Published : 28 Apr 2026, 02:40 AM
অনেকটা প্রত্যাশিতভাবেই ২৬ এপ্রিল বাতিল করা হলো সংসদ সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা। কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে পাস হয়ে যায় ‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউয়েন্স) (অ্যামেন্ডমেন্ট) ১৯৭৩’ আইনটি। এর ফলে সংসদ সদস্যদের জন্য বহুল আলোচিত-সমালোচিত সুবিধাটি বাতিল হয়ে গেল। এখন থেকে কোনো সংসদ সদস্য শুল্ক ছাড়া বিদেশ থেকে কোনো প্রকার গাড়ি আমদানি করতে পারবেন না।
এই সুবিধা বাতিলের অন্যতম কারণ হলো দেশের ‘সুশীল সমাজ’ এবং সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা। নির্বাচনের আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ঘোষণা করেছিলেন যে, নির্বাচিত হলে তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং ঢাকায় কোনো প্লট নেবেন না। নির্বাচনের পরপরই প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক পরাজিত প্রার্থী ঘোষণা করেন, তার দল শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা নেবে না।
তার এই ঘোষণার পর বিএনপির সংসদীয় বৈঠকে জানানো হয়, তারাও শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা নেবেন না। বিষয়টি এ পর্যন্তই ছিল। কিন্তু গত বুধবার সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি সুবিধা চাইলে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। তবে তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা চাননি।
তার এই বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় সমালোচনা। বলা হয়, নির্বাচনের আগে শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা না নেওয়ার কথা বলে সংসদ সদস্য হওয়ার পর এখন গাড়ি সুবিধা চাচ্ছেন হাসনাত। বৃহস্পতিবার ব্যক্তিগত কৈফিয়ত (বিধি বহির্ভূত) দিতে গিয়ে তিনি বলেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে মিডিয়ায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সংসদে বক্তৃতায় এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, যেভাবে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ডিসি, ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড সরকারি গাড়ির সুবিধা পেয়ে থাকেন, সংসদ সদস্যদেরও সেভাবে গাড়ি সুবিধা দেওয়া হোক। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, তারা শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা নেবেন না।
তার বক্তব্যের পর সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সদস্যদের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা বাতিল করা হবে। ওই অনুসারে ২৬ এপ্রিল রোববার সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সুবিধাটি বাতিল করা হয়।
ঘটনা যেভাবে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয় হাসনাত আব্দুল্লাহ যেভাবে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি সুবিধা চাচ্ছেন, সরকার হয়তো সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। যদি সরকার তা-ই করে, তবে এর প্রভাব হবে অনেক গভীর।
ডিসি, ইউএনও ও এসি ল্যান্ড পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তাদের গাড়ির সুবিধা দেওয়া হয় সরকারিভাবে, ‘সরকারি পরিবহন পুলের’ মাধ্যমে। এই ব্যবস্থায় গাড়ি ক্রয়, স্থায়ী গাড়ি চালক নিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ এবং মেরামত—সবই সরকারি খরচে করা হয়। কর্মকর্তারা কেবল সেবা গ্রহণ করে থাকেন।
আপাতদৃষ্টিতে শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা প্রদানের চেয়ে এই প্রস্তাবনা ভালো মনে হতে পারে। কিন্তু প্রচলিত সমালোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিল করে হয়তো রাষ্ট্রের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছি আমরা।
একটু খোলাসা করা যাক। শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধার ফলে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রের কিছু শুল্ক ছাড় পেয়ে থাকেন মাত্র। যেমন, একটি বিলাসবহুল গাড়ির বিপরীতে যদি ১০০০ শতাংশ বা ১৫০০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত থাকে, তবে জাপান বা জার্মানিতে যে গাড়ির দাম ১ কোটি টাকা, তা আমদানি করলে একজন সংসদ সদস্য ১৫ কোটি টাকা শুল্ক মওকুফ পান। সব সংসদ সদস্য অতি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেন না; অধিকাংশ সংসদ সদস্য ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার গাড়ি আমদানি করেন, যেগুলোর শুল্ক অত বেশি নয়।
এখন দেখতে হবে, শুল্কমুক্ত আমদানির পরিবর্তে সরাসরি গাড়ি সুবিধা দিতে গেলে রাষ্ট্রের ওপর কেমন বোঝা আসবে। এই সেবা দিতে গেলে সংসদ সচিবালয় প্রথমেই গাড়ি কিনবে। সরকারি ক্রয়ে যা হয়, এখানেও তাই হবে, ৫০ লাখ টাকার গাড়ি কেনা হবে কয়েক গুণ বেশি দামে, থাকবে না কোন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এখানে আমদানিকারক, সংসদ সচিবালয় ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এরপর আসবে চালক নিয়োগের বিষয়টি। কমপক্ষে ৩৫০ জন গাড়ি চালক লাগবে। সংসদের উচ্চকক্ষ চালু হলে আরও ১০০ জন মিলিয়ে মোট ৪৫০ জন চালক নিয়োগ করতে হবে। এই নিয়োগের বিপরীতে বিশাল অংকের ঘুষ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে। টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়া চালকরা যে কেবল বেতনে সন্তুষ্ট থাকবেন না, তা সহজেই অনুমেয়। তেল চুরি বা পার্টস চুরির মতো ঘটনাও ঘটার আশঙ্কা তো থাকেই। রাষ্ট্রের এই গরিব তহবিলের ওপর তাদের আজীবন বেতন-ভাতা ও পেনশনের বোঝা চাপবে।
এরপর আসবে জ্বালানি ও মেরামত খরচ। রাষ্ট্রকে প্রতিটি গাড়ির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে। এখানে সংসদ-সদস্য, গাড়ি চালক সবাই সুযোগ নেবেন। সরকারিভাবে গাড়ি মেরামত করা হলে প্রতিটি পার্টসের দাম বালিশ কেনার মতো বাজারমূল্যের চেয়ে বহু গুণ বেশি দেখানো হবে, যার মাধ্যমে এক শ্রেণির কর্মকর্তা অবৈধ অর্থ আয় করবেন। এছাড়া বড় বিপত্তি আসবে ৫ বছর পর। একজন সংসদ সদস্যর ব্যবহৃত পুরোনো গাড়ি পরবর্তী সংসদ সদস্য ব্যবহার করতে চাইবেন না; তিনি নতুন গাড়ি চাইবেন। পরের সংসদে আবার নতুন করে গাড়ি কেনা হবে। ফলে প্রতিবার নতুন গাড়ি কেনা এবং পুরোনো গাড়িগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পানির দরে নিলামে বিক্রির এক দুষ্টচক্র তৈরি হবে।
অর্থাৎ, প্রতিটি ধাপে দুর্নীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এই অপকর্ম ঠেকাতেই ১৯৮৮ সাল থেকে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কারণ হিসাবে বলা হয়, দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরতে সংসদ-সদস্যদের ভারী গাড়ি দরকার হয় যেগুলোর আমদানি শুল্ক অনেক বেশি। কারণ, শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ির জ্বালানি, চালক ও মেরামতের দায়িত্ব থাকে সংসদ সদস্যের নিজের। রাষ্ট্র কেবল শুল্ক ছাড় দেয়।
বিষয়টি জানার পরও জনগণের মধ্যে তীব্র সমালোচনা থাকায় নিজেদের সম্মান বাঁচাতে এই সুবিধা বাতিল করেছে বিএনপি সরকার। আমাদের ‘সুশীল সমাজ’ বিষয়টিকে প্রায় অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু একজন জনপ্রতিনিধিকে গাড়ি সুবিধা দিলে রাষ্ট্রের কী লাভ বা ক্ষতি, সে বিষয়ে গভীর আলোচনা দেখা যায় না।
প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি রোধে সরকারি গাড়ি দেওয়ার পরিবর্তে শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধাই শ্রেয়। যা করা যেতে পারে তা হলো, গাড়ির সিসি (CC) সীমা কমিয়ে দেওয়া। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি কমবে এবং ব্যাপক দুর্নীতি থেকে দেশ বাঁচবে।
সংসদ সদস্য হওয়ার আগে এই পপুলিস্ট কথাকে পুঁজি করে হাসনাত আব্দুল্লাহসহ অনেকেই জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। কিন্তু তারা এর নেতিবাচক দিকগুলো ভেবে দেখেছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। বর্তমান সরকার হাসনাত আব্দুল্লাহর কথাকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর বড় কারণ হতে পারে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা।
বর্তমান সংসদের শুরুতেই হাসনাত আব্দুল্লাহর এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মেধাবী’ শিক্ষার্থী ভর্তি করতে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফলে এখন প্রকৃতির ডাকের কথা ঠিকমতো বলতে না শেখা শিশুদেরও কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে হচ্ছে ‘মেধা’ প্রমাণে। এতে কোচিং ব্যবসার পোয়াবারো হলেও অপ্রয়োজনে শত শত কোটি টাকা চলে যাবে মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের পকেট থেকে। কোমলমতি শিশুদের ওপর এই মানসিক চাপের দায় সরকার ও হাসনাত আব্দুল্লাহদেরই নিতে হবে।
বিরোধী দল কিছু বললেই কোনো জনপ্রিয়তাবাদী ধারণাকে বাস্তবায়ন করতে হবে, এই চিন্তা সঠিক নয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, ভুল সিদ্ধান্তের দায় শেষপর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই যাবে। বিরোধীদল ইস্যু বানাবে, সমালোচনা করবে, সুশীল সমাজ সমালোচনা করবে; এই বিবেচনা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়াও সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। একজন নেতার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো, জনগণের লেজুড়বৃত্তি না করে, তাদের বুঝিয়ে তাদের জন্য ভালো সিদ্ধান্তটিই বাস্তবায়ন করা। এই বোধ শুধু ক্ষমতাসীন বিএনপি নয়, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও সংবাদমাধ্যম সবার মধ্যেই থাকা জরুরি।