নির্বাচন, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের শর্ত

নির্বাচনে সবদলের অংশগ্রহণকে যেমন গণতন্ত্রের অংশ বলে অবহিত করা হচ্ছে, তেমনিভাবে সংখ্যালঘুরা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তাদের পছন্দের দলকে ভোট দিয়ে নিরাপদ থাকতে পারে সে ব্যবস্থা সুনিশ্চিত থাকাও গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

কামরুল হাসান বাদলকামরুল হাসান বাদল
Published : 26 Nov 2023, 09:14 AM
Updated : 26 Nov 2023, 09:14 AM

ভোট সংখ্যালঘুদের কাছে বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে—২০ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলো মনে করিয়ে দিয়েছে পুরোনো সত্যটা।

শুধু ২০ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে নয়, এর আগে ১১ অক্টোবর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও গুজব নিয়ে বিশেষ নজর রাখা এবং নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা নির্বাচনের দুদিন আগে থেকে পরের ১৫ দিন পর্যন্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে পুলিশ, আনসার ইত্যাদি মোতায়েনের পাশাপাশি বিজিবি ও ব্যাবের টহল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। নির্বাচনের আগে ও পরে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করার দাবিও জানানো হয় ২০ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে এবং ১১ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে।

সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় নেওয়া যাবতীয় পদক্ষেপের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতা, নির্বাচনের প্রার্থীসহ সমর্থককে জানানো এবং রেডিও, টেলিভিশনে তা জনগণের জানার জন্য প্রচার করার দাবি জানানো হয়। নির্বাচনী প্রচারকাজে সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বিবৃতি, মিথ্যা-গুজব প্রচার বা এ ধরনের যাবতীয় প্রচারণা বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। দাবিগুলোও অন্যায্য নয়। কারণ স্বাধীনতার পর যত নির্বাচন হয়েছে তার আগে-পরে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, তদন্ত হলেও অপরাধীদের বিচার হয়নি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট জয়লাভ করার পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন চালানো হয় তার কোনো নজির নেই দেশে। ১৯৭০-এর নির্বাচন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করে। ১৯৭১ সালে প্রথমবারের মতো বাঙালির নিজের স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বমাঝে স্বীকৃত হয়। এই পরিচয় ৫২ বছরে পদার্পণ করেছে। কিন্তু জাতির একটি অংশের কাছে ভোট আসে আতঙ্ক হয়ে।

পাকিস্তান ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র ভেঙে জন্ম নিল বাংলাদেশ নামক একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এদেশ মুক্ত ও স্বাধীন করতে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ দেশের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর লোকও যুদ্ধ করেছে, রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও এদেশ সকল ধর্মের মানুষের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রের মূলস্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরে দেশের ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ’৭৫-এর ১৫ অগাস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার আগে পর্যন্ত রাষ্ট্র তার নির্দিষ্ট ও সঠিক পথেই অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু এর পরে দুঃখজনকভাবে ধর্মীয় রাজনীতি অবারিত করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এমনকি শাহ আজিজের মতো একজন কুখ্যাত রাজাকারকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে ফেলেন জিয়াউর রহমান। তিনি সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দেন। বাদ দেন সমাজতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকেও। এরপর থেকে সমাজে ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটে। এই সাম্প্রদায়িকতা সশস্ত্র জঙ্গিবাদে রূপ লাভ করে তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে (২০০১-২০০৬)।

মাঝখানে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন আরেক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ  এরশাদ। তাঁর আমলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ও সাপ্তাহিক ছুটি রোববারের বদলে শুক্রবার করা হয়। তাঁর শাসনমলেও দেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটে। তখন এদেশে হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এইভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দীর্ঘদিন সাম্প্রদায়িকতাকে লালন ও প্রশ্রয় দেওয়ার কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এর বিস্তার ঘটেছে ভীষণ বিপজ্জনকভাবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে দেশে যে কোনো নির্বাচনে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হাতে। সে নির্বাচন ইউনিয়ন পরিষদ হোক আর জাতীয় নির্বাচনই হোক। নির্বাচনের পরপরই আক্রান্ত হয় হিন্দুরা। এখন হিন্দুদের কাছে মহা আতঙ্ক হয়ে উঠেছে নির্বাচন।

ধর্ম-ভাষা বা জাতিগত কারণে মানুষকে গৌণ করে তোলা। তাদের সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা এক প্রকার অসভ্যতাই বটে। সভ্যতা ও আধুনিকতা হচ্ছে মানুষ পরিচিত ও বিচার্য করে তার সততা, সৎগুণ ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে। ধর্ম দিয়ে কখনো নয়। ধর্ম তার একান্ত নিজস্ব বিশ্বাসের ব্যাপার। এ নিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা জরুরি নয়। রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের জন্য সমান আচরণ করবে। বাংলাদেশের মহান সংবিধানেও তাই উল্লেখ আছে। এক সময় প্রায় কাছাকাছি সংখ্যানুপাতে থাকা সংখ্যালঘুর সংখ্যা এখন ৯ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ’৪৭-এর পর থেকে তাদের দেশত্যাগ চলছে। আর প্রতিটি নির্বাচন নতুন করে দেশত্যাগের প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর দু দশক চললে দেশ সংখ্যালঘু শূন্য হয়ে পড়বে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের উদার গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি। হারিয়ে যাবে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র। দেশ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথ সুগম হবে।

নির্বাচনে সবদলের অংশগ্রহণকে যেমন গণতন্ত্রের অংশ বলে অবহিত করা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে তেমনিভাবে সংখ্যালঘুরা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তাদের পছন্দের দলকে ভোট দিয়ে নিরাপদ থাকতে পারে সে ব্যবস্থা সুনিশ্চিত থাকাও গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত সে কথা যেন ভুলে না যাই।