২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ডলার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। এবারের বাজেটের মোট আকার প্রায় ৭.৯ লাখ কোটি টাকা যা ২০২৪-২৫ বাজেটের (৭.৯৭ লাখ কোটি টাকা) তুলনায় সামান্য কম। বাজেট আলোচনার প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট কেমন।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ
ক) উচ্চ মূল্যস্ফীতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯.৯৪ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। বর্তমানেও এই মূল্যস্ফীতির ধারার খুব একটা হেরফের লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
খ) ডলার সংকট ও রিজার্ভ হ্রাস: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক সময়ের ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে (আইএমএফ হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী ২১ বিলিয়ন ডলার), যা আমদানি সক্ষমতাকে সীমিত করছে। যদিও ডলার সংকট কিছুটা কেটেছে কিন্তু আমাদের অর্থনীতি আমদানি-নির্ভর হওয়ায় রিজার্ভ বাড়ানো এখনও জরুরি।
গ) ঋণের বোঝা: আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণের জন্য রাজস্ব বৃদ্ধি ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের চাপ রয়েছে। ২০২৫ সালে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন টাকা, যার মধ্যে দেশীয় ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন এবং বৈদেশিক ঋণ ১০৩.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২.৩৮ ট্রিলিয়ন টাকা)। এই ঋণ জিডিপির প্রায় ৩১.৭ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাপান, চীন ও রাশিয়া আমাদের প্রধান ঋণদাতা। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ ৬০শতাংশ বেড়েছে, এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে— বিশেষ করে আইএমএফের শর্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের কারণে।
ঘ) বৈশ্বিক প্রভাব: ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। আবার পণ্যের উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে পণ্যের দামও। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাবও লক্ষণীয়।
ঙ) দারিদ্র্য ও বেকারত্ব: করোনা মহামারীর পর দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি এবং যুব বেকারত্বও একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে এবং ৫.৬ শতাংশ চরম দারিদ্র্যে ছিল, যা প্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ দরিদ্র ও ৪ কোটি ১৭ লাখ চরম দরিদ্র মানুষের ইঙ্গিত দেয়। ইউএনডিপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলার সংকট ও আর্থিক সমস্যার কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে, যা এক বছরে ৩ লাখ ৩০ হাজার বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে।
এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে জনকেন্দ্রিক নীতি, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এবারের বাজেটের মূল উদ্দেশ্য
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য হলো সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন। এই বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নিচে বাজেটের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. রাজস্ব আয়:
প্রস্তাবিত রাজস্ব আয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ৯শতাংশ)। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ৪,৯৯,০০০ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণ, কর জাল সম্প্রসারণ এবং ভ্যাট হার সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
২. ব্যয় পরিকল্পনা:
মোট ব্যয় প্রস্তাবিত হয়েছে ৭,৯০,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ১২.৭শতাংশ)। এর মধ্যে পরিচালন ও অন্যান্য খাতে ৫,৬০,০০০ কোটি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ২,৩০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, কারণ ২০১৫ সালের পর বেতন কাঠামো সংশোধন হয়নি।
৩. বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন:
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২,২৬,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬শতাংশ)। এর মধ্যে ১,২৫,০০০ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১,০১,০০০ কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নির্বাহ করা হবে। ঋণের সুদ পরিশোধে ১,২২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
৪. খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার:
- শিক্ষা: শিক্ষা খাতে মোট ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ৩৫,৪০৩ কোটি টাকা দিয়ে ৫,৯৪৬ শ্রেণিকক্ষ, ১৭,১৬৪ ওয়াশব্লক, ৪,৪৫০ টিউবওয়েল নির্মাণ এবং ৯.১৯ কোটি বই বিতরণ করা হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় ৪৭,৫৬৩ কোটি টাকা দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, উপবৃত্তি এবং পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হবে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ১২,৬৭৮ কোটি টাকা দিয়ে এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে।
- স্বাস্থ্য: স্বাস্থ্যখাতে ৪১,৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসায় ৪,১৬৬ কোটি, টিকাদানে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ। কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ ও নার্সিং শিক্ষায় পিএইচডি কোর্স চালু হবে।
- কর্মসংস্থান: যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ লক্ষ টাকা ঋণ সীমা, ১০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ডিজিটাল ছাড়পত্র প্রদান করা হবে। মজুরি বৃদ্ধির হার ৫শতাংশ থেকে ৯শতাংশ।
- কৃষি ও খাদ্য: এই খাতে ৩৯,৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি উপকরণ সরবরাহ, হিমাগার উন্নয়ন, ৫২.৫৫ লক্ষ মে. টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- সামাজিক নিরাপত্তা: এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১,১৬,৭৩১ কোটি টাকা। ভাতার হার বৃদ্ধি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মেয়াদ ৬ মাসে উন্নীত করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের জন্য ৪০৫.২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
- শিল্প ও বাণিজ্য: বিনিয়োগে ৫,০৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ১৫,০০০ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
- নারী ও শিশু: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি হোম মেকারদের অবদান জিডিপিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- পরিবেশ: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
৫. রাজস্ব আহরণ:
- আয়কর: করমুক্ত সীমা রাখা হয়েছে ৩,৭৫,০০০ টাকা এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ৫,২৫,০০০ টাকা। ন্যূনতম কর ৫,০০০ টাকা, নতুন করদাতাদের জন্য ১,০০০ টাকা রাখা হয়েছে।
- ভ্যাট: উৎপাদনকারীদের জন্য আগাম কর ২শতাংশ, বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য ৭.৫শতাংশ। স্যানিটারি ন্যাপকিন, তরল দুধে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
- শুল্ক: নতুন ৩শতাংশ শুল্ক স্তর, ১১০টি পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহার, কৃষি ও ঔষধে শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মোটাদাগে এবারের বাজেটটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং কর সংস্কারের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে অর্থ উপদেষ্টার দাবি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই খাতে মোট ১,১৬,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে পেনশন ব্যতীত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য ৯১,২৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই খাতে দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, ভাতার হার বৃদ্ধি (যেমন বয়স্ক ভাতা ৬৫০ টাকা, প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ টাকা), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের জন্য ৪০৫.২ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হলো শিক্ষা। শিক্ষাখাতে মোট ৯৫,৬৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ৩৫,৪০৩ কোটি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় ৪৭,৫৬৩ কোটি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ১২,৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষ ও ওয়াশব্লক নির্মাণ, বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও অনেকে মন্তব্য করছেন শিক্ষাখাতে কেন আরও বাড়ানো হলো না।
আমারও ব্যক্তিগত মতামত শিক্ষাখাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তবে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেছেন শিক্ষাখাতে এবার গুণগত মানের দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে, অবকাঠামো উন্নয়নে কম দেওয়া হবে। আগের বছরগুলোতে দেখা গেছে অবকাঠামোতে অনেক বরাদ্দ দেওয়া হতো। এই সরকার ওই ধারা ভেঙ্গে, বাজেট পরিমাণ না বাড়িয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ অবকাঠামো হলে দুর্নীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
তৃতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ। স্বাস্থ্যখাতে ৪১,৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে দরিদ্রদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, টিকাদান কর্মসূচি, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ, নার্সিং শিক্ষার উন্নয়ন এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট: বাস্তবভিত্তিক, জনকেন্দ্রিক ও সংস্কারমুখী কিনা?
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রেক্ষিতে এই বাজেটের লক্ষ্য, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করা দরকার। আমাদের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, তবে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বৈদেশিক ঋণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিচে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা করা হলো:
ক. বাস্তবভিত্তিক কিনা?
পক্ষে যুক্তি:
- রাজস্ব ও ঘাটতি: রাজস্ব লক্ষ্য ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ৯শতাংশ) এবং ঘাটতি ২,২৬,০০০ কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬শতাংশ)। এই ঘাটতি টেকসই এবং অভ্যন্তরীণ (১,২৫,০০০ কোটি) ও বৈদেশিক (১,০১,০০০ কোটি) উৎস থেকে পূরণের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত।
- খাতভিত্তিক বরাদ্দ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে বরাদ্দ জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক শিক্ষায় ৫,৯৪৬ শ্রেণিকক্ষ ও ১৭,১৬৪ ওয়াশব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত।
- কর সংস্কার: কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা, ভ্যাট হার সমন্বয় ও ন্যূনতম কর কমানো (৫,০০০ টাকা) রাজস্ব বাড়ানোর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ।
বিপক্ষে যুক্তি:
- রাজস্ব আহরণ: ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে, কারণ কর-জিডিপি অনুপাত কম এবং কর ফাঁকি ও দুর্নীতি আছে।
- বৈদেশিক ঋণ: ১,০১,০০০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে। তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতি হিসেবে এটি ঋণের ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
- মূল্যস্ফীতি: ৯শতাংশ এর বেশি মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বাজেটে সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই, যা বাস্তবায়নের কার্যকারিতা কমাতে পারে।
খ. জনকেন্দ্রিক কিনা?
পক্ষে যুক্তি:
- সামাজিক নিরাপত্তা: ১,১৬,৭৩১ কোটি টাকার বরাদ্দ দারিদ্র্য কমাতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক। বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়ানো এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (৫৫ লক্ষ পরিবার) জনকল্যাণমুখী।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: শিক্ষায় ৯৫,৬৪৪ কোটি এবং স্বাস্থ্যে ৪১,৯০৮ কোটি টাকার বরাদ্দ মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়ক। উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই এবং বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য ৪,১৬৬ কোটি টাকা জনকেন্দ্রিক।
- কর্মসংস্থান: যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ লক্ষ টাকার ঋণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের জন্য ৪০৫.২ কোটি এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১২৫ কোটি টাকা জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দেখায়।
বিপক্ষে যুক্তি:
- মূল্যস্ফীতি: ভাতা বাড়লেও (৫০-১০০ টাকা) তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় অপ্রতুল, ফলে জনগণের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে না।
- অন্তর্ভুক্তির অভাব: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি কম।
- প্রশাসনিক দুর্বলতা: দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে বরাদ্দের সুফল জনগণ পর্যন্ত পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কম।
গ. সংস্কারমুখী কিনা?
পক্ষে যুক্তি:
- কর সংস্কার: করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো (৩,৭৫,০০০ টাকা, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য ৫,২৫,০০০ টাকা), ভ্যাট হার সমন্বয় এবং ডিজিটাল রিটার্নের সুবিধা প্রগতিশীল পদক্ষেপ।
- পরিবেশ ও জ্বালানি: নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি হালনাগাদ, ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ সংস্কারমুখী।
- শিল্প ও বিনিয়োগ: ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে ৫,০৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করবে।
বিপক্ষে যুক্তি:
- প্রশাসনিক দুর্বলতা: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাব রয়েছে।
- কর সংস্কারের সীমাবদ্ধতা: কিছু খাতে অব্যাহতি বাড়ানো রাজস্ব আহরণে বাধা হতে পারে।
- দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি: জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈদেশিক ঋণ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব।
আমাদের অর্থনীতির প্রেক্ষিতে সমালোচনা
ইতিবাচক দিক: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বড় বরাদ্দ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কর সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন আধুনিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের জন্য বরাদ্দ সামাজিক সংহতি বাড়াবে।
চ্যালেঞ্জ: দুর্নীতি, দুর্বল বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাজেটের সাফল্যে বাধা হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বেকারত্ব কমানোর কৌশলের অভাব এবং বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের প্রস্তাব
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষা করতে ২০২৫-২৬ বাজেটে খাতভিত্তিক বরাদ্দ কেমন হতে পারত?
- সার্বিক শিক্ষা (২০-২২শতাংশ, প্রায় ১.৬-১.৭৬ লাখ কোটি টাকা): শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। বাংলাদেশের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ইউনেসকোর পরামর্শ অনুযায়ী, জিডিপির ৬শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া উচিত। আগামী বাজেটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো, ডিজিটাল শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মেয়েদের জন্য বৃত্তি ও প্রণোদনায় বরাদ্দ দেওয়া উচিত।
- স্বাস্থ্য (১০-১২শতাংশ, প্রায় ৮০,০০০-৯৬,০০০ কোটি টাকা): স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ালে জনগণের জীবনমান উন্নত হবে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ২০২৪-২৫ বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫শতাংশ, যা অপ্রতুল। আগামী বাজেটে গ্রামীণ হাসপাতাল নির্মাণ, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসক নিয়োগ, টিকাদান এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
- সামাজিক নিরাপত্তা (১৫-১৮শতাংশ, প্রায় ১.২-১.৪৪ লাখ কোটি টাকা): মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। আগামী বাজেটে নগদ সহায়তা, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি, সর্বজনীন পেনশন স্কিম এবং প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ও বিধবাদের জন্য ভাতা বাড়ানো দরকার।
- কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা (৮-১০শতাংশ, প্রায় ৬৪,০০০-৮০,০০০ কোটি টাকা): এখনও কৃষি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই খাতে সার, বীজ, সেচে ভর্তুকি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং কৃষকদের জন্য ঋণ ও বীমায় বিনিয়োগ করা উচিত।
- অবকাঠামো ও যোগাযোগ (২০-২২শতাংশ, প্রায় ১.৬-১.৭৬ লাখ কোটি টাকা): অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য, তবে অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প এড়ানো উচিত। তবে চলমান মেগা প্রকল্প সম্পন্ন করার জন্য বরাদ্দ দেওয়া উচিৎ। পাশাপাশি গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ, জন-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) খাতেও এই বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।
- তথ্যপ্রযুক্তি (৫-৭শতাংশ, প্রায় ৪০,০০০-৫৬,০০০ কোটি টাকা): স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান বরাদ্দের ক্ষেত্র হতে পারে ডিজিটাল অবকাঠামো ও ৫জি নেটওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ প্রণোদনা এবং সাইবার নিরাপত্তায়।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) (৫-৭শতাংশ, প্রায় ৪০,০০০-৫৬,০০০ কোটি টাকা): এসএমই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় উৎস। আবার বিশাল যুব বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতা কাজে লাগানোর হাতিয়ার। এই খাত উন্নয়নে বরাদ্দের ফোকাস হওয়া উচিৎ স্বল্প সুদে ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য প্রকল্প এবং ক্ষুদ্র এবং মাঝারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল।
- জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি (৮-১০শতাংশ, প্রায় ৬৪,০০০-৮০,০০০ কোটি টাকা): জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগ খাতে এই বরাদ্দ দেওয়া উচিৎ। প্রধান বরাদ্দের ক্ষেত্রগুলো হতে পারে সৌর ও বায়ু শক্তি প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি।
- প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষা (৬-৮শতাংশ, প্রায় ৪৮,০০০-৬৪,০০০ কোটি টাকা): জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তবে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো উচিত। সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ ও প্রশিক্ষণ খাতে এই বরাদ্দ দেওয়া উচিৎ। সাথে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নিচে প্রস্তাবিত খাতভিত্তিক বরাদ্দের একটি চার্ট দেওয়া হলো:

আইএমএফ আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগী। আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি হ্রাস এবং সংস্কার প্রয়োজন। এটি বাজেটের কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক মন্দা ও জ্বালানি সংকট বিবেচনায় আমদানি ব্যয় কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো, মধ্যবিত্তের জন্য প্রণোদনা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য অপরিহার্য।
২০২৫-২৬ বাজেট বাস্তবভিত্তিক হওয়ার চেষ্টা করেছে, তবে রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নকে সীমিত করতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ জনকেন্দ্রিক, কিন্তু মূল্যস্ফীতি ও দুর্নীতি এর প্রভাব কমাতে পারে। সংস্কারমুখী হিসেবে কর এবং বিনিয়োগ খাতে উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অভাব সংস্কারের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে এই বাজেট উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তবে সাফল্য নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।