Published : 13 Apr 2026, 07:48 PM
বৈশাখের বর্ষবরণ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। এই একটি মাত্র উৎসবে পুরো দেশ একযোগে মিলতে পারে। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর নানা রকম উৎসব রয়েছে। ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন সবই একেকটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। কিন্তু পহেলা বৈশাখের উৎসবটি সর্বজনীন। এখানে সব ধর্ম-বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, পাহাড় ও সমতল, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে মিলে আনন্দ করতে পারে।
ভাবতে অবাক লাগে, এমন একটি উৎসবেরও বিরোধিতা হয়! পহেলা বৈশাখ এলেই দেশের একশ্রেণির মৌলবাদী মানুষের অশুভ বক্তব্য চোখে পড়ে। পহেলা বৈশাখকে ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির পরিপন্থী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্ষবরণের রীতি প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। চীনে প্রতি বছর চায়নিজ নিউ ইয়ার বা স্প্রিং ফেস্টিভালে ৫৬টি জাতিগোষ্ঠীর সকলেই অংশ নেয়। চীনের মুসলিমরাও নববর্ষ উদযাপন করেন। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নববর্ষ উৎসবও রয়েছে এবং তারা তা যথাযথভাবে পালন করেন।
ইরানের মানুষ নওরোজ উদযাপন করেন। মোগল আমলে ভারতেও নওরোজ উদযাপিত হতো। দিল্লির প্রাসাদ প্রাঙ্গণে এক নওরোজের উৎসবেই যুবরাজ সেলিম ও নূরজাহানের দেখা হয়েছিল।
প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণসহ ১২ মাস বাঙালির একান্ত নিজস্ব ছিল। বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশে শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ ইত্যাদি বর্ষপঞ্জিতে এই মাসগুলোই ব্যবহৃত হতো। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ ও কাব্যকাহিনি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল এবং সেগুলো অনুসারে নববর্ষ পালনের রীতি ছিল। পহেলা বৈশাখে মূলত খাজনা পরিশোধ করা হতো। ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। এছাড়াও এই দিনকে ঘিরে নানা উৎসব-অনুষ্ঠান হতো।
প্রাচীনকালে নববর্ষ ছিল মূলত ঋতুধর্মী উৎসব। গৌড়েশ্বর শশাঙ্কের সময়েও নববর্ষ পালিত হতো। পাল ও সেন আমলেও এই প্রথা ছিল। মুঘল আমলে কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ভূস্বামীদের খাজনা শোধ করতেন। শুধু খাজনা শোধ ও হালখাতা নয়, সঙ্গে মিষ্টিমুখ করা হতো। নবান্ন উৎসব হতো অগ্রহায়ণ মাসে, যাকে কখনো কখনো বর্ষবরণও বলা হতো।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময় একটি সমন্বিত বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনে নতুন সন প্রচলিত হয়। বাংলা সনের জন্ম ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে, এ কথা অধিকাংশ পঞ্জিকাবিদ মেনে নিয়েছেন। তবে গণনা শুরু হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর ১৫৫৬ থেকে। এই নতুন সনকে প্রথমে ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বলা হয়।
সময়ের প্রয়োজনে বাংলা বর্ষপঞ্জি বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে। এর মূল সংস্কার করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি। বর্তমান সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রণেতা ভাষাসংগ্রামী আ জ ম তকীয়ূল্লাহ। তার প্রস্তাব অনুসারে বর্তমান বর্ষপঞ্জিতে খ্রিস্টীয় সাল ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ স্থির রয়েছে। ফলে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিলই পহেলা বৈশাখ হয়।
আবহমান কাল থেকে বিভিন্ন লোকাচারের মাধ্যমে বাংলায় নববর্ষ পালনের রীতি চলে আসছে। চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত, চড়ক পূজা হতো। বৈশাখেও মেলা ও স্নানের রীতি ছিল। ক্রমে এই দিনকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়। নৌকাবাইচ, বলীখেলা, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি দিনটিকে উৎসবময় করে তুলত। নতুন বছরে পিঠা-পায়েস খাওয়া, অতিথি আপ্যায়ন চলত। অনেক অঞ্চলে নববর্ষের আগের রাতে স্নানের প্রচলন ছিল। এখনও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে। অষ্টধাতু ভেজানো পানি ছিটানো, ঘরদুয়ার পরিষ্কার, গরু-বাছুর স্নান করানো, ব্যাঙের বিয়ে, মেঘরাজার গান, শিবের গাজন ইত্যাদি লোকাচার এখনও অনেক অঞ্চলে প্রচলিত আছে।
পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। এই উপলক্ষে দোকান সাজানো হয় এবং ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় হালখাতা।
পহেলা বৈশাখের আগে জমিদার বা নবাবকে সারা বছরের খাজনা পরিশোধের রীতি ছিল। জমিদারবাড়িতে সাধারণ প্রজাদের নিমন্ত্রণ করে সুখাদ্যে আপ্যায়ন করা হতো এবং মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। একে বলা হতো পুণ্যাহ। এখন এই রীতি আর নেই।
ইংরেজ আমলে কলকাতায় সাহেবিয়ানার প্রভাবে নববর্ষ পালন কিছুটা কমে গেলেও, পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে চড়ক ও বৈশাখী মেলা ঠিকই চলতে থাকে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও জাতীয় বোধকে পুনর্জাগরিত করার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে নতুনভাবে পহেলা বৈশাখ পালনের ধারা শুরু করেন।
পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর চলে নির্যাতন ও দমন। তার প্রতিবাদেই ঢাকায় ষাটের দশকের শেষের দিকে নতুন করে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রীতি শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ দেশের প্রধান জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শহুরে মেলা, শোভাযাত্রা ও নানা অনুষ্ঠান।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজস্ব ঐতিহ্য অনুসারে এই নববর্ষ পালন করেন। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু ইত্যাদি উৎসবের মাধ্যমে তারা নববর্ষ বরণ করেন।
পহেলা বৈশাখের বিরোধিতাকারীরা মূলত শহরের উৎসবের বিরোধিতা করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে অথবা ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে। কিন্তু তারা কি গ্রামের মেলা ও লোকাচারের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে পারবেন?
১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। এখন এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই শোভাযাত্রা কোনো বিশেষ ধর্মের পরিচয় বহন করে না, বরং বাঙালির সামগ্রিক জাতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা।
আনন্দ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী শোভাযাত্রা—নাম যেটাই দেওয়া হোক, সেখানে মূলত কী থাকে? এই শোভাযাত্রায় থাকে আমাদের চিরন্তন মোটিফ বা নকশায় তৈরি মুখোশ। গঙ্গাহৃদি, পুণ্ড্রবর্ধন, রাঢ়, গৌড়, বঙ্গ, সমতট, হরিকেলসহ প্রাচীন জনপদগুলোর লোক-ঐতিহ্যের ধারক মোটিফগুলোই এখানে ফুটে ওঠে। প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির ফলক ও মাটির টেপা পুতুলে আমরা যে ছবিগুলো দেখি প্যাঁচা, বাঘ, পাখি, হাতি, পুতুলগুলোই শোভাযাত্রায় উঠে আসে।
শোভাযাত্রা তুলে ধরে আবহমান বাঙালির প্রিয় প্রতীকগুলো, যা এদেশের চিরন্তন লোকজ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কেন এর বিরোধিতা? মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে কোনো ধর্মের সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক শুধু সুপ্রাচীন বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থই কল্যাণ ও শুভ। নতুন বছরের শুভকামনা। তাহলে এত বিরোধিতা কেন?
মৌলবাদী অপশক্তি বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভালোবাসে না। তারা ধর্মের নামে এই উৎসবকে খারিজ করতে চায়। ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সকল লোকজ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, ধর্মের সঙ্গে এই উৎসবের কোনো বিরোধ নেই।
চর্যাপদের কালে নিশ্চিত জানতাম যে আমরা বাঙালি। চর্যাপদের কবি ভুসুকু নিজেকে ‘বঙ্গাল’ বা বাঙালি বলতে দ্বিধা করেননি। পাল, সেন ও সুলতানি আমলেও ধর্ম যাই হোক, বাঙালির পালা-পার্বণে কারও আপত্তি ছিল না। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই একসঙ্গে চড়কের মেলা, বারুণীর স্নানযাত্রা, রথের মেলা, মহরমের মেলায় যেতেন। মোগল আমলে ফসলি সন, খাজনা আদায়, পুণ্যাহ পালনের পাশাপাশি বৈশাখের মেলা ও আনন্দ উৎসবে সবাই অংশ নিতেন।
ব্রিটিশ আমলে ‘আমরা বাঙালি নাকি মুসলমান’ এই দ্বন্দ্বের মধ্যে আমাদের অনেক সময় চলে গেছে। এই দোলাচলের মধ্যেই দ্বিজাতিতত্ত্বের মতো একটি ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে আমরা বাংলাকে ভাগ করে ফেলি। ১৯৪৭ সালে পাই পাকিস্তান নামের একটি জোড়াতালি দেওয়া রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র বারবার বলেছে, তুমি বাঙালি নও, তোমাকে হতে হবে ‘সাচ্চা মুসলমান’, ‘পাকি মুসলমান’।
সাচ্চা মুসলমান হতে হলে প্রথমেই ভুলতে হবে যে তুমি বাঙালি। তোমার পোশাক, ভাষা, রীতিনীতি সবকিছুতেই ‘হিন্দুয়ানি’ গন্ধ। বাংলা ছেড়ে উর্দু ধরতে হবে। বাংলা লিখতে হবে আরবি অক্ষরে। বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে ভাষাকে বদলে ফেলতে হবে। স্বাভাবিক নিয়মে যা গৃহীত হয়েছে, তার বাইরেও জবরদস্তি করে হলেও এইসব নতুন নতুন পাকি শব্দ তোমাকে ব্যবহার করতে হবে।
আর বাঙালির রীতি-রেওয়াজ? সর্বনাশ! ওগুলো তো আরও বেশি নাপাক। গায়ে হলুদ, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন এগুলো বর্জন কর যত দ্রুত সম্ভব। এই চিন্তাধারার বর্তমান উত্তরসূরিরাই আজ পহেলা বৈশাখের বিরোধিতা করছে।
পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। এটি জীর্ণ পুরাতন ও অমঙ্গলকে দূরে সরিয়ে নতুন আলোয় চোখ মেলবার দিন। পহেলা বৈশাখকে সফল করতে এবং সকল অপশক্তির মূল উৎপাটন করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আসুন, দলে দলে উৎসবে শামিল হই। আমাদের সম্মিলিত শক্তির কাছে অশুভ শক্তি হার মানতে বাধ্য।
আসুন, আমরা বৈশাখী ঝড় হয়ে উঠি। সেই ঝড়ের শক্তিতে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর বিভেদ সৃষ্টিকারী সব আবর্জনাকে উড়িয়ে দিই। দূর করি সকল মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অপশক্তিকে।
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’
আমাদের সম্মিলিত বৈশাখী ঝড় দূর করে দিক সব অশুভকে। পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের উৎসব, যার অবস্থান ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এই উৎসবের বিরুদ্ধে যে কোনো ষড়যন্ত্র বাংলাদেশ সর্বশক্তিতে প্রতিরোধ করবে।
১৪৩৩ বঙ্গাব্দ হোক শুভ, সুন্দর ও কল্যাণে উদ্ভাসিত। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলের মঙ্গল হোক। শুভ নববর্ষ!