Published : 21 Feb 2026, 11:59 PM
সম্পাদকীয় একটি সংবাদপত্রের নিজস্ব মতামত। এটি সংবাদপত্রের স্বাধীন অবস্থান প্রকাশ করে। সংবাদপত্রের বিষয়বস্তুর মধ্যে শুধু এই অংশেই একটি পত্রিকা স্পষ্টভাবে পক্ষ নিতে পারে। তুলে ধরতে পারে সংবাদপত্রের নৈতিক ও সর্বজনীন অবস্থান। সাধারণত আহ্বান, প্রশংসা বা সমালোচনা, প্রতিবাদ এবং পাঠককে প্রভাবিত করার মতো বিভিন্ন বিষয়ে সম্পাদকীয় লেখা হয়। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে কয়েকটি সংবাদপত্র একত্রে যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। অনেক সময় তা সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছাপা হয়। উদাহরণস্বরূপ, করোনাকালে ২০২০ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো একটি যৌথ সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম ছিল, ‘আমরা আপনাদের পাশে আছি, আপনারাও সঙ্গে থাকুন’।
একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক। ভারতের শ্রীনগরের একটি দরগা শরীফ থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাথার চুল চুরি যাওয়ার ঘটনায় ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। তাতে হাজারও মানুষের প্রাণ বিপন্ন হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়ে। পথে-ঘাটে মানুষ মরছিল অকাতারে। ওই সময় ঢাকার প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলো একত্রে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। শিরোনাম ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। সম্পাদকীয়টি প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালের ১৭ জানুয়ারি। ওই সম্পাদকীয়তে আহ্বান ছিল, এই সর্বনাশা জাতীয় দুর্দিনে আমরা মানবতার নামে, পূর্ব পাকিস্তানের সম্মান ও মর্যাদার নামে দেশবাসীর নিকট আকুল আবেদন জানাইতেছি, আসুন সর্বশক্তি লইয়া গুন্ডাদের রুখিয়া দাঁড়াই, শহরে শান্তি ও পবিত্র পরিবেশ ফিরাইয়া আনি। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৪)
বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি রক্তাক্ত সন্ধিক্ষণ। বাঙালি জাতিসত্ত্বার জাগরণের উন্মেষকাল। তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সংবাদপত্র ছিল দৈনিক আজাদ। সম্পাদক ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৮৯৭-১৯৭৮)। ঐতিহাসিকভাবে আজাদ ছিল মুসলিম লীগের মুখপত্র এবং পাকিস্তানপন্থী সংবাদপত্র। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ঘটনাগুলো আজাদ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করেছিল। এর প্রতিফলন ঘটেছিল আজাদের সম্পাদকীয়তে। ১০ ফাল্গুন, শনিবার, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দে (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘পদত্যাগ করুন’।

সাধু ভাষায় লেখা ওই সম্পাদকীয়র প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়, “গত দুই দিন ধরিয়া ঢাকা শহরের বুকে যে সব কাণ্ড ঘটিতেছে, সে সবকে শুধু শোকাবহ নয়, বর্বরোচিতও বলা চলে। জনাব নূরুল আমিন পুলিশের জুলুম সম্বন্ধে তদন্তের কথা বলিয়াছেন এবং ১৪৪ ধারা জারীর যৌক্তিকতা সম্বন্ধেও ইতস্তত ভাব প্রকাশ করিয়াছেন। কিন্তু সেই তদন্তের কোন ব্যবস্থা হইল না এবং ১৪৪ ধারাও বলবৎ রহিয়াছে; ফলে গুলিতে মানুষ হতাহত হইতাছে এবং মানুষের রক্তে পথ রঞ্জিত হইতাছে। নূরুল আমিন মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা চরমভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমরা এই মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করিতেছি।” (আজাদ, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)
এখানে উল্লেখ্য যে, বাঙালি জাতিসত্ত্বার অধিকারী হয়েও এবং মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যারা বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন নূরুল আমিন। মুসলিম লীগ নেতা নূরুল আমিন ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। তার নির্দেশেই পাকিস্তানি পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারিতে গুলিতে হত্যা, ২২ ফেব্রুয়ারিতে আবার গুলি, আরও রক্তপাত—যাতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ঢাকা। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে-গঞ্জে। পাকিস্তানবিরোধী তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এই গণআন্দোলন প্রতিরোধে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন বেছে নেন সাম্প্রদায়িকতার পথ। উল্লেখ্য, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রক্তদানের সময় পরিষদের অধিবেশন চলছিল। বাজেট অধিবেশনে মওলানা তর্কবাগীশ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ অন্যরা ভাষার প্রশ্নে প্রাণ দান ও পুলিশের গুলির প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন কোনো কথা বলেননি। পরে তিনি বিবৃতি দিতে বাধ্য হন। পরিষদে তিনি বলেন, পুলিশ প্রাঙ্গণে ঢোকেনি। আমি যতদূর খবর পেয়েছি পথচারীদের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তাদের গাড়ি ভাঙ্গা হয়। কয়েকজন পুলিশ আহত হয়, তবুও হস্তক্ষেপ করা হয়নি। প্রথমে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করা হয়। (পৃষ্ঠা ৩০, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন)
এরপর ভাষার প্রশ্নে পরিষদ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ২৪ ফেব্রুয়ারি গভর্নর অধিবেশন স্থগিত করেন। কিন্তু ৩ মার্চ এক বেতার ভাষণে নূরুল আমিন ভাষা আন্দোলনের প্রতি চরম বিষোদগার করেন এবং গুলি চালানোর অদ্ভুত সাফাই দেন। বেতার ভাষণে তিনি বলেন, “যদি দৃঢ়তার সঙ্গে এই অরাজকতা দমনে আমি ও আমার সহকর্মীগণ অগ্রসর হইতে না পারিতাম, তাহা হইলে জনগণ ও ইসলামের প্রতি কর্তব্য সম্পাদনে আমরা সামনে ও আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের সামনে নিশ্চয় অপরাধী সাব্যস্ত হইতাম।” (পৃষ্ঠা ৬৮, বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র)
আজাদের সম্পাদকীয়তে ফেরা যাক। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা হয়, “এখন পূর্ব্ব পাকিস্তানের ব্যবস্থা পরিষদের অধিবেশন চলিতেছে। সদস্যগণকে এ ব্যাপারে তাঁদের কর্ত্তব্য পালন করিতে আমরা অনুরোধ জানাইতেছি। এ ভাবের জুলুম কোন মতেই চলিতে দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের মর্যাদা পর্য্যন্ত রক্ষিত হইতেছে না। এর প্রতিকার করিতেই হইবে এবং শান্তি স্থাপন করিতে হইবে।” (আজাদ, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)
পরের অনুচ্ছেদে লেখা হয়, “ছাত্রেরা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানাইয়াছে। এ দাবী জানাইবার তাঁদের পূর্ণ অধিকার আছে। পূর্ব্ব পাকিস্তানের অধিবাসীরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু। এ যদি এখনকার জনমতের দাবী হয়, তবে পাকিস্তানকে তা মানিয়া লইতেই হইবে। এ গণতান্ত্রিক দাবী অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো নাই। পূর্ব্ব পাকিস্তানের আইন সভার সদস্যদিগকে তাঁদের দায়িত্ব পালন করিতে হইবে এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত যুক্তভাবে জানাইয়া দিয়া বাংলার দাবী প্রতিষ্ঠা করার ভার তাঁহাদিগকে গ্রহণ করিতে হইবে। দেশকে আজ এক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা করুন। পাকিস্তানের সংহতি, কল্যাণ এবং উর্দ্দু ও বাংলা ভাষাভাষীদের সম্প্রীতি দৃঢ়তর ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করুন; আজ শোক সন্তপ্ত পূর্ব্ব পাকিস্তানের জনমত আপোষহীন ভাষায় এই দাবীই জানাইতেছে।” (আজাদ, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)
এটি ছিল পরিপূর্ণ সাহসী ও স্পষ্ট উচ্চারণ। যাতে ছিল ব্যর্থ নূরুল আমিন সরকারের পদত্যাগ এবং সহিংসতা বন্ধের আহ্বান।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে ভাষার প্রশ্নে আজাদের সার্বিক ভূমিকা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। যা আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণের দাবি রাখে।