Published : 14 Feb 2026, 05:55 PM
দেড় যুগ পর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিলাম৷ ২০০৮ সালের পর এই প্রথম ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হলো। নিজের চোখকে তো অবিশ্বাস করা যায় না। কেন ভোট এ দেশে যেকোনো ধর্মীয় উৎসবের চেয়েও বড় উৎসব, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে তা আবারও প্রমাণিত হলো।
এবারের নির্বাচনের একটা অভূতপূর্ব সমীকরণ ছিল। যুযুধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের কারও সাম্প্রতিক অতীতে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতা নেই। সাধারণত যেটা হতো, ১৯৯১-২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত, সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকা দল বা জোট মারাত্মক রকম চাপে থাকত। আর সর্বশেষ বিরোধী দলের পক্ষে রায় যেত জনগণের, বিশেষত দোদুল্যমান ভোটারদের। তাতেই তারা সরকার গঠন করে ফেলত৷
সরকারে থাকা দল বা জোট মানেই 'ভালো কাজ করেনি'—জনগণের এই মনস্তত্ত্ব তাদের বেশ পিছিয়ে দিত। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ওপর কোনো 'ইনকামবেন্ট' থাকার চাপ ছিল না। যে কারণে জনগণ কাদের বেছে নেবে এটার ভবিষ্যদ্বাণী করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। বাংলাদেশের জন্য এটা এক আশ্চর্যজনক বিষয় বটে!
হ্যাঁ, হট ফেবারিট বনাম আন্ডারডগ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। কিন্তু, যতদিন গেছে আন্ডারডগরা তত বেশি ফেবারিটদের ধাওয়া করেছে। অবস্থা এমন দিকে গেছে যে, আন্ডারডগরা ফেবারিটদের চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বহু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস এসেছে। নির্বাচন যদি এমন না হয়, তাহলে তাকে আর কী করে নির্বাচন বলা যায়!
২.
শেষ পর্যন্ত অবশ্য হট ফেবারিটই খেলা জিতে নিয়েছে। প্রগতিশীল বনাম রক্ষণশীল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বনাম বিপক্ষ—এসব বাইনারি যখন সামনে চলে এসেছে ঘটা করে, তখন জনগণ মুক্তিযুদ্ধপন্থী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশপন্থাকেই বেছে নিয়েছে। ময়দানে মুক্তিযুদ্ধ, নারীর অধিকার ও প্রগতিশীল বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বনকারী পক্ষকে বিপুল জনগণ হতাশ করেনি। এটা এই নির্বাচনের বিশাল এক বার্তা। বাংলাদেশের জনগণ সব ছাড়তে পারে, কিন্তু তার মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশ রক্ষণশীলদের হাতে ছাড়বে না।
এর ফলস্বরূপ ভোট উৎসবে বিএনপি আবারও দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সংসদে যেতে পারছে। নতুন সহস্রাব্দের প্রত্যেকটি নির্বাচনে সরকার গঠন করা দল বা জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে, যেটা প্রাণবন্ত সংসদীয় ব্যবস্থার অন্তরায়। এবারও তার ব্যত্যয় হলো না। এই অর্থে প্রাক-নির্বাচনি হাওয়া আর ভোটের দিনের পরিবেশ যা আভাস দিয়েছিল, সেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের বাতাবরণটা বিশাল হতাশায় পরিণত হলো বলেও অনুভূত হতে পারে। কিন্তু, সেটা ফলাফল ঘোষণার পরে এসে বোঝা গেছে। তার আগ পর্যন্ত নির্বাচন কিন্তু দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণই হয়েছে। 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে'র জোরালো অভিযোগও কেউ করতে পারছে না। বহু আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। এই না হলে নির্বাচন!
অথচ, এই টানটান উত্তেজনার ব্যত্যয় ঘটেছিল সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনে। প্রথাগত সংজ্ঞায় যেগুলো আসলে নির্বাচন হলেও, সাংস্কৃতিকভাবে এগুলোতে জনরায়ের তোয়াক্কা ক্ষমতাসীনরা করেনি৷ এর ফল স্বরূপ, একটা আওয়ামী লীগহীন নির্বাচন হয়ে গেল দেশে। তবুও কী অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ মানুষের!
এই যে একটা পুরোনো বড় দল না থাকার পরও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, এর থেকে প্রভূত শিক্ষা নেওয়ার আছে রাজনৈতিক দলগুলোর। জনগণকে তার মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। জয়-পরাজয় তো থাকবেই। কিন্তু, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বেচ্ছাচার ধারণ করা যাবে না। আগামী সরকারের কাছে এই শক্তিটা থাকল এবং বাংলাদেশের এই শক্তিকে ভবিষ্যতে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে হবে।
৩.
এই নির্বাচনকে 'ভোট উৎসবে' পরিণত করার প্রধান কৃতিত্ব প্রান্তিক নাগরিকদের। বিশেষত, নারী ভোটারদের। কী অভূতপূর্ব সাড়া নারীরা দিয়েছেন এই নির্বাচনে, তা ঘরে বসে অবলোকন করা যাবে না৷ পুরুষদের বুথগুলোতে যেখানে সহজেই পৌঁছানো যাচ্ছিল, নারীদের বুথগুলোতে সেখানে ছিল শেষ বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা। বলা যায় নারীরা একটা ভোট-বিপ্লব করে ফেলেছেন এবার। এমনি এমনি ভোট প্রদানের হার প্রায় ৬০ ভাগ হয়নি।
সরকারের অনুমান ছিল ৫৫ ভাগ। আমি আশা করছিলাম ৭০ ভাগ। কিছু সুনির্দিষ্ট জেলা এবং নাগরিক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ঠিকঠাক ভোটকেন্দ্রে গেলে ৭০ ভাগ হওয়া আশ্চর্যজনক কিছু ছিল না। কেননা, সিংহভাগ কেন্দ্রে হার অনেক বেশি এসেছে। তবুও, আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনে ৫৯.৪৪ ভাগ কম বড় সংখ্যা নয়! ২০০৮ সালের সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ৮৭.১৩ ভাগ ভোট পড়েছিল। এই হিসাব এটাও প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগের ভোট বর্জনের উদ্যোগ কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অর্জন যেমন স্বতঃস্ফূর্ত ভোটার উপস্থিতি, ঠিক তেমনই বড় অর্জন শান্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত পরিবেশ। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা বাদ দিলে পরিবেশ অনেক নিরুপদ্রব ছিল। এই কৃতিত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের এবং সরকারেরও। শান্তিময় পরিবেশ নারীদের এবং ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি আশ্বস্ত করেছে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তারা যেতেন না। শান্ত পরিবেশ ছিল বলেই যত দিন গড়িয়েছে, তত তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
নারীরা ও প্রান্তিক ধর্মগোষ্ঠীই এই নির্বাচন অব্যর্থ তথা সার্থক করার মূল কাণ্ডারি! এই চিত্র এখন সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করবে। অভিনন্দন বাংলাদেশ!
৪.
ভোট সফল। কিন্তু, চরমভাবে ব্যর্থ গণভোট। সুশীল-শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব দিয়ে সংস্কারের চিন্তা করে অন্তর্বর্তী সরকার ও তার ঐকমত্য কমিশন বাংলাদেশের আপামর মানুষের ওপর এমন একটি গণভোট চাপিয়ে দিল, যার শুধু পরিমাণগত (কোয়ানটিটেটিভ) গুরুত্ব আছে, গুণগত (কোয়ালিটেটিভ) গুরুত্ব স্লান হয়ে গেছে।
প্রশ্নপত্র তো এমনিতেই কঠিন ও বিতর্কিত ছিল, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির কোনো সম্পর্কই নেই। শিক্ষিত মধ্যবিত্তই যেখানে সংস্কার ও প্রশ্নপত্রের ভাষা বুঝতে গলদঘর্ম হয়েছে, সেখানে স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের মধ্যে এ ব্যাপারে যে দ্বিধাবোধ দেখা গেল, তা নিম্নশ্রেণির প্রতি উচ্চশ্রেণির প্রথাগত অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছু নয়।
আমার অভিজ্ঞতাটাই বলি। ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে পরিচিত এক শ্রমজীবী ব্যক্তি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই হ্যাঁ/না ভোটটা আবার কী, কী হবে এতে, কেন দিতে হবে, দিলে কী হবে, কীভাবে দিতে হবে? সহজে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু তিনি যে খুব একটা বুঝলেন, এমন না৷ নিজেকে তথাকথিত শিক্ষিত হিসেবে সেই মুহুর্তে অসহায় লাগছিল, কেননা আমি একজন অতি সাধারণ স্বল্প শিক্ষিত মানুষের অসহায়ত্বটা টের পাচ্ছিলাম।
দেশের আরেক জায়গায় দেখলাম, এক ব্যক্তিকে বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোরের সাংবাদিক প্রশ্ন করেছেন, 'আপনি গণভোট দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'দিছি।' সাংবাদিক পরে জিজ্ঞেস করলেন, 'গণভোটের যে লেখাগুলো আছে, সেগুলো পড়েছেন?' ব্যক্তিটি অত্যন্ত অসহায় হয়ে বললেন, 'মূর্খ মানুষ, আমি বুঝি না।' পাল্টা এক প্রশ্নে তিনিই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, 'মূর্খ মানুষ, কেমনে পড়ব?'
এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হলো, এসব শ্রমজীবী মানুষের প্রশ্নগুলো যেন আমাদের 'রেফারেন্ডামস মাস্টারমাইন্ড'দেরই একদম উলঙ্গ করে ছেড়ে দিয়েছে। গণভোটের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এদেশের অধিকাংশ মানুষের এই শোচনীয় অবস্থা হবার কথা ছিল। এটা জানার পরও, শুধু নিজেদের মনের খায়েশ মেটানোর জন্য এই মেহনতি মানুষের কোটি কোটি টাকা খরচ করে গণভোট নামক একটা কৌতুক মঞ্চস্থ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, যার সঙ্গে গণমানুষের কোনো আত্মার বন্ধনই তৈরি হয়নি। সংবিধান সংস্কারের যে বিষয়গুলো এসেছিল, সেগুলোর তর্ক-বিতর্ক সংসদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে গণভোটের পথে যাওয়ার এই প্রহসন কী ভয়াবহ পরিস্থিতি ও সংকট তৈরি করবে, তা জানার জন্য আর অল্প কিছুদিন অপেক্ষা করলেই হবে আমাদের। ততদিনে এই গণভোটের কুশীলবরা দৃশ্যপট থেকে সরে যাবেন, কেউ কেউ বিদেশ বিভুঁইয়ে পাড়ি দেবেন, চাপ বাড়বে নতুন রাজনৈতিক সরকারের ওপর।
এই রাষ্ট্রের সংস্কার দরকার। আমি সংস্কার চাই। কিন্তু, জনগণকে অবজ্ঞা করে নয়। জনগণ সংসদে প্রতিনিধি পাঠান তার হয়ে সমস্ত কাজ তার প্রতিনিধি করবেন, এই ভরসায়। তাহলে উল্টো জনগণের ওপর অযথা বোঝা চাপানো হলো কেন? কী উদ্দেশ্যে?
৫.
প্রক্রিয়াগত ত্রুটির পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক ত্রুটিও ঘটেছে এই গণভোটে। সরকার 'হ্যাঁ'-কে জেতানোর জন্য আপাদমস্তক চেষ্টা করেছে। তাতে, বলাবাহুল্য, 'না'-এর বিপক্ষে পক্ষপাত করা হয়েছে রেফারির তরফে। এই অবস্থান চরম অগণতান্ত্রিক হয়েছে।
দ্বিতীয় যে কাজটা করা হয়েছে, সেটা খোদ ব্যালট পেপারেই করা৷ আমি নিজে ব্যালট পেপার হাতে নিয়ে বিস্মিত হয়েছি। হ্যাঁ-এর পাশে 'টিক' চিহ্ন, না-এর পাশে 'ক্রস' চিহ্ন দেওয়া! এটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা। না বুঝলেও, আমরা টিককে সঠিক, আর ক্রসকে বেঠিক ভাবি। মানুষ তো সচেতনভাবে ভোট নষ্ট করতে চায় না। তাই টিককে 'বৈধ ভোট' ধরে নিয়ে সিল দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অর্থাৎ, ক্রস তার কাছে হয়ে যাবে তখন 'অবৈধ ভোটে'র সমার্থক। এই যে মানুষের সঙ্গে এমন মনস্তাত্ত্বিক খেলার আয়োজন—এটা স্রেফ সূক্ষ্মবুদ্ধির প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড রাখলে তো কোনো চিহ্নই রাখা উচিত ছিল না, অথবা রাখলেও একই চিহ্ন থাকা উচিত ছিল। তাই না?
তৃতীয় ঘটনা বা ঘটনাবলী ভোটের পরে ঘটেছে। সেটা অনুমিতই ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটে গেল বলেই তাকে কাকতালীয় বলা যাবে না। পুরো জাতি যখন সংসদীয় আসনের জয়-পরাজয় নিয়ে মগ্ন, তখনও পর্যন্ত আমরা জানতে পারিনি গণভোটের ফল। প্রার্থীদের ভোটের হিসাব নিয়ে তাদের পোলিং এজেন্টরা চলে গেছেন। আর ফাঁকা মাঠে একা রাত কাটাতে হলো গণভোটের ব্যালট পেপারগুলোকে। আহা, কত গুরুত্বপূর্ণ একটা গণভোট, অথচ তার ফল গণনা বা ঘোষণায় কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই কারও! এই হলো আমাদের সাধের গণভোট, যেখানে বারবার বদল হয়েছে সঠিক সংখ্যার হিসাবও। সেটা এতটাই যে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রদত্ত ভোটের হার অসম হয়ে গেছে! একই সময়ে ও সমসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে হওয়া দুটি ভোটের হার দুই রকম হবে কেন?
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন। ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৮০ লাখ ৪২ হাজার ৩৪১ জন। অর্থাৎ, প্রায় ৫ কোটি ভোটার অংশগ্রহণ করেননি। এ হিসাবে মোট ভোটারের ৬১.১১ ভাগ ভোট দিলেও ৩৯.৮৯ ভাগ ভোট দেননি। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন, প্রবাসী ভোটার ও ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবার পর মৃত্যুজনিত কারণ মিলিয়ে যদি ৫ ভাগ ভোটার বাদ দেওয়া যায়, তবুও প্রায় ৩৫ ভাগ বাকি থাকেন।
উপরেই বলেছি, একটি সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা অতি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু, গণভোটের ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ ভাগ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি দেশের আইনি দলিলের ভাগ্য নির্ধারণ করা কতটা আইনসিদ্ধ ও যুক্তিসঙ্গত? শুধু মোট ভোটারের মধ্যে অর্ধেকের চেয়ে একজন বেশি অংশগ্রহণ করলেই গণরায়ের ম্যাজিক নম্বর গণ্য হয়ে যাবে? এসব প্রশ্ন বহু আগেই আমরা করেছিলাম। কিন্তু, তথাকথিত ঐকমত্য কমিশন সেই ধোঁয়াশা কাটানোর কোনো গরজ বোধ করেনি।
আবার, সংখ্যার তারতম্যগুলোও চোখে লাগার মতো। নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে, সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হারের ৫৯.৪৪ ভাগ হলেও, গণভোটের হার ৬০.২৬। কিন্তু, মোট ভোটারের অনুপাতে প্রদত্ত ভোটারের হার হিসাব করে দেখা যাচ্ছে ৬১.১১ ভাগ। এই তারতম্যের ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সহ সভাপতি আলী রীয়াজ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "আমরা দেখেছি অনেকে শুধুমাত্র গণভোটে ভোট দিয়েছেন কিন্তু অন্য নির্বাচনে দেননি। ব্যবধান মাত্র ২ শতাংশের মতো, যা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।” প্রশ্ন হলো, কে কোন ভোটটি দিয়েছেন, কে দেননি, সেটা কর্তৃপক্ষ জানল কী করে? আর সংসদ নির্বাচনে ভোট না দিয়ে উল্টো গণভোটে ভোট দিয়েছেন, এটাইবা কতটা বাস্তবসম্মত? সব আসনের হিসাব পেলে দুই ভোটের হার সমান হবে বলে আশা করছেন তিনি। আবার নিজেই বলছেন গণভোটে মানুষ বেশি ভোট দিয়েছেন। তার কোন ব্যাখ্যাকে আমরা গ্রহণযোগ্য ধরব এখন?
হিসাব মতে, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। বাতিল বা অবৈধ হয়েছে ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি ভোট। এই হিসাবে গণভোটে প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৬২.৪৭ ভাগ 'হ্যাঁ' এবং ২৯.৩২ ভাগ 'না'-এর পক্ষে পড়েছে। নিঃসন্দেহে বড় ব্যবধান। কিন্তু, রাজশাহী-৪ আসনে ২৪৪.২৯৫ শতাংশ ভোট পড়ল কেন? পরে সেটা রাতারাতি ৭২.৬৯ ভাগ হলো কীসের ভিত্তিতে? সিরাজগঞ্জ-১ আসনে গণভোটের হার মাত্র ৭.৮৯৯ ভাগ কেন? নেত্রকোনা-৩, নেত্রকোনা-৪ এবং নেত্রকোনা-৫ আসনে 'হ্যাঁ' ভোটের সংখ্যা ওই আসনগুলোর মোট ভোটারের চেয়েও বেশি দেখাচ্ছে কেন? (তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)
আবার অন্যভাবে বললে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ১১টি আসনে 'না' ভোট জয়ী হওয়ায়, এ আসনগুলোতে কি 'সংস্কার' চাপিয়ে দেওয়া হবে? সংস্কার তো পুরো রাষ্ট্রের। সহজ ভাষায় সারা দেশের হিসাবে বিপুল ভোটে হ্যাঁ জেতায় সংস্কার এখন হবেই। কিন্তু, যেসব জায়গার ভোটাররা একদম অঞ্চল ধরে না-কে জেতালো, তাদের নিশ্চয়ই ভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাব আছে। এগুলো শুনবে কে? এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলাতেই এবং গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনেই 'না' জয়ী হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ-১, সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১২ এবং রাজশাহী-৪ আসন রয়েছে এই ক্যাটাগরিতে। গোপালগঞ্জের মানুষ আওয়ামীপন্থী, কিন্তু তারা তো দেশের নাগরিক। তাদের মতের গুরুত্ব থাকবে না? আচ্ছা, সমতলের আসনগুলোর কথা যদি বাদও দেই, পাহাড়ে 'না' জেতার যে বার্তা, তা রাষ্ট্র কীভাবে গ্রহণ করবে এখন?
মজার বিষয় হলো, রাজশাহী-৪ বাদে বাকি ১০টিতে জিতেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এই আসনের সংসদ সদস্যরা সংসদে সংস্কারের ব্যাপারে যে আলাপই তুলুন না কেন, এলাকার জনগণের কাছে তারা কী জবাবদিহি করবেন এখন?
৬.
নিরঙ্কুশ জয়লাভের পরও, গণভোট সত্যই এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল এই রাষ্ট্রকে। যদিও সর্বৈব অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়, তবুও সফল ও সার্থক একটি জাতীয় নির্বাচনের আনন্দের মধ্যে গণভোটের এই বিষাদ ও বিস্বাদ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিবে, একদল বুদ্ধি ব্যবসায়ীর স্বেচ্ছাক্ষেত্রে পরিণত হওয়া বাংলাদেশের ভূত ও ভবিষ্যত দোদুল্যমান হয়ে পড়েছিল। ব্যর্থতা ছিল রাজনীতি ও রাজনীতিকদের। সেই ব্যর্থতা মোচনের গুরুভার এখন তাদের হাতে। সংস্কার হোক এ রাষ্ট্রের। সেটা হোক রাষ্ট্রেরই স্বার্থে, অলিগার্কদের স্বার্থে না।