বাল্যবিয়ের চক্র: কৈশোর হারানো ৪৭ শতাংশের গল্প
বাল্যবিয়েকে কেন আমরা ‘নিরাপত্তা হস্তান্তর’ হিসেবে দেখি, আর কীভাবে ভাঙা যাবে এই চক্র?
বাল্যবিয়ের কোনো খবর পড়লে মনে পড়ে স্কুলের পোশাক পরা মেয়েদের কথা। যে বয়সে একটি মেয়ের সকালে বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ও খেলার করার কথা—সেই বয়সেই বাংলাদেশের অসংখ্য মেয়ের পরিচয় পাল্টে যায়। শিক্ষার্থী থেকে স্ত্রী, কিছুদিন পর মা। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্ন সাজানোর কথা যে মেয়েটির, সে নিজের জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বয়সে পৌঁছানোর আগেই অন্যরা তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
বাল্যবিয়েকে প্রায়ই আমরা দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ দিয়ে ব্যাখ্যা করি। কারণগুলো গুরুত্বপূর্ণ, তবে পুরো ছবিটা সেখানে ধরা পড়ে না। অনেক পরিবারে মেয়ের বিয়েকে এখনো একধরনের ‘নিরাপত্তা হস্তান্তর’ হিসেবে দেখা হয়। মা-বাবা মনে করেন, মেয়েকে স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দিতে পারলে তার নিরাপত্তার দায়িত্বও অন্য একটি পরিবারের কাছে চলে গেল। অথচ যে প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার জায়গা ভাবা হচ্ছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির জন্য সেই দাম্পত্যই কখনো কখনো নতুন ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি করে।
মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫—যা জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সহায়তায় পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক জরিপ—তার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। ২০১৯ সালের তুলনায় কিছু উন্নতি হলেও প্রায় প্রতি দুই তরুণীর একজনের বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয়। বাল্যবিয়ে একটি মেয়ের বৈবাহিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার শিক্ষা, চলাফেরা, নিজের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও সংকুচিত করে। শৈশবের স্বাধীন সময় দ্রুত বদলে যায় সংসারের দায়িত্বে।
এখানেই বাল্যবিয়ের একটি কম আলোচিত দিক রয়েছে। আমাদের সমাজে মেয়েদের ‘নিরাপত্তা’ নিয়ে প্রবল উদ্বেগ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা নিয়ে সেই মাত্রার উদ্বেগ দেখা যায় না। একটি কিশোরী একা বিদ্যালয়ে যাবে কি না, কার সঙ্গে কথা বলবে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকবে কি না—এসব নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগের সমাধান হিসেবে অনেক সময় মেয়েটির স্বাধীনতা বাড়ানোর পরিবর্তে তার চলাচল কমানো হয়; শেষে বিয়েকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
ডিজিটাল যুগ এই প্রবণতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিশোর-কিশোরীদের যোগাযোগ এখন পরিবারের চোখের সামনে সীমাবদ্ধ নেই। প্রেমের সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, ছবি ছড়িয়ে পড়ার ভয়, অনলাইন হয়রানি ও পরিবারের ‘সম্মান’ নিয়ে উদ্বেগ অনেক অভিভাবকের মধ্যে বেড়েছে। এসব ঝুঁকির মোকাবিলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা, সন্তানদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক ও যৌনতা বিষয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে মেয়েটিকেই শেষ পর্যন্ত সামাজিক ভয়ের মূল্য দিতে হয়।
বাল্যবিয়ের আরেকটি গভীর সামাজিক চালিকাশক্তি হচ্ছে পরিবারের সম্মানের ধারণা। ছেলের কৈশোরকে আমরা প্রায়ই অনুসন্ধান, ভুল করা ও বেড়ে ওঠার সময় হিসেবে মেনে নিই। মেয়ের কৈশোরের ক্ষেত্রে একই উদারতা দেখা যায় না। তার পোশাক, বন্ধুত্ব, প্রেম, বাইরে যাওয়া, বাড়ি ফেরার সময়, এমনকি তার শরীরও পরিবারের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ফলে কোনো মেয়েকে ঘিরে গুজব তৈরি হলে পরিবার অনেক সময় মেয়েটির পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে বিয়ের আয়োজনকে দ্রুততম সমাধান মনে করে।
এই জায়গায় বাল্যবিয়ে আসলে কেবল দারিদ্র্যের গল্প থাকে না। মধ্যবিত্ত ও তুলনামূলক শিক্ষিত পরিবারেও অল্প বয়সে বিয়ের পেছনে সামাজিক সম্মান, নিরাপত্তার ভয় এবং মেয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ কাজ করতে পারে। ফলে আয় বাড়লেই বাল্যবিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলীন হবে—এমন ধারণা আমাদের ভুল পথে নিতে পারে।
শিক্ষা বাল্যবিয়ে ঠেকাতে বড় সুরক্ষা তৈরি করতে পারে। এমআইসিএসের তথ্যেও শিক্ষার স্তর বাড়ার সঙ্গে বাল্যবিয়ের হার কমতে দেখা যায়। তবে শুধু বিদ্যালয়ে উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়। মেয়েদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবার যখন মেয়ের পড়াশোনার সঙ্গে একটি স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে, তখন বিয়েকেই তার জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য ভাবার প্রবণতাও কমবে।
বাল্যবিয়ের সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতার সম্পর্কও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমআইসিএস ২০২৫-এ নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামীর স্ত্রীকে আঘাত করাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। এখানে উদ্বেগ শুধু সহিংসতার মধ্যে নেই; সহিংসতাকে স্বাভাবিক মনে করার মধ্যেও রয়েছে। একটি মেয়ে যদি কৈশোর থেকেই শুনে বড় হয় যে স্বামীর কথা মানতে হবে, সংসার টিকিয়ে রাখতে কষ্ট সহ্য করতে হবে, নিজের অসম্মতি প্রকাশ করা উচিত নয়—তাহলে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েও সাহায্য চাওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
আইনের জায়গাটিও নতুনভাবে ভাবা প্রয়োজন। আমাদের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের অনেক প্রচেষ্টা বিয়ের দিনকেন্দ্রিক। খবর পাওয়া গেল, প্রশাসন গেল, বিয়ে বন্ধ হলো, ছবি উঠল, সংবাদ প্রকাশিত হলো—তারপর মেয়েটির কী হলো, সেই অনুসরণ খুব কমই জনপরিসরে আসে। আমার কাছে এখানেই আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা। একটি বিয়ে বন্ধ করার পরের ছয় মাস সম্ভবত বিয়ে বন্ধ করার দিনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েটি স্কুলে ফিরল কি না, পরিবার আবার গোপনে বিয়ের চেষ্টা করছে কি না, তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে কি না, বিয়ে বন্ধ হওয়ার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে কি না, তার নিরাপত্তা আছে কি না—এসব অনুসরণের কার্যকর স্থানীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকে একটি দিনের প্রশাসনিক অভিযান থেকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষায় নিয়ে যেতে হবে।
জন্মনিবন্ধন ও বিয়ে নিবন্ধনের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও এখানে জরুরি। বয়স গোপন করার সুযোগ যতদিন থাকবে, আইনকে পাশ কাটানোর পথও থাকবে। তবে শুধু শাস্তি দিয়ে পরিবারকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেললে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। যে পরিবার অর্থনৈতিক চাপের কারণে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছে, তাকে সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। যে পরিবার নিরাপত্তার ভয়ে বিয়ে দিচ্ছে, সেই মেয়ের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। যে মেয়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছে, তাকে আবার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের পথে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
ছেলেদেরও এই পরিবর্তনের অংশ করতে হবে। নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা পুরুষের অধিকার, স্ত্রীর চলাফেরা নির্ধারণ করা স্বামীর ক্ষমতা, মেয়েরা পরিবারের সম্মানের ধারক—এমন ধারণা কৈশোর থেকেই বদলাতে হবে। পরিবার ও বিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়ের জন্য ভিন্ন স্বাধীনতা রেখে শুধু বাল্যবিয়েবিরোধী প্রচার যথেষ্ট নয়। বাল্যবিয়ে একটি মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, নিজের শরীর ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করে। তাই বাল্যবিয়ের হার কমানো মানে কেবল বিয়ের বয়স বাড়ানো নয়; কিশোরীদের স্বাধীন ও পূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা।
৪৭.২ শতাংশকে তাই নিছক একটি সংখ্যা হিসেবে পড়লে চলবে না। এর মধ্যে অসমাপ্ত স্কুলজীবন আছে, অকাল মাতৃত্ব আছে, আর্থিক নির্ভরতা আছে, নিজের পছন্দ স্থগিত রেখে অন্যের সিদ্ধান্তে জীবন শুরু করা অসংখ্য কিশোরীর অভিজ্ঞতা আছে। একটি মেয়ের আঠারোতম জন্মদিন তার বিবাহিত জীবনের কয়েক বছর পূর্তির দিন হয়ে উঠবে, নাকি নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সে প্রবেশের দিন হবে—সেই পার্থক্য তৈরি করবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের চিন্তায়। মেয়েকে নিরাপদ রাখার অর্থ তাকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া নয়। নিরাপত্তার অর্থ এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে সে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে, রাস্তায় চলতে পারবে, বন্ধুত্ব করতে পারবে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে, ভুল থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে।
পরিবারকে তাই বুঝতে হবে, মেয়ের ভবিষ্যৎ বিয়েতে নয়, তার বিকাশে। বাল্যবিয়ের চক্র সত্যিকার অর্থে সেদিনই ভাঙতে শুরু করবে, যেদিন একটি কিশোরীর কৈশোরকে পরিবার আর ‘সামলে রাখার সময়’ হিসেবে দেখবে না; দেখবে তার নিজের মানুষ হয়ে ওঠার সময় হিসেবে।
শাহেদ কায়েস কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com
