Published : 30 May 2026, 10:47 PM
রোগী বা রোগীর স্বজনদের সংক্ষুব্ধ হওয়ার যত যৌক্তিক কারণই থাকুক না কেন, চিকিৎসকের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধানো, হাসপাতালে ভাঙচুর করা কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর শারীরিক আক্রমণ করার মতো বর্বরতা দেখানোর কোনো সুযোগ আধুনিক সমাজে নেই। অথচ বাংলাদেশে হাসপাতালের আইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসককেও রক্তাক্ত করার ঘটনা ঘটে চলেছে, যা সমগ্র চিকিৎসক সমাজকে স্তব্ধ ও স্তম্ভিত করার মতো।
দেশে আগুনে পুড়ে শতাধিক মানুষ মারা গেলেও তার দায় নেওয়ার জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না; এমনকি সেই তথ্য প্রকাশের দায়ও কেউ নিতে চায় না। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মৃত্যুর দায় কেউ নিচ্ছে না। তাহলে শুধু চিকিৎসকরাই চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের মৃত্যুর দায় কেন নেবেন? চিকিৎসকরা তো বলতেই পারেন—“আমরা চিকিৎসার দায় নিতে পারি, মৃত্যুর নয়।”
আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মান এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছায়নি যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাই কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইন করেই স্বাস্থ্যকর্মীদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে; কাজের পরিবেশকে করতে হবে ভয়ভীতিহীন ও নিরাপদ। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষা দিতে অত্যন্ত কঠোর আইন রয়েছে।
বৈশ্বিক উদাহরণ ও জিরো টলারেন্স নীতি
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ১৯৯৯ সাল থেকে রোগীদের ইচ্ছাকৃত সহিংসতা ও আগ্রাসন থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের রক্ষা করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। তাদের ‘Health and Safety at Work etc. Act 1974’ আইনের অধীনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ দেওয়ার। এছাড়া, ‘জরুরি কর্মীদের ওপর হামলা (অপরাধ) আইন ২০১৮’-এর আওতায় স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ওপর হামলার সর্বোচ্চ শাস্তি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দুই বছরের কারাদণ্ড করা হয়েছে।
ভারত: ২০২৩ সালে এক দুষ্কৃতকারীর হাতে এক তরুণ চিকিৎসকের মৃত্যুর পর কেরালা রাজ্যে আইন সংশোধন করে অত্যন্ত কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়। কেরালা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনার ঠিক ১ ঘণ্টার মধ্যে এফআইআর দায়ের করতে হবে। চিকিৎসকদের সুরক্ষায় এই সময়কে তারা গোল্ডেন আওয়ার বলে অভিহিত করেছেন। এই আইনে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণকে আমলযোগ্য এবং অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। এছাড়া, করোনা মহামারীর সময় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আইন সংশোধন করে অপরাধীর ৩ মাস থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২ থেকে ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত জরিমানার বিধান করেছে। আর জি কর হাসপাতালের ঘটনাও পুরো ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আর জি করের ঘটনার পর চিকিৎসকরা কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কড়া সুরক্ষা আইনের দাবি জানান।
যুক্তরাষ্ট্র: এখানে ফেডারেল স্তরে 'OSHA' নির্দেশিকার মাধ্যমে হাসপাতালগুলোকে 'কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধ কর্মসূচি' বাস্তবায়নে বাধ্য করা হয়। দেশটির প্রায় ৩৮টিরও বেশি রাজ্যে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলাকে সাধারণ অপরাধের চেয়ে গুরুতর বা ‘Felony’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যার শাস্তি ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
চীন: ২০২০ সালের ‘Basic Medical and Health Promotion Law’-এর মাধ্যমে চিকিৎসকদের হুমকি দেওয়া বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২১ সালের সংশোধিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, চিকিৎসা কার্যে বাধা সৃষ্টি বা সহিংসতা চালালে ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে বাধ্যতামূলক সিকিউরিটি গেট, অ্যালার্ম সিস্টেম ও পুলিশি নজরদারি রাখার আইনি নির্দেশ রয়েছে।
বাংলাদেশে ২০১৪ সাল থেকে একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন’-এর খসড়া প্রণয়ন ও মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে, যা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফাইলে আটকে রয়েছে। আমরা রোগীদের অধিকার সুরক্ষা আলোচনার সময় এ খসড়া আইনিটি নিয়ে কথা বলব। তবে মনে রাখতে হবে, এককভাবে কেবল একটি কঠোর আইন কখনো সুরক্ষার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না, যদি না তার প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ থাকে।

ভৌত অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:
নিরাপত্তা বেষ্টনী ও কর্মী: প্রতিটি হাসপাতালে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে হবে এবং বিশেষ করে জরুরি বিভাগের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ ও প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ করতে হবে।
সতর্কবার্তা দৃশ্যমান করা: চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তি ও দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাসপাতালের প্রবেশমুখেই এমন সতর্কবার্তা দৃশ্যমান করতে হবে, যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে—কোন কোন আচরণ আইনত দণ্ডনীয় এবং কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ: হাসপাতালে দর্শনার্থীদের অবাধ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সমস্ত রোগী ও দর্শনার্থীদের একটিমাত্র প্রবেশপথ দিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে ভেতরে প্রবেশ করাতে হবে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি সংকেত: আন্তর্জাতিক হাসপাতালের মতো ‘সিকিউরিটি কোড পদ্ধতি’ প্রচলন করতে হবে। কোনো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্দিষ্ট সংকেত বা কোড বেজে উঠবে, যা শুনে পূর্বনির্ধারিত নিরাপত্তা টিম দ্রুততম সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হবে।
সিসিটিভি নজরদারি: জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, রিসেপশন কাউন্টার ও অন-কল রুমের মতো সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোকে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
অপেক্ষার সময় কমানো: রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার প্রক্রিয়াটিকে আধুনিক প্রযুক্তির (যেমন ডিজিটাল টোকেন সিস্টেম) মাধ্যমে সহনীয় করতে হবে। সেবাকর্মীদের নিরাপদ বাসস্থান, পরিবহন ব্যবস্থা এবং হাসপাতাল চত্বর পর্যাপ্ত আলোকিত রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সহিংসতা প্রতিরোধে লিখিত কৌশলপত্র ও অনুসরণ
জাতীয় পর্যায়ে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনামূলক কর্মপদ্ধতি বা লিখিত প্রটোকল থাকতে হবে:
জিরো টলারেন্স নীতি: কর্মক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের মৌখিক বা শারীরিক সহিংসতাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য করতে হবে। আক্রমণকে ‘পেশাগত ঝুঁকি’ মনে করে মুখ বুজে সহ্য করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।
ডিজিটাল রিপোর্টিং ও তথ্য বিশ্লেষণ: প্রতিটি সহিংস ঘটনার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন তৈরি বাধ্যতামূলক করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সহজ ও স্বচ্ছ ডিজিটাল পদ্ধতি তৈরি করতে হবে, যা জাতীয় ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। কর্মীরা যেন কোনো ভয় বা বিলম্ব ছাড়া শতভাগ সঠিক তথ্য দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী প্রতিরোধ কৌশল সাজাতে হবে।
ঝুঁকির উৎস চিহ্নিতকরণ ও প্রশিক্ষণ: প্রতিষ্ঠানের কোন কোন জায়গাগুলো সাংগঠনিক বা অবকাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ তা নিয়মিত চিহ্নিত করতে হবে। প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে—কীভাবে সহিংস পরিস্থিতির পূর্বাভাস চিনতে হয় এবং ঘটনাটি সহিংস হয়ে ওঠার আগেই রোগীর স্বজনদের আগ্রাসন কমানোর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল (De-escalation techniques) রপ্ত করতে হবে।
আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীর পাশে দাঁড়ানো: কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হলে তা তার ব্যক্তিগত দায় বা ব্যর্থতা নয়, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। আক্রান্ত কর্মীর পাশে তার প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী ও প্রশাসনকে আইনি ও মানসিকভাবে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়াতে হবে।
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ও বিদ্যমান আইনি পথ
চিকিৎসাসেবা একটি মহান পেশা এবং এর কেন্দ্রে থাকে রোগীর নিরাপত্তা। তৎসত্ত্বেও এই পেশায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা, চিকিৎসা সংক্রান্ত ত্রুটি বা রোগীর ক্ষতি হতে দেখা যায়। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ভুল রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচারের ত্রুটি কিংবা ওষুধের ভুল প্রেসক্রিপশন চিকিৎসাগত অবহেলার উদাহরণ হতে পারে। এর প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত আইন রয়েছে:
১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি: এই আইনের ৮০ এবং ৮৮ ধারায় 'সরল বিশ্বাসে পরিচালিত চিকিৎসাকার্যে' সংঘটিত দুর্ঘটনার দায় থেকে চিকিৎসককে অব্যাহতি বা সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। তবে ৩০৪, ৩০৪(ক), ৩৩৬, ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারানুযায়ী অবহেলায় রোগীর ক্ষতি বা মৃত্যু হলে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ৩০৪(ক) ধারা অনুসারে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ অভিযুক্ত চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করতে পারে। যদিও দেশের সর্বোচ্চ আদালতগুলো চিকিৎসকদের এভাবে রুটিনমাফিক গ্রেপ্তারে নিরুৎসাহিত করেছেন।
সাম্প্রতিক আতঙ্ক: সেন্ট্রাল হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুজন তরুণ নারী চিকিৎসককে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং বারবার তাদের জামিন প্রত্যাখ্যান হয়েছিল, তাতে সমগ্র চিকিৎসক সমাজ চরম অসহায়ত্ববোধ করেছে। চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি—চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠলে বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্ত ছাড়া কোনো চিকিৎসককে যেন গ্রেপ্তার না করা হয়।
অন্যান্য দেওয়ানি ও ভোক্তা আইন: অবহেলায় রোগীর ক্ষতির কারণে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ‘টর্ট আইন’ (চুক্তিহীন দায়) বা ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের অধীনে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা হতে পারে। এছাড়া ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারা এবং ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে ‘পরিষেবা প্রদানকারী’ হিসেবে গণ্য করে ক্ষতিপূরণের মামলা করা সম্ভব। ১৯৮২ সালের ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অর্ডিন্যান্স’ অনুযায়ী হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মে ব্যবস্থা নেওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব।
বিএমডিসি আইন, ২০১০: চিকিৎসকদের মান ও নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) ২৩ ধারা অনুযায়ী, অবহেলা প্রমাণিত হলে চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে বিএমডিসির জেল-জরিমানা করার কোনো আইনি বিধান নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইগত প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো একক আইন নেই। দীর্ঘ এক যুগ ধরে যে 'স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন'-এর খসড়াটি ঝুলে আছে, তা মূলত ১৯৮২ সালের অর্ডিন্যান্সকে আধুনিকায়ন করার জন্য শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন অংশীজনদের পরস্পরবিরোধী অসংখ্য প্রস্তাব সমন্বয় করতে গিয়ে খসড়া আইনটি অসংগতিপূর্ণ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। এই আইনটিকে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত।
চিকিৎসা পেশাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এখানে জটিল দলগত (Teamwork) দায়িত্ব পালন করতে হয়। চিকিৎসায় যখন কোনো ভুল হয়, তা প্রায়শই একজন ব্যক্তির ভুলের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বা পদ্ধতিগত ব্যর্থতাই (Systemic failure) বেশি থাকে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা থেকে ব্যক্তির দায়কে আলাদা করা কঠিন। তাছাড়া চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণ করা অত্যন্ত জটিল এবং এর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সততা ও মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়।
আস্থা পুনর্নির্মাণ ও টেকসই স্বাস্থ্য অবকাঠামো
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার তীব্র আস্থার সংকট। আমাদের দেশে এই অবিশ্বাসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, যা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়।
এর একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে—রোগীদের অভিযোগ সহজে গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি উপযুক্ত ও স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা। বিএমডিসি-র অভ্যন্তরেই দক্ষ ও প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে একটি বিশেষায়িত উইং বা কমিশন গড়ে তোলা যেতে পারে। আদালতে যাওয়ার আগে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিএমডিসিকে একটি ইতিবাচক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে হবে এবং নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। রোগীরা যখন দেখবে তাদের অভিযোগ শোনার মতো নিরপেক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ আছে, তখন তারা আর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারমুখী হবে না।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে—চিকিৎসকদের ওপর সহিংস আক্রমণ আসলে আমাদের অত্যন্ত দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোরই এক অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন (এমনকি আফগানিস্তানের চেয়েও কম)। বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ রোগীকে নিজের পকেট থেকে (Out-of-pocket expenditure) দিতে হয়। এই উচ্চ ব্যয়ই মূলত নানা সহিংসতা ও ক্ষোভের মূল উপাদান।
তাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেনে তোলাটাই সর্বাগ্রে লক্ষ্য হতে হবে। কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নির্মাণ করতে হবে, যাতে যথাযথ রেফারেল পদ্ধতি গড়ে ওঠে এবং বড় মেডিকেল হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় কমে আসে। স্বাস্থ্যসেবার মান ন্যূনতম সহনীয় পর্যায়ে উন্নত না করে কেবল আইনি প্রতিকারের পথে হাঁটলে রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্ক আরও বিষিয়ে উঠবে।
একটি চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগীর স্বার্থই সবার ওপরে এবং চিকিৎসকেরাও তা সুরক্ষায় শপথবদ্ধ। তবে সমাজ ও জনগণের অগ্রগামী অংশকেও এটি অনুধাবন করতে হবে যে—চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নিরাপদ ও ভয়ভীতিহীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে, রোগীদের জন্যও নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কখনো সম্ভব হবে না।
আগের পর্ব: চিকিৎসকদের ওপর সহিংসতা-১: নেপথ্যের খণ্ডচিত্র ও সংকটের গভীরতা