Published : 26 May 2026, 12:13 PM
২০২৪ সালের অগাস্টে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের ভেতর ঢুকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর যে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তা দেখে এই লেখাটি লিখতে শুরু করেছিলাম। ৩১ অগাস্ট রাতে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের মতো অত্যন্ত সংরক্ষিত এলাকায় ৪০-৫০ জন উচ্ছৃঙ্খল লোক দলবদ্ধভাবে প্রবেশ করে। তারা সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেদম মারধর করে। দেশের প্রধানতম চিকিৎসাকেন্দ্রের ওটিতে ঢুকে এমন তাণ্ডব চালানোর ঘটনা ছিল এককথায় অভূতপূর্ব ও স্তম্ভিত করার মতো।
লেখাটি শেষ করার আগেই আমি থেমে যাই।
চারদিকে তখন এক মবের রাজত্ব চলছিল। একটি আবেগপ্রবণ ও উত্তেজনাপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে সঠিক, যুক্তিনির্ভর, বাস্তবভিত্তিক, দূরদর্শী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রাজ্ঞতা দেখানোর সক্ষমতা থাকে না।
একই দিনে বিষপান করে মুমূর্ষু অবস্থায় আসা আরেক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে স্বজনরা ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। ঠিক সেই দিনই, আরেকটি ঘটনায় চিকিৎসা নিতে আসা আহত এক ব্যক্তিকে জরুরি বিভাগের ভেতরেই সশস্ত্র প্রতিপক্ষ খুন করে চলে যায়। চিকিৎসকেরা বাধা দিতে গেলে তারাও গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকেরা ফুঁসে ওঠেন। তাদের তীব্র ক্ষোভ ও কর্মবিরতির সিদ্ধান্তের ফলে দেশজুড়ে এক ভয়াবহ, জটিল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেয়। তা প্রতিরোধে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে হাসপাতালগুলোতে সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। চিকিৎসকদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের অখণ্ডতা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধে গঠিত সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে টানা একশ দিনেরও বেশি সময় হাসপাতাল নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকতে হয়েছে—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। অথচ, এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেও ঢামেক হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন অথবা কোনো না কোনো দিন রোগীর স্বজনদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের গালাগালি ও ধাক্কাধাক্কি র ঘটনা অব্যাহত রয়েছে, যার বড় অংশই আমাদের গোচরে আসছে না।
পরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও আমরা সেই মব সংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে বের হতে পারিনি। যখন কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অতর্কিত হাজিরা নেন, হুট করে বরখাস্ত করেন এবং তা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন—সেটিও একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মব বৈ কিছু নয়।
আমি অপেক্ষা করেছিলাম, এই গভীর সমস্যাগুলো অনুধাবন করার মতো রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্য খাতের দূরদর্শী নেতৃত্ব আসবে। কিন্তু সেদিনের আগে বা পরে, একটি দিনের জন্যও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ ছিল না।
গত ১৬ মে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে রোগীর সংঘবদ্ধ স্বজনেরা কর্তব্যরত চিকিৎসককে টেনেহিঁচড়ে কক্ষ থেকে বের করে দফায় দফায় যেভাবে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে, তা অত্যন্ত পাশবিক। আমি প্রতিনিয়ত চিকিৎসকদের এবং তাদের স্বজনদের আর্তনাদ শুনছি। একজন নাগরিক এবং একজন চিকিৎসক হিসেবে আমারও বুকের ভেতর এক ভয়াবহ রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
সহিংসতার প্রকৃতি: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা প্রতিনিয়ত হুমকি, গালাগালি, চড়াও হওয়া এবং শারীরিক লাঞ্ছনা (যেমন: লাথি, চড়, ধাক্কাধাক্কি, বেদম প্রহার, ছুরিকাঘাত, এমনকি গুলিবিদ্ধ হওয়া) থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডের মতো চরম সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে প্রায় ৬৭ শতাংশ চিকিৎসক রোগী বা রোগীর স্বজনদের কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হন—যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই সহিংসতার ধরনেও লিঙ্গভিত্তিক ভিন্নতা রয়েছে; পুরুষ চিকিৎসকেরা যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, সেখানে নারী চিকিৎসকেরা তুলনামূলকভাবে মানসিক ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি। বিগত বছরগুলোতে দেশে একাধিক চিকিৎসককে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে।
সাধারণত জরুরি বিভাগে, অস্ত্রোপচার পরবর্তী সময়ে (Post-operative) কিংবা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কোনো রোগীর মৃত্যু হলে ‘ভুল চিকিৎসা’ বা ‘অবহেলার’ ঢালাও অভিযোগ তুলে মারাত্মক সহিংসতা সৃষ্টির ঘটনা ঘনঘন সংবাদমাধ্যমে আসছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তরুণ চিকিৎসকেরা এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বেশি, যাদের ৩০ শতাংশই জরুরি বিভাগে কর্মরত ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার’। বিশেষ করে রাতে একা ডিউটি করার সময় এবং ভোরবেলায় শিফট পরিবর্তনের সময়টাতে এই হামলার ঘটনাগুলো সবচেয়ে বেশি ঘটে।
তবে সহিংসতার এই বিস্তার শুধু জরুরি বিভাগেই সীমাবদ্ধ নয়; বহির্বিভাগ, সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি, মাতৃসেবা কিংবা মানসিক চিকিৎসাসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রতিটি স্থানেই সহিংসতার ঘটনা নিত্যদিন ঘটছে। আমাদের দেশের তীব্র পরিসংখ্যানগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলে—টারশিয়ারি কেয়ার (বড় মেডিকেল কলেজ) হাসপাতালের চেয়ে জেলা-উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এই সহিংসতার হার ও ঝুঁকি অনেক বেশি।
এই সহিংসতাগুলো প্রধানত সংঘটিত হচ্ছে রোগী, রোগীর স্বজন কিংবা দলবদ্ধভাবে আসা তথাকথিত ‘রোগীর সুহৃদদের’ (বিশেষত উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মী) হাতে। এমনকি শুধু রোগীর পক্ষই নয়, বিভিন্ন সময়ে কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতেও নিগৃহীত হয়েছেন। সহিংসতার মূল লক্ষ্য চিকিৎসকেরা হলেও নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওয়ার্ড বয়, আয়া এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকসহ হাসপাতালের সকল পর্যায়ের কর্মীরাই এই সহিংসতার বৃত্তে বন্দি। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি ভাঙচুর এবং কর্মরত কর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া এখন একটি নিয়মিত নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা প্রতিনিয়ত এক যুক্তিহীন, আবেগতাড়িত ও আগ্রাসী হামলার চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন, এবং এই বিপজ্জনক প্রবণতা দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে।

কেন এই সহিংসতা?
১. সেবার মান ও চিকিৎসা ব্যয়: বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা দেশের অবহেলিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অসহনীয় অমানবিক পরিবেশ ও নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগীর উপচে পড়া ভিড় সামলান। হাসপাতালে তীব্র জনবল সংকট। সেখানে রোগীর বিছানা থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী ও জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগসহ প্রতিটি প্রয়োজনীয় উপাদানের তীব্র সংকট বিদ্যমান। দীর্ঘ লাইন ও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে যন্ত্রণায় কাতর রোগীর স্বজনদের কাছে চিকিৎসকদের দেওয়া সেবা অনেক সময় বিলম্বিত, অবহেলাজনিত বা ভুল চিকিৎসা বলে মনে হয়। কারও আপনজন হাসপাতালে ভর্তি হলে তারা মানসিকভাবে খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় থাকেন।
জরুরি লাইনে থাকা মুমূর্ষু, গুরুতর আহত বা অজ্ঞান রোগীর প্রতি মনোযোগ দিতে সামান্য বিলম্ব বা এদিক-সেদিক হলেই স্বজনেরা বিচলিত ও উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এর ওপর, সরকারি হাসপাতালে এসেও মেঝেতে থেকে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং থাকা-খাওয়া বাবদ রোগীকে নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। তাই বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে দিলে ও ওষুধসহ অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী আনতে বললে, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চিকিৎসকদের ওপর। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে সহিংসতা প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল।
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সহিংসতার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। বেসরকারি হাসপাতালে রোগীরা চড়া মূল্য দিয়ে সেবা নেন। ফলে সেবার মান, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যৌক্তিকতা, ওষুধের দাম, আইসিইউর ব্যয় এবং হাসপাতালের মনগড়া চার্জ নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন থাকে। বেসরকারি হাসপাতালে মারামারির নেপথ্যে অন্য কোনো তুচ্ছ কারণ সামনে এলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল কারণ থাকে ‘অবিশ্বাস্য ও অস্বাভাবিক উচ্চ বিল’।
২. যোগাযোগ আড়ষ্টতা ও সাংস্কৃতিক মান: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা অনেক সময়ই রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে সঠিকভাবে বা সহজ ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন না। আমাদের চিকিৎসা কর্মীরা বর্তমান যুগের একজন আধুনিক রোগীর অধিকার সচেতনতা ও জ্ঞানকে মূল্যায়ন না করে, বন্ধুসুলভ আচরণের পরিবর্তে পুরোনো ‘পিতৃসুলভ কর্তৃত্বপরায়ণতা’ (Paternalistic attitude) বজায় রাখার চেষ্টা করেন। চিকিৎসকদের এই আচরণ রোগীর স্বজনদের কাছে সংবেদনশীল মনে হয় না।
রোগের যন্ত্রণা বা মানসিক সংকটের কারণে রোগীরা এমনিতেই শারীরিকভাবে ভঙ্গুর ও অসহিষ্ণু থাকেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক সময় শান্ত থেকে এই মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেন না। এখানে রোগী, স্বজন, পুলিশ, আমলা, রাজনীতিবিদ ও সংবাদমাধ্যমকর্মী—সকলেই এই বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিদারুণ ভুক্তভোগী এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে ক্ষুব্ধ।
ফলে রোগীর মৃত্যু হলেই স্বজনেরা আবেগাপ্লুত ও উত্তেজিত হয়ে ‘ভুল চিকিৎসার’ অভিযোগ তোলেন। ক্ষুব্ধ সংবাদমাধ্যমকর্মীরাও অনেক সময় নৈর্ব্যক্তিকতা হারিয়ে বাছ-বিচার ছাড়াই জনপ্রিয় কিন্তু জাজমেন্টাল বয়ান তৈরি করেন—‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। এই ধরনের একপেশে খবর চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিতে উস্কানিমূলক ভূমিকা রাখছে। প্রতিটি ঘটনায় চিকিৎসকদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য থাকে, আর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের থাকে আরেকটি নিজস্ব ধারণা। এই দুইয়ের মাঝে কোনো মেলবন্ধন নেই।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি: জনগণ এবং নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশের মধ্যে এই ধারণা গেঁথে গেছে যে—চিকিৎসকেরা অর্থলিপ্সু, রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন এবং সময় কম দেন। বহু নীতিনির্ধারক মনে করেন, চিকিৎসকেরা একটু মানবিক হলে বা টাকার লোভ কম করলেই এই সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। অথচ তারা ভুলে যান যে, চিকিৎসকেরা কী পরিমাণ সীমাবদ্ধতার মধ্যে রোগীদের বাঁচানোর জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই প্রতিকূল কর্মক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়ত শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন, যেখানে তাদের কাজের পরিবেশ মোটেও মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ নয়।
এর বিপরীতে চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বাস্থ্য পুলিশ’ এবং ‘স্বাস্থ্যসেবা কর্মী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা বছরের পর বছর উপেক্ষিত হচ্ছে। এছাড়া, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সহিংসতা প্রতিরোধের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলপত্র (Protocol) তৈরি করেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহিংস ঘটনার ডেটা সংরক্ষণ, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা বিশ্লেষণ করে নতুন কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আজ অবধি গড়ে ওঠেনি।
সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এই ক্রমাগত সহিংসতার ফলে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা শুধু শারীরিকভাবেই হেনস্তা, অঙ্গহানি বা প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন না, বরং তারা গুরুতর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অপমান, ক্ষোভ, হতাশা ও বিষণ্ণতা তাদের গ্রাস করছে।
চিকিৎসকেরা প্রতিনিয়ত উত্তেজিত মবের আক্রমণ, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া এবং ফৌজদারি মামলায় বিনা তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। এই ভয়ভীতির পরিবেশ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং রোগী মারা গেলেই মারধরের আতঙ্ক থাকে, তবে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
চিকিৎসকেরা তখন অতিমাত্রায় ‘আত্মরক্ষামূলক অবস্থান’ (Defensive Medicine) নেবেন। অর্থাৎ, ঝুঁকি এড়াতে তারা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রেফারেল বাড়িয়ে দেবেন, যা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ফলে চিকিৎসাব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে যাবে। ইতিমধ্যেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে এই পেশা ত্যাগ করার কিংবা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার এক আশঙ্কাজনক প্রবণতা দৃশ্যমান। সহিংস হামলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চূড়ান্ত বিচারে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের কর্মক্ষেত্র যদি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ না হয়, তবে দিনশেষে দেশের সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
চূড়ান্ত বিচারে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের কর্মক্ষেত্র যদি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ না হয়, তবে দিনশেষে দেশের সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
পরের পর্ব: চিকিৎসকদের ওপর সহিংসতা-২: আইনি প্রতিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান