Published : 01 May 2026, 07:26 PM
‘কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের সন্তান জামায়াত করতে পারে না’—বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের এমন মন্তব্যকে ঘিরে ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে যে হট্টগোল তৈরি হয়, সেটি থামাতে স্বয়ং স্পিকারকে উঠে দাঁড়াতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, সংসদের কার্যক্রম প্রায় ১০ মিনিটের জন্য থমকে যায়। শুধু তাই নয়, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ মনে করিয়ে দেন যে, তিনি দাঁড়ালে সদস্যদের বসে পড়া উচিত। সদস্যদের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যারা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে? যদি চেয়ারের প্রতি এই সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোন রেসপেক্ট থাকবে?’
যেকোনো বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, এমনকি সেই বিতর্ক ও বিরোধিতার জেরে বিরোধী দলের ওয়াকআউট করাও সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার অংশ। কিন্তু এটা মানতে হবে যে, সংসদের স্পিকার অত্যন্ত সম্মানীয় একজন মানুষ। সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলের সদস্যরা তাঁকে মান্য করবেন, এটিই কাঙ্ক্ষিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত ২৮ এপ্রিল পরিস্থিতি কেন এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠল যে, স্পিকার বারবার থামতে বলার পরেও সংসদ সদস্যরা থামছিলেন না এবং স্পিকারের চেয়ার ছেড়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে উঠে দাঁড়াতে হলো?
হট্টগোলের শুরুটা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।’
ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা। বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ করেন। এ সময় ফ্লোর নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিভক্তি সৃষ্টি না করার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘আমার মাঝেমধ্যে শুনতে ভালো লাগে যখন বিরোধী নেতা বলেন যে, তিনি শহীদ পরিবারের সন্তান। আমরা এটাকে ধারণ করি। কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী দলে আছেন। নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।’
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরেও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে আলোচনা শেষ হয়নি। এদিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধই। মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্লেস করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধ একদিকে, আর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের যত আন্দোলন হবে সবগুলো অন্যদিকে। শুধু বট বাহিনী দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষকে ছোট করে আজেবাজে কথা বলে ভাইরাল হয়ে রাজনীতি হয় না। যদি ৭১ সালে ফেইসবুক থাকত, যদি ৭১ সালে সোশ্যাল মিডিয়া থাকত, তাহলে হয়তো দেশ স্বাধীন হতো কি না—আমরা জানি না।’
এবারের সংসদ অবশ্য ভিন্ন। এবার সংসদে যারা সরকারি ও বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, তারা সবাই পরোক্ষভাবে একই পক্ষের। অর্থাৎ জুলাই অভ্যুত্থানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেসব দল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল, সেই দলগুলোই এবার সংসদে আছে। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব ত্রয়োদশ সংসদে নেই। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিকে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির নেতা আন্দালিভ রহমান পার্থ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, এটা ‘ফ্যাসিস্টমুক্ত সংসদ’।
তার মানে এবারের সংসদে যারা আছেন, তারা সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযোগী। যদি তাই হয়, তাহলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে কেন এমন হট্টগোল তৈরি হলো, যে কারণে স্বয়ং স্পিকারকে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে রুলিং দিতে হলো?
প্রসঙ্গত, ৩০ এপ্রিল রাতে ত্রয়োদশ সংসদের যে প্রথম অধিবেশন শেষ হলো, সেখানে মোট কার্যদিবস ছিল ২৫টি। আর এই অধিবেশনজুড়েই ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ, রাজাকার, বঙ্গবন্ধু, বাহাত্তরের সংবিধান ইত্যাদি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন।
বিভিন্ন ঘটনায় এটা মনে হয়েছে যে, ১৯৭১ প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিশেষ কোনো বিরোধ নেই। যেমন—ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরুর দিনেই মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ড পাওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া কয়েকজন জামায়াত নেতার জন্য শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। শুধু তাই নয়, এই প্রস্তাবটি এনেছিলেন স্বয়ং চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং স্পিকার তা অনুমোদন করেন।
কখনো মনে হয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধটা বেশ প্রকাশ্য। বিশেষ করে যখনই ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তখনই হট্টগোল তৈরি হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের সংসদ সদস্যদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বা এ বিষয়ে তাদের মধ্যে সদ্য শেষ হওয়া সংসদ অধিবেশনে কোনো বাহাস হয়নি। বরং বিরোধীদলীয় নেতা তাঁর বক্তব্যে বেশ কয়েকবার জিয়াউর রহমানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে জামায়াতের কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি। বরং তাঁর ভাষায়: ১৯৭১ সালে কোন দল কী করেছে, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন, এটা যেমন সত্য; তেমনি ১৯৭১ সালে জামায়াত ও অন্যান্য দলগুলোর কী ভূমিকা ছিল, তাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলে জামায়াতে ইসলামীর দায়মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া আইনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের যে সংজ্ঞা বলা হয়েছে, সেখানেও এটা স্পষ্ট যে, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। সুতরাং এই ইস্যুতে বিতর্ক করা মানেই হলো একটা প্রতিষ্ঠিত সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠা করা।
মূলত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৭১ প্রসঙ্গে যেসব হট্টগোল হলো, তার প্রধান কারণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াত এবং তাদের অনুসারী দল ও ব্যক্তিদের নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে গণহত্যার সহযোগী হিসেবে তাদের বিতর্কিত ভূমিকা আড়াল করা এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা খাটো করা; মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে যে মানুষটির নামে, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অসম্মানিত করা। এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনীতির অংশ। সুতরাং জিয়াউর রহমানের মতো একজন বীর উত্তমের হাতে গড়া দল বিএনপির পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিভ্রান্তিকর বয়ান ও মনগড়া ইতিহাস মেনে নেয়া কঠিন।
প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টই বলেছেন, একাত্তরকে কটাক্ষ করলে সেটা মেনে নেয়া সম্ভব নয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুতে বিতর্ক হবে এবং দেশে জ্বালানি, নিত্যপণ্যের বাজার, হামসহ অনেক জরুরি বিষয় থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসের মীমাংসিত বিষয় নিয়ে সংসদের সময় অপচয় করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বিতর্কটা এড়ানো যেত যদি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পরে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যগুলো নির্মমভাবে ভাঙা না হতো।
শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে তাঁর বাবার ওপর প্রতিশোধ নেয়া এবং বঙ্গবন্ধুকেও ফ্যাসিবাদের জনক আখ্যা দিয়ে তাঁর সারা জীবনের লড়াই-সংগ্রামকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল অভ্যুত্থানের পরপর এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছরজুড়ে মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেসব ন্যক্কারজনক কাজ হয়েছে, সেখান থেকে দ্রুত বের হয়ে আসা কঠিন।
প্রথম সংসদের সমাপনী ভাষণেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। কিন্তু বিতর্ক চলছে। তার কারণ জামায়াত এবং তাদের অনুসারী দল ও ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এই অধিবেশনেই তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, একাত্তরের গণহত্যার প্রশ্নে জামায়াত যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিয়ে বিতর্ক থাকবেই। অধিবেশনের সমাপনী দিনে বিএনপির সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার কারণে জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ক্ষমা চাইলে মানুষ মহৎ হয়।
জামায়াতের আমির অবশ্য জাতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সেটা কৌশলে। তিনি বলেছেন, ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত তাদের আচরণে ও কর্মকাণ্ডে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তারা ক্ষমাপ্রার্থী। অর্থাৎ তিনি বা তাঁর দল ১৯৭১ সাল উল্লেখ করে ক্ষমা চান না এবং বলেন: ‘যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন’। তার মানে ১৯৭১ সালে এই দেশে যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, লাখো নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটিয়েছে, অগণিত মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, তাদের নারকীয় তাণ্ডবের হাত থেকে বাঁচতে ভারতের শরণার্থী শিবিরে গিয়ে ক্ষুধা, অপুষ্টি আর অসুখে যে লাখ লাখ মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে—সে বিষয়টি জামায়াতের আমির উল্লেখ না করে বলছেন, ‘যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন’। অর্থাৎ কষ্ট নাও পেতে পারেন। এরকম ধোঁয়াশা অবস্থান থাকলে ইতিহাসের কোনো সত্যেরই মীমাংসা হবে না। বইপত্র আর সরকারি নথিতে মীমাংসা হলেও রাজনীতির মাঠ ও সংসদে বরফ গলবে না।
পরিশেষে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে একটি কঠিন সময়ে। সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশার চাপ ভীষণ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশ যে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল এবং জনমনে যে মব সন্ত্রাসের ভীতি ছিল, নির্বাচিত সরকারের আমলে মানুষ সেই অনিশ্চয়তা ও ভয় থেকে মুক্তি পাবে—এই প্রত্যাশা তাদের মনে আছে। সুতরাং সরকারের উচিত এখন জনতুষ্টিবাদী কাজে বেশি মনোযোগ না দিয়ে এবং ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত বিষয়ে নতুন বয়ান উৎপাদন ও প্রতিষ্ঠার সুযোগ না দিয়ে জাতীয় জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং সেই অগ্রাধিকার অনুযায়ী দেশকে এগিয়ে নেয়া। বিরোধী দলেরও উচিত দেশের অর্থনীতি ঠিক করা এবং নাগরিকদের মনে নিশ্চয়তার বোধ তৈরিতে সরকারের সহযোগিতা করা। এর বাইরে অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের আরও অনেক সময় পাওয়া যাবে।