Published : 18 Aug 2025, 01:05 PM
বাংলাদেশের মতো ছোট্ট ভূখণ্ডের একটি দেশে ৬২টি ব্যাংক ব্যবসা করছে—এটাকে অনেকেই অস্বাভাবিক এক বাস্তবতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন অনেক দিন ধরে। হাতের পাঁচটি আঙুল যেমন সমান হয় না, তেমনি ব্যাংকগুলোও সমানভাবে সফল হবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন কিছু কিছু ব্যাংক সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে? সরকার তো মূলত করদাতাদের টাকায় টিকে থাকে, তাহলে ব্যর্থ আর দুর্বল ব্যাংক বাঁচাতে কেন এই তৎপরতা? আসলে যে কোনো ব্যাংকের দায়ও সরকারের, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এগুলোর ব্যর্থতার ফলে আমানতকারীরা পড়েছেন সংকটে। তাই তো সরকার সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকেই সুরক্ষিত করতে একীভূতকরণের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে শিগগিরই।
সরলভাবে বলতে গেলে, ব্যাংক একীভূতকরণ মানে হলো—দুটি বা তার বেশি ব্যাংক তাদের আলাদা পরিচয় ও কার্যক্রম ছেড়ে একত্র হয়ে একটি বড়, শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রয়াস।
একীভূতকরণের মৌলিক ধারণাটিকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় মার্জার বা অ্যাকুইজিশন। যদিও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, দুটোই মূলত ব্যাংক একীভূতকরণের রূপ মাত্র। মার্জারের ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক ব্যাংক তাদের নিজস্ব নাম, পরিচয় এবং স্বাধীনতা ত্যাগ করে নতুন একটি ব্যাংক গঠন করে একত্র হয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পুরনো ব্যাংকগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং নতুন একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় যা তাদের সব সম্পদ, দায়-দায়িত্ব ও কার্যক্রম নিজের মধ্যে ধারণ করে।
অ্যাকুইজিশন বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় একটি বড় ও শক্তিশালী ব্যাংক দুর্বল বা ছোট একটি ব্যাংককে কিনে নেয় বা নিয়ন্ত্রণে আনে। অর্থাৎ বড় ব্যাংকটি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ ও দায়ভার নিয়ে তার অধীনে নিয়ে আসে। এতে দুর্বল ব্যাংকটির স্বাধীনতা হারিয়ে যায়, কিন্তু বড় ব্যাংকের ছত্রছায়ায় তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত এই দুই প্রক্রিয়ার মিশ্রণই ঘটে থাকে, যেখানে একটি বড় ব্যাংক নিজেকে আরও শক্তিশালী করতে দুর্বল কিংবা ছোট ব্যাংকগুলোকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। এর ফলে ঐক্যবদ্ধ ব্যাংকটি আর্থিক ও পরিচালনাগত দিক থেকে অনেক বেশি সক্ষম হয়।
একীভূতকরণ কেন জরুরি?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা জটিল সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এসব সমস্যার কারণে অনেক ব্যাংক তাদের মূল দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপক বেড়ে গেছে, যা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে ফেলেছে। খেলাপি ঋণ বলতে বোঝায় ওই ঋণগুলো যেগুলো গ্রাহকরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত দিতে পারেনি।
এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
একাধিক দুর্বল ব্যাংককে শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে যুক্ত করে, তাদের আর্থিক অবস্থা সুদৃঢ় করা এবং দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করা।
ব্যাংকগুলোতে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ে।
বেশিরভাগ ব্যাংক দুর্বল হলে প্রতিযোগিতা কমে যায়, যা খারাপ। একীভূতকরণের মাধ্যমে কিছু বড় ব্যাংক গড়ে ওঠার ফলে বাজারে সুষ্ঠু ও কার্যকর প্রতিযোগিতা জন্মায়।
ব্যাংক একীভূতকরণ জটিল প্রক্রিয়া। এটি শুধু ব্যাংক একত্র হওয়ার বিষয় নয়, বরং প্রশাসনিক, আইনগত, আর্থিক ও মানবসম্পদ বিষয়ক কাজও জড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশে এটি সাবধানে করা হয় যাতে অর্থনীতি ও গ্রাহক, কর্মী সুরক্ষিত থাকে। সরকার সম্প্রতি ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করেছে। এতে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী ব্যাংক কোম্পানি আইনে দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা থাকায় এই নতুন আইন আনা হয়েছে, যা বিশ্বের অনেক দেশেও প্রচলিত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈশ্বিক অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি ও আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং পরিচালিত ফরেনসিক অডিটে দুর্বল আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুনে এই পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সম্পদ গুণগত মান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ পূর্বে ঘোষিত সংখ্যার চার গুণ বেশি। একীভূতকরণ শুরু হলে ব্যাংকগুলোকে অস্থায়ীভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হবে।
অধ্যাদেশটি দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করছে।
বিশ্বব্যাপী ব্যাংক একীভূতকরণের সফল চিত্র
· ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০০টির বেশি ব্যাংক একীভূত হয়েছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
· ২০২৩ সালে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক একীভূতকরণের ফলে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার মূলধন সুরক্ষা পায়।
· ভারতীয় একীভূত ব্যাংকগুলোর ঋণদানের ক্ষমতা ২০%-৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার কেন একীভূতকরণে কঠোর?
অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন: যখন বাজারে অনেক ছোট ছোট ব্যাংক থাকে, তখন তারা টিকে থাকতে অধিক ঝুঁকি নিয়ে উচ্চ রিটার্নের সুযোগ খুঁজে নেয়। এর ফলে অনেক ব্যাংক নিয়মবিরোধী বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেয়, যার ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২ সালের ব্যাংকিং রিপোর্টে দেখা গেছে দেশের খেলাপি ঋণের প্রায় ২০% বৃদ্ধি হয়েছে, যা মূলত ছোট ও মাঝারি ব্যাংকগুলোর অসচেতন ঋণদানের কারণে।
মূলধনের ঘাটতি: ছোট ব্যাংকগুলোকে বড় ব্যাংকের তুলনায় মূলধনের প্রয়োজন বেশি হয়। কিন্তু বাজারে এতগুলো ব্যাংক থাকা মানে মূলধন অনেকখানি ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে অনেক ব্যাংক পর্যাপ্ত মূলধন রাখতে পারেনা, যা তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে।
সেবা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব: বড় ব্যাংকগুলো উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক সেবা প্রদান করতে সক্ষম হলেও ছোট ব্যাংকগুলো তাদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সেবা বৃদ্ধিতে অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। এতে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা খারাপ হয়।
গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা কমে যাওয়া: খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি, পরিচালনাগত দুর্বলতা এবং ব্যাংকের সংকটজনিত খবরের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সিস্টেমের প্রতি আস্থা অনেকাংশে কমে গেছে। এতে ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এছাড়াও যে কারণগুলো সরকারকে কঠোর হতে ভূমিকা রেখেছে-
বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক রিপোর্ট (২০২৫ সালের প্রথম কোয়ার্টার) অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ত্রৈমাসিক থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ৩৪.৮১% বেড়েছে (২০২৪ সালের শেষ কোয়ার্টার থেকে ২০২৫ সালের প্রথম কোয়ার্টার পর্যন্ত)
ছোট ও মাঝারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার গড়ে ১২%-১৫%, যেখানে বড় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ মাত্র ৫%-৭%।
দেশব্যাপী ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের মাত্রা বেড়ে ২০% হলেও তা মূলত বড় ব্যাংকগুলোতেই সীমাবদ্ধ।
একীভূতকরণের বিরুদ্ধে উদ্বেগ
ব্যাংক একীভূতকরণ যে শুধু সমাধান নয়, অনেক সময়েই এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষ থেকে আপত্তি ও উদ্বেগ ওঠে। এই আপত্তিগুলো সাধারণত ব্যাংকের গ্রাহক, কর্মী, শেয়ারহোল্ডার এবং বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা যায়। কেন এই আপত্তি সৃষ্টি হয়, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
আমানতের নিরাপত্তা: গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো তাদের অর্থ ও আমানত নিরাপদ থাকবে কিনা। ব্যাংক একীভূত হলে তারা উদ্বিগ্ন থাকেন যে সেবার মান কমবে বা আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
চাকরির নিরাপত্তা: একীভূতকরণের ফলে কর্মীরা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। বড় ব্যাংক একত্রিত হলে ছাঁটাই বা পুনর্বিন্যাস হতে পারে বলে ভাবা হয়। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক তিন বছর পর্যন্ত ছাঁটাই নিষিদ্ধ করেছে, তবুও এই আশঙ্কা থাকে।
স্বাধীনতা হারানোর ভয়: কিছু ব্যাংক একীভূতকরণে রাজি হয় না, কারণ তারা নিজের পরিচয় ও স্বাধীনতা হারানোর ভয় পায়। ব্র্যান্ড, পরিচালন ব্যবস্থা ও শেয়ারহোল্ডার নিয়ন্ত্রণে তারা গর্ববোধ করেন। বড় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
বাজারে একচেটিয়া পরিস্থিতি: একাধিক ব্যাংক একীভূত হলে কিছু বড় ব্যাংক একচেটিয়া বা মনোপলি করতে পারে। এতে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং গ্রাহকের সুবিধা সীমিত হতে পারে, যা উদ্বেগের বিষয়।
একীভূতকরণের প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
ব্যাংক একীভূতকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া যা সফলভাবে সম্পন্ন করার পথে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা আসে। এই চ্যালেঞ্জগুলো ঠিকভাবে মোকাবেলা না করলে একীভূতকরণের সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। নিচে প্রধান কিছু চ্যালেঞ্জের উল্লেখ করা হলো:
· দুর্বল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
· ভিন্ন ব্যাংকের কাজের ধরন ও সংস্কৃতি মেলানো কঠিন।
· রাজনৈতিক প্রভাব বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে।
· বিভিন্ন ব্যাংকের কম্পিউটার ও হিসাব পদ্ধতি একত্র করা জটিল।
· নতুন ভূমিকা ও পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।
ব্যাংক একীভূতকরণের সুবিধা
ব্যাংক একীভূতকরণের সুবিধাসমূহ-
· শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যা দূর হয়।
· বড় ব্যাংকগুলোর উন্নত প্রযুক্তি ও সেবা ছোট ব্যাংকেও পৌঁছে।
· শাখা ও কর্মী পুনর্বিন্যাসের ফলে খরচ কমে।
· বড় ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
· স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়।
যেমন, ২০০০ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক একত্র হয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ গঠন করে। বর্তমানে বহুজাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক উদ্যোগগুলোর একটি। ২০০১ সালে ব্যাংক অব নোভা স্কটিয়ার ব্যাংক এশিয়াকে অধিগ্রহণ করে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ। এখন ব্যাংক এশিয়া দেশের অন্যতম সফল ব্যাংক।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য ব্যাংক একীভূতকরণ এখন সময়ের দাবি নয়, অপরিহার্য। পথে অনেক সমস্যা আসবেই, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস আর দেশের উন্নয়নের দায়বদ্ধতা থাকলে কোনো বাধাই অতিক্রমযোগ্য নয়। ব্যাংক একীভূত হলে ব্যাংকের সংখ্যা কমবে না বরং একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে। এটি দেশের অর্থনীতিকে দৃঢ় করবে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও স্বপ্নের ওপর প্রভাব ফেলবে।