Published : 04 Nov 2025, 02:11 AM
অবশেষে ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি সবার আগে নির্বাচনি যাত্রা শুরু করেছে। জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক অনৈক্যের মধ্যে দলটি প্রার্থী ঘোষণা করে সবাইকে জানিয়ে দিল, তারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। এখন অন্য কিছু ভাববার বা অন্য কোনো দিকে তাকানোর সময় নেই! অনেকে বলতে পারেন, আসলে বিএনপির আর তর সইছে না। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি মাঠছাড়া হওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তাদের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকায় কে? শুধু নির্বাচনটা চাই। নির্বাচন হলেই বিএনপির নেতাকর্মীরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আসবেন। অবসান ঘটবে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার প্রতীক্ষা।
একটা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে চাইবে, ভোটে জিতে ক্ষমতায় যেতে চাইবে, ক্ষমতায় গিয়ে দলের নীতি-কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে, এতে অবশ্য আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার মধ্যে এক ধরনের তাড়াহুড়োর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটা যতটা অস্থিরতারও বহিঃপ্রকাশ, তারও বেশি কৌশলগত অবস্থান। কেননা, খেলার মাঠ এখনও তৈরি হয়নি, তবে মাঠে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা যথেষ্ট ধুলোবালি উড়াচ্ছেন।
আসলে পর্দার আড়ালে নানান খেলা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায়শই যেমনটা হয়। এই ‘গোপন খেলা’য় বিএনপি নিজেদের হারিয়ে ফেলার ভয় করছে। তাই তো মাত্র একদিন আগেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনো অগণতান্ত্রিক কিংবা অপশক্তির কাছে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণের পথে হাঁটতে হয় কি না, এমন শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তারেক রহমান একথাও বলেছিলেন যে, ‘পরাজিত পলাতক স্বৈরাচারের শাসন আমলে জনগণের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনোই আগ্রহ ছিল না। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জনমনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা বাড়ছে, যথাসময়ে কি নির্বাচন হবে?...এমন তো হবার কথা ছিল না।’ তার মনে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা খুবই প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই যুক্তিগ্রাহ্য কারণও আছে। মূলত এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিএনপিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে।
বিএনপির এই পদক্ষেপকে কেবল ‘প্রচারণা শুরু’ হিসেবে দেখা যাবে না; এর ভেতরে একই সঙ্গে আছে তাড়া, অনিশ্চয়তা, কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং রাজনৈতিক বার্তা। মূলত অনিশ্চয়তার মোকাবিলার কৌশল হিসেবেই দলটি নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়েছে। কারণ দিন যত গড়াচ্ছে, রাজনৈতিক মহলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ততই বাড়ছে। নির্বাচনি সূচি, নিয়ম ও মাধ্যম কেমন হবে, এটা সবার কাছেই একটা ধাঁধা। তা ছাড়া দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার চাপ, অভ্যন্তরীণ ভোটভিত্তিক শক্তি ক্ষয়ে যাওয়ার ভয় এবং দলের পরিচিতি রক্ষার প্রয়াস—এগুলো তাড়াহুড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। প্রার্থী হিসেবে আগাম নাম ঘোষণা করলে স্থানীয় নেতৃত্ব সক্রিয় হয়, ভোটার-প্রার্থী সম্পর্ক মজবুত হয় এবং জনমত প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হয়—বিশেষ করে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী দলে বিভাজন ও অপ্রস্তুত মনোভাব থাকে। এটাও বিএনপির বিবেচনার বিষয় হতে পারে। একই সঙ্গে যারা নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন, তাদের প্রতি কৌশলগত বার্তা ও চাপ-সৃষ্টিও বিএনপির এই প্রার্থী ঘোষণার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। দ্রুত তালিকা প্রকাশ করে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর জনদাবি তৈরি ও ‘সময় এখন নির্বাচনের’ এমন একটি চাপ সৃষ্টি করতে চায়—যাতে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দূর হয়, কিংবা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত করা যায়। একই সঙ্গে এটি শত্রু-মিত্র উভয়ের মনোবল পরীক্ষার একটি সুযোগও বটে।
এ মুহূর্তে ‘জুলাই সনদ’ সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এটি যদি গণভোট বা রেফারেন্ডামের মাধ্যমে কার্যকর হয়, তাহলে নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও সংবিধানের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি—সব দলের সম্মতি নিয়েই তারা এগোবে—এই প্রক্রিয়ায় এখন মূল ভূমিকা রাখছে। সরকার ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এক সপ্তাহের মধ্যে মতামত দিতে বলেছে, যা দেখায় তারা দ্রুত সমাধানে পৌঁছাতে চায়।
যদি এই সনদ বা রেফারেন্ডাম দ্রুত পাস হয়, তাহলে সেটি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মতো নতুন দলের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি সনদ আটকে যায় বা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে। সে অবস্থায় বিএনপির আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণার তাড়াহুড়োটা যৌক্তিক মনে হতে পারে–কারণ তারা সময় নষ্ট না করে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইবে। তখন তাদের এই তৎপরতা একধরনের আত্মরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে ধরা পড়বে।
জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কিত। এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোট করেই তারা মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদে ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এবার জামায়াত নিজেদের শক্তিতে বলীয়ান হতে চায়। ইতিমধ্যে ডাকসু, জাকসু. চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে দলটির ছাত্র সংগঠন অভাবনীয় বিজয় অর্জন করেছে। তারা এই ধারা জাতীয় নির্বাচনেও বজায় রাখতে চায়। যদিও গণভোটের আগে নির্বাচন নয় বলে দাবি করছে জামায়াত। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনি প্রচারে তারা বহু আগে মাঠে নেমে পড়েছে। হাটে-মাঠের প্রচার এখন বাড়ির উঠোনে নিয়ে গিয়েছে দলটি। বিএনপি নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়ার পর তারাও অনুকূল অবস্থান নিতে চাইবে, অপ্রকাশ্য প্রচার-প্রচারণাকে প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য হবে। ধীরে ধীরে সরাসরি ভোটযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে। জামায়াতে ইসলামী জাতীয় রাজনীতিতে চমক দেখাবার সর্বোচ্চ চেষ্টা যে এবারই করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার বিষয়টি জামায়াতকে রাজনীতির মাঠে ভড়কে দেওয়ার মতো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে এনসিপির ভূমিকাও উপেক্ষণীয় নয়। ক্ষমতাসীন সরকারের আনুকূল্য ও ছাত্র-যুবভিত্তিক এই দলটি শহরের যুব ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। এই দলটি বিএনপির প্রার্থী তালিকাকে ‘আশাহত’ বা ‘গডফাদার-ঘেরা’ বলে মন্তব্য করেছে। শুধু তাই নয়, তারা বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত তরুদের প্রার্থী হওয়ার জন্য যোগাযোগের আহ্বানও জানিয়ে দিয়েছে। এটাও বিএনপির জন্য একটা বড় চাপ। এই চাপ মোকাবিলা করতে বা এনসিপির উত্থান ঠেকাতে দলটি নির্বাচনি মাঠে একাই দৌড় শুরু করে দিয়ে থাকতে পারে। তবে শেষপর্যন্ত ভোটের মাঠে এনসিপিও বিএনপির জোটসঙ্গী হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। ৬৩ আসন তো বিএনপি জোটসঙ্গীদের জন্য ফাঁকা রেখে দিয়েছে। অথচ সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিএনপি জোট শরিকদের জন্য ২২টি আসন রেখেছিল।
এটা ঠিক একটা দল নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। বিএনপির এই আগাম নির্বাচনি প্রস্তুতিও একটা পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ। এটা একদিকে আত্মরক্ষামূলক কৌশল, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা বলা যায়। বিএনপির কাছে এই মুহূর্তটি কেবল নির্বাচনে জয়-পরাজয় বা ভোটের হিসাব নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক কঠিন সংগ্রামও বটে। আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করে তারা অন্তত সমর্থক, কর্মী ও মাঠের নেতাদের মধ্যে একধরনের সক্রিয়তা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এতে হতাশ কর্মীদের কাছে পাঠানো হয়েছে স্পষ্ট বার্তা–দল নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা কেবল একটি নির্বাচনি কর্মসূচি নয়, বরং একটি প্রতীকী ও উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক বার্তা।