুলবে।
নির্বাচন অনিশ্চিত করাই লক্ষ্য?
সম্ভবত একটি পক্ষ এখন যেকোনো মূল্যে বা যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনি প্রক্রিয়াটি ব্যাহত করতে চায়। বিশেষ করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে এবং মানুষ সত্যিই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে যাদের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই, তাদের কাছে ভোট হওয়ার চেয়ে না হওয়াই সুবিধাজনক। কেননা ভোটের মধ্য দিয়ে যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে, তখন রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের (যারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না) গুরুত্ব কমে যাবে। তারা নির্বাচন ছাড়াই এখন যেভাবে রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। সুতরাং, তাদের ক্ষমতায় থাকা তথা ক্ষমতা ধরে রাখার উপায় হচ্ছে দুটি; ১. একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোটের ফলাফল অনুকূলে এনে নিজেদের মত ও আদর্শের দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠন করা এবং ২. যে কোনো মূল্যে বা যে কোনো পরিস্থিতি তৈরি করে নির্বাচনটি অধিকতর বিলম্বিত তথা অনিশ্চিত করে তোলা। যদি সত্যিই এই ধরনের কোনো পরিকল্পনা থাকে এবং সরকারের কোনো একটি অংশ যদি এই পরিকল্পনায় সমর্থন দেয়, তাহলে মনে রাখতে হবে, গত ১১ মাস ধরে দেশ যে ধরনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কার ভেতরে রয়েছে, সেটি আরও দীর্ঘায়িত হবে—যা আখেরে অন্তর্বর্তী সরকারকেও স্বস্তিতে রাখবে না। সেরকম পরিস্থিতি কোনো সরকার, কোনো দল এমনকি দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্যই কল্যাণকর হবে না। ফলে যিনি যে দল ও মতের অনুসারীই হোন না কেন, দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারা দেশ পরিচালনা করবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ছেড়ে দিতে হবে জনগণের ওপরেই।
মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে এবং সেই আন্দোলনে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছে, ব্যাপারটা এত সরল নয়। বরং সাধারণ মানুষের রাস্তায় নামার একটি বড় কারণ ছিল ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া—যে অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে শেখ হাসিনা আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। সেই অধিকার ফিরে পাওয়া যাবে, এমন একটি স্বপ্ন নিয়ে যে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তাদেরকে সেই অধিকার ফিরিয়ে না দিলে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গেই প্রতারণা করা হবে।
অর্থাৎ ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রে সংবিধান প্রদত্ত জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠাই ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম অঙ্গীকার। কিন্তু পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বিগত সরকার যেমন উন্নয়নের দোহাই দিয়ে মানুষকে তার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং তাদের প্রধান স্টেকহোল্ডাররাও একইভাবে বিচার ও সংস্কারকে নির্বাচনের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরেই যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করত এবং সেখানে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে মানুষের ওপরেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার ছেড়ে দিত যে, তারা যে দলকে পছন্দ করে সেই দলকে ভোট দেবে এবং তারা সরকার গঠন করবে—তাহলে দেশে ১১ মাস ধরে এই ধরনের নৃশংসতা, নিরাপত্তাহনীতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করতে না।
তবে সরকারের সামনে এখনও সুযোগ আছে। তারা কোনো একটি বা দুটি দলের প্রতি ‘বায়াসড’ না হয়ে বা কোনো ধরনের রাজনৈতিক অভিলাষ বাস্তবায়নের দিকে না গিয়ে জনগণ কাকে ক্ষমতায় দেখতে চায়, সেই সিদ্ধান্তের ভার জনগণের ওপরেই ছেড়ে দেয়ার জন্য দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সেই সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি।